মানুষের জ্ঞান যতই সীমিত হোক এবং সেই জ্ঞান দিয়ে তৈরী তার যাবতীয় ধারণা যতই অযৌক্তিক হোক, তার কাছে সেটাই সত্য। তার কাছে সেটাই যৌক্তিক। সে এর চেয়ে বেশি কিছু জানে না, সেটা তার অপরাধ না। তার ধারণাকে, তার জ্ঞানকে, সেটা যত অল্পই হোক, সব অবস্থায় সম্মান করা উচিত।

আমাদের চারপাশে দুই চারজন কুতুব আছে, যারা মনে করে 'তারা যা যা জানে এবং বুঝে, সেগুলো আপনি না বোঝা বা না জানা মানে হলো - আপনি জীবনটাকে এনজয়ই করেন নাই, আপনার মানব জনম বৃথা।' তারা খুব অবাক হয়ে বলবে- ওহ মাই গড, তু-মি এ-ই-টা জা-নো-না?!' 

আপনার তখন মনে হবে শিট এইটা জানা মনে হয় ফরয জাতীয় কিছু ছিল, এই জিনিস মিস করে গেলাম কীভাবে?

তারা তাদের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি  কিংবা তাদের লেখায় জুয়াচুরি ভাষায় বলবে, 'আপনারা এই বই পড়েন নাই? এই গান শুনেন নাই? কিংবা এই 'জিনিস' খান নাই? এই যুদ্ধের কথা জানেন না? অমুক দেশের প্রেসিডেন্ট কে চিনেন না? মানবাধিকার আইন কি বোঝেন না?

নারে ভাই, জানি না, বুঝি না , চিনি না। পৃথিবীর কোনো সংবিধানে লেখা নেই, আপনি যা যা জানেন সেগুলো আমাকে জানতেই হবে। 

এই ধরনের আচরণকে ইংরেজিতে বলে 'বিলিট্লড' অর্থাৎ আপনার এই স্পেসিফিক ব্যাপারটা না জানার জন্য এই মানুষগুলো আপনাকে ইন্ডিরেক্টলি হেয় করবে এবং আপনি বাকি যা যা বিষয় জানেন অথবা জানেন না সেগুলোকে ডিসমিস করে ফেলবে। 

অন্যকে হেয় বা বিলিটলড করে, এই মানুষগুলো নিজেদের পান্ডিত্য জাহির করার পাশাপাশি, আপনি যে তার জ্ঞানের সমপরিমাণ জ্ঞান রাখেন না, সেটা আপনাকে আস্তে করে জানিয়ে দেবে। এইখানেই তাদের সুখ। 

অস্ট্রেলিয়ায় কর্মক্ষেত্রে এটাকে সোজা ভাষায় বলে 'সাইকোলজিক্যাল এবিউস' যা হ্যারাসমেন্ট আইনের আওতায় পরে ! যেহেতু আমরা বাংলাদেশী, আমাদের এইসব আইন ফাইন বুঝিয়ে লাভ নেই, অতএব ফেসবুক প্লাটফর্মই সই !

পৃথিবীর সকল বিষয় সব মানুষ জানবে না, কোনো মানুষের পক্ষেই সব কিছু জানা সম্ভব না। এমনকি কোনো একটা বিষয়ে - সেটা রোগ হোক, ইতিহাস হোক, সমসাময়িক ধারণা হোক - একের অধিক রিসার্চ পেপার থাকে। বিভিন্ন মানুষ তার নিজ নিজ জায়গা থেকে একটা পার্টিকুলার বিষয়ের উপর তাদের নিজস্ব একটা রিসার্চ পেপার প্রকাশ করেন। 

একটা ঘটনা বলি, মাস ছয়েক আগে আমি 'বিহাইন্ড দা বেঞ্চ ' বলে কোর্টে এক ধরণের সেশন আছে সেখানে এটেন্ড করেছিলাম। এই সেশনে সিনিয়র সরকারি আইনজীবীরা, জুনিয়র আইনজীবীদের একটা ক্লাস নেয়। আমি আইনজীবী না, তবে কোর্টে সকল এমপ্লয়ীদের এই ক্লাসে যাবার সুযোগ আছে বলে আমারও সুযোগ হয়েছিল। 

সেখানে এক আইনজীবী বলেছিলেন, যেকোনো ঘটনা ঘটার জন্য মিনিমাম দুইটা মানুষ বা দুই পক্ষকে ইনভল্ভ হতে হয়। তারা তাদের মতন করে সেই ঘটনা ব্যাখ্যা করে। একজনের বর্ণনার সাথে আরেকজনের বর্ণনা মিলবে না এটাই স্বাভাবিক, যদি মিলে যায় তাহলে কোনো আর্গুমেন্ট তৈরী হয় না। মানুষ তখনি আমাদের কাছে আসবে যখন কোনো আর্গুমেন্ট তৈরী হবে। 

এইযে দুই ব্যক্তি দুইজনের মতন করে ঘটনা বলেছে, তারা আসলে কেউই ভুল না। তারা তাদের পার্সেপশন বর্ণনা করছে। তাদের কাছে একটা ঘটনাকে যেমন মনে হয়েছে, সেটাই বলেছে। আমাদের যা করতে হবে তা হলো সেই ঘটনা থেকে সত্য বের করে, সেটাকে আইনের সহায়তায় প্রকাশ করা। পুরো প্রসেসে কোনোভাবেই ক্লায়েন্টকে অবিশ্বাস করা যাবে না। 

যেমন ধরো - আমাদের ক্লায়েন্ট রহিম, করিমকে তার হাজার টাকা আত্মসাৎ করার জন্য থাপ্পড় মেরেছে।  করিম রহিমের বিরুদ্ধে কেস করেছে। এখন আমরা সবাই জানি থাপ্পড় মারাটা আইনত অপরাধ। কিন্তু রহিম এটা জানে কি জানে না, সেটা আমাদের চিন্তার বিষয় না। আমাদের চিন্তা হলো এই অপরাধ ক্লায়েন্ট করে ফেলেছে। 

অতএব সে কেন করেছে, সেই সত্যটা জানতে হবে। রহিমের ধারণা, করিমের কাছে দীর্ঘদিন টাকা ফেরত চেয়ে সে যেহেতু ফেরত পায়নি অতএব থাপ্পড় মারা ছাড়া তার আর কোনো অপশন ছিল না। 

এই যে রহিমের ধারণা - এই ধারণাকে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। এই ধারণাকে আমরা ডিসমিস করবো না। এই ধারণাকে আমরা আইনি যুক্তি দিয়ে মূল সত্যটা শর্তসাপেক্ষে প্রেজেন্ট করবো। 

সেশনটা খুব মজার ছিল। যদিও এইসব কেস ফেস আমি খুব একটা বুঝি না। শুধু এই গল্পটা আমার মনে আছে কারণ এই গল্পের মূলমন্ত্র ছিল - পার্সেপশন ইজ রিয়ালিটি।

মানুষের জ্ঞান যতই সীমিত হোক এবং সেই জ্ঞান দিয়ে তৈরী তার যাবতীয় ধারণা যতই অযৌক্তিক হোক, তার কাছে সেটাই সত্য। তার কাছে সেটাই যৌক্তিক। সে এর চেয়ে বেশি কিছু জানে না, সেটা তার অপরাধ না। তার ধারণাকে, তার জ্ঞানকে, সেটা যত অল্পই হোক, সব অবস্থায় সম্মান করা উচিত।

ইদানিং দেখা যায় ফেসবুকে কমেন্ট বক্সে শুধু-শুধুই দুই দলের ঝগড়া বা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অথচ দুই দলই সঠিক। তারা কেবল তাদের পার্সেপশন (উপলব্ধি) এবং বিশ্বাস, যেটা তারা তাদের নিজের জায়গা এবং জীবন অভিজ্ঞতা দিয়ে লাভ করেছে সেটার উপর নির্ভর করেই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে। তার মানে এই না একজন ভুল আর আরেকজন সঠিক।

এর মানে হলো, জীবন অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা যা জানি, সেটাও যেমন সত্য এবং এখনো পর্যন্ত যা জানতে পারিনি, এই 'না জানা' টাও সত্য।

আপনার পড়াশুনা, জানাশুনা যদি অনেক বড়মাপের কিছু হয়, তাহলে সেই জ্ঞান বিতরণের সময় আরেকজনের কেন 'সেই' জ্ঞান নেই, সেটা নিয়ে নকল আক্ষেপ না করে, বরং আপনার উচিত এই 'বিনামূল্যে' জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে আরো নতুন কিছু কী শেখা যায় সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখা। 

আমি মনে করি, আমরা অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করি কিংবা করি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। বরং প্রতিটা মানুষের যেকোনো বিষয়ে, যে কোনো মতামত দেবার অধিকারকে (সেটা আমার পছন্দ হোক বা না হোক) শ্রদ্ধা করা উচিত! যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই মতামত অন্যকারো শারীরিক, মানসিক, নৈতিক এবং বিশ্বাসের ক্ষতি না করে।

লেখক- সাইকোলজিক্যাল ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট কাউন্সেলর, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল কোর্ট, ক্যানবেরা

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা