এই ছবিটা গতকালকের তোলা। কৃষক লীগের আয়োজিত বৃক্ষরোপন কর্মসূচির উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে একটা গাছ লাগিয়ে সেটায় পানি দিচ্ছেন তিনি। ছবিটাতে কোন অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করছেন কি? বিশেষ কিছু চোখে পড়ছে?

প্রধানমন্ত্রীর পেছনে মতিয়া চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখের মাস্ক ঠিক নেই। তিনি আবার খালি হাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে গাছে পানি দিতে সাহায্য করছেন! পেছনে একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখের মাস্কও ঠিক নেই! ছবিটাতে প্রধানমন্ত্রী সহ মোট ছয়জন মানুষ আছেন। প্রত্যেকের মধ্যে তিন ফুট করে দূরত্ব বজায় রাখার কথা। অথচ সামাজিক দুরত্বের 'স'ও মানা হয়নি ছবিতে। ঘাসের উপরে লাল গালিচা বিছানো। সেই গালিচায় চারজন দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের পায়ে আবার জুতা!

এই ছবিটা কতটা ভয়ংকর, সেটা কি কেউ আন্দাজ করতে পারছেন? একটা দেশে প্রায় এক লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত, আজকেই ৫৩ জন মারা গিয়েছেন, সেদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসে কেউ সামাজিক দূরত্বের কানাকড়ি নিয়ম-কানুনও মানছেন না! দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিটির সামনেও তাদের কারো কারো মাস্ক ঠিক নেই, শু কভার ব্যবহারের বালাই নেই। 

এই একটা ছবি দেখেই শিউরে উঠেছি। প্রধানমন্ত্রীর গোটা দিনটা তাহলে কিভাবে কাটে? তাকে নিরাপদে রাখাটা যাদের দায়িত্ব, তারা কতটা উদাসীন, সেটারই একটা দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে এই ছবিতে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও কি অনেকটা অসাবধান নন? নইলে করোনার এই দুর্যোগের সময়ে কেন এভাবে বৃক্ষরোপন কর্মসূচীর উদ্বোধন করতে হবে? সেটা কি অন্যান্য নেতা-নেত্রীদের ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নিজেই করতে পারতেন না? গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রতীকি একটা উদ্বোধন করার কথা, সেখানে কেন সামান্য জায়গায় ছয়জন মানুষের জটলা হবে? কেন কারো মুখের মাস্ক ঠিক থাকবে না, কেউ প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে গাছে পানি দিতে সাহায্য করবেন? প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি অনলাইনেও হতে পারতো! 

প্রধানমন্ত্রী সবসময় বলেন, মৃত্যুকে তিনি ভয় করেন না। যখন মরণ আসার, তখন আসবেই, সেটাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। সত্যি কথা। এমনিতেই তিনি বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন, ঘাতকের বুলেট তাকে ছুঁতে পারেনি, গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। কিন্ত একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি যখন এই অসাবধানী আচরণ করেন, তখন সাধারণ জনগন কোন ভরসায় সেটা মেনে চলবে? যেটা প্রধানমন্ত্রীই মানছেন না, সেটা মানতে তাদের বয়েই গেছে! 

সামাজিক দূর‍ত্ব না মেনেই প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন সবাই

আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, এই একটা ছবিতে কি মহাভারতটা অশুদ্ধ হয়ে গেল? ব্যাপারটা শুদ্ধ-অশুদ্ধের নয়, ব্যাপারটা গুরুত্বের। প্রধানমন্ত্রী, তার কার্যালয়ের লোকজন, এবং ছবিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা আরও পাঁচজন- সবার অসতর্কতা এটাই বলে দিচ্ছে, এই রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রযন্ত্র আসলে করোনাভাইরাসকে যতটা সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত, তা নিচ্ছে না। করোনা মোকাবেলায় সরকারের নেয়া নানা সিদ্ধান্তেও সেটারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে বারবার। 

আড়াই মাসের সাধারণ ছুটি ঘোষণা, কয়েক দফায় শেষ মুহূর্তে ছুটির মেয়াদ বাড়ানো, লকডাউন যথাযথভাবে কার্যকর করতে না পারা, টেস্টের সংখ্যা ধীরগতিতে বাড়ানো  হাসপাতালে আইসিইউর সংকট, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, এখন আবার জোনভিত্তিক এলাকা ভাগ করে লকডাউনের চেষ্টা, যেখানে কোন পরিকল্পনাই ঠিকঠাকমতো করা হচ্ছে না- পুরো বিষয়টাকে হাসির খোরাকে পরিণত করা হয়েছে। লকডাউন আর সীমিত আকার- এই দুটো শব্দ এখন কৌতুকে পরিণত হয়েছে, রাষ্ট্র এর দায় এড়িয়ে যেতে পারবে না কোনভাবেই। 

করোনায় আক্রান্ত হবার পর স্ট্রোক করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মারা গেছেন, মারা গেছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। প্রধানমন্ত্রীর বয়স হয়েছে, মৃত্যুকে তিনি ভয় পান না মেনে নিলাম, কিন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন না করায় 'করোনাভাইরাসকে এত বেশি গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই'- টাইপের বার্তা কি তার কাছ থেকে জনগন পাচ্ছে না? এই দায়ভার তিনি কি করে এড়িয়ে যাবেন? রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হিসেবে যেখানে তার অনন্য নজির স্থাপন করার কথা, সেখানে উল্টো তার উদাসীনতা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। এই রাষ্ট্রও কি করোনা মোকাবেলায় এমনই উদাসীন? 

ঘাতকের বুলেট/গ্রেনেড আর ভাইরাস এক নয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সর্বোচ্চ চিকিৎসা সুবিধা পাবার পরেও বিপদ ঘটছে অনেকের বেলায়, সতর্ক থেকেও ভাইরাসকে এড়ানো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আপনার, এবং আপনার চারপাশের মানুষগুলোর এই ধরণের উদাসীনতা মোটেই কাম্য নয়। আপনি যদি করোনার ভয়াবহতাকে গুরুত্ব না দেন, এই রাষ্ট্র কি করে এই ভাইরাসকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে, সেটা আমাদের মাথায় ঢোকে না। যে ভাইরাসটা লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, অর্থনীতির চাকাকে ধ্বসিয়ে দিয়েছে, সেটাকে এতটা হেলাফেলার সুযোগ নেই, এটা বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা