পুরো চিন্তাশক্তি জুড়ে স্রেফ ঐ গৃহবধূর আর্তচিৎকার চলছে। তার হাহাকারটুকু মাথার ভেতর বাজছে। ভিডিওর পুরো সময়টায় মানুষটা লজ্জায়, ক্ষোভে, অপমানে, যন্ত্রণায়, কষ্টে হাহাকারে গোঙাচ্ছিলেন, কাঁদছিলেন আর বলছিলেন...

ওই গৃহবধূর বিয়ে হয় বছর তিনেক আগে। স্বামী তাকে রেখে অন্যত্র দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দীর্ঘদিন তার সঙ্গে স্বামীর কোনো যোগাযোগ ছিল না। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে স্বামী ওই গৃহবধূর সাথে দেখা করতে আসেন। স্বামীকে গৃহবধূর ঘরে ঢুকতে দেখে স্থানীয় মাদক চোরাকারবারি বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার  তার বাহিনী নিয়ে রাত ১০টার দিকে ওই ঘরে প্রবেশ করে গৃহবধূকে নোংরা অপবাদ দিয়ে তাকে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে ওই গৃহবধূকে পিটিয়ে বিবস্ত্র করে তার ভিডিওধারণ করে। 

ভিডিওচিত্রটি এতোদিন দেলোয়ার বাহিনীর কাছেই ছিল, তারা এই ভিডিওটি ফেসবুকে ছেড়ে দেবার ভয় দেখিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীটির পরিবারের কাছে টাকা দাবী করে নিয়মিত হুমকি দিত। ভয়ে পুরো পরিবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়।  টাকা না দেওয়ায় আজ বিকালে নির্যাতনের বীভৎস ভিডিওটি অনলাইনে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ 

ঘটনাটি ৩২ দিন আগে ঘটেছে। নির্যাতিতা গৃহবধুকে এলাকা ছাড়া করা হয়েছিল পরের দিনই। এই দীর্ঘ সময়ে এলাকাবাসী বিচারের দাবীতে কোন প্রতিবাদ কিংবা কিছুই করেনি। পুলিশ কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনরূপ তৎপরতা ছিল না। 

গতকাল ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ইতিমধ্যেই পুলিশ আব্দুর রহিমকে গ্রেফতার করেছে এবং নির্যাতিতা গৃহবধূকে উদ্ধার করে তাদের হেফাজতে নিয়েছে। নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, বেগমগঞ্জের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতারে জেলা পুলিশের ৫টি ইউনিট মাঠে কাজ শুরু করেছে।

মূল অভিযুক্ত দেলোয়ার

ওপরের ছবিটা মূল নরপশু দেলোয়ারের। আর নিচের ছবিটা কামালের। এই দেলোয়ার হচ্ছে দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড বাদলের ছবি খুঁজছি, পেলে এই পোষ্টে এড করে দেবো। এদের এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। এই গ্যাং-এর আব্দুর রহিম (২২) কে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল বিকালে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ কিছুক্ষণ আগে রহমান নামে দেলোয়ারের গ্যাং-এর আরেকজনকে গ্রেফতার করেছে। সুমনসহ বাকিদের খুঁজছে পুলিশ।  

আরেক ধর্ষক কামাল

ভিডিওটি সুস্থ-স্বাভাবিক কেউ দেখলে অসুস্থ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। নির্যাতনকারী নরপিশাচগুলো অচিন্তনীয় বর্বরতায় এই মানুষটাকে অপদস্থ করেছে, অবমাননা করেছে। পুরোপুরি বিবস্ত্র করে একজন তার যৌনাঙ্গে হাত ঢুকিয়েছে। এরপর লাঠি ঢুকিয়েছে। স্রেফ নারী হিসেবে না, চরম পৈশাচিকতায় এই হায়েনার দল নির্যাতনের পুরোটা সময় গালাগালি এবং মানুষটাকে নিয়ে নোংরা রসিকতা আর চরম ভয়াবহ কুৎসিত অবমাননা চালিয়ে গেছে। 

তাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই নির্যাতনের পুরোটা ভিডিও করে ফেসবুকে আপলোড করা। তারা বারবার বলছিল, ফেসবুকে যাবে এইটা, ভাইরাল হবে। কারণ তারা দেখেছে খুব সহজেই এই দেশের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ভয়ংকর এবং পৈশাচিক সব কন্টেন্ট ভাইরাল করা যায়, নারীদের প্রতি অবমাননাকর ইতরামি শেয়ার হয় শত-হাজারে। অনলাইনে নানা পোস্টে, পেইজে, ইনবক্সে নানা জায়গায় নানা টপিকে নারীদের প্রতিমুহুর্তেই অশ্লীল গালাগালি, ধর্ষণের হুমকি, আর চরম নোংরা যৌন হয়রানি আর ইতরবৃত্তি করেও পার পেয়ে যাচ্ছে সবাই, কেউই বিচারের আওতায় আসছে না, প্রায় কোন পটেনশিয়াল রেপিস্টেরই সাইবার বুলিং-এর জন্য বিচার হচ্ছে না।  

নির্যাতনকারীদের চেহারার ছবি নেবার জন্য ভিডিওটা দেখতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখনো মাথায় একটা ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে। সহজভাবে চিন্তা করতে পারছি না, কিছু ভাবতে পারছি না। মাথায় রক্ত উঠে গেছে, এদের এমন সব শাস্তি দেবার চিন্তা আসছে, এর আগে কখনো ভাবিনি। বারবার আমার মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। আমার বোনের মুখটা মনে পড়ছে। এই  গৃহবধূর জায়গায় আজ তারাও থাকতে পারতো। এই গৃহবধূর জায়গায় আজ আপনার মা কিংবা বোন কিংবা স্ত্রী কিংবা মেয়ে থাকতে পারতো। কিভাবে সহ্য করতেন? আজ ছিল না, কাল এই গৃহবধূর জায়গায় আপনার আপনজন থাকতেও পারে। কিভাবে সহ্য করবেন? ভাবতে পারছেন? 

আমার পুরো চিন্তাশক্তি জুড়ে স্রেফ ঐ গৃহবধূর আর্তচীৎকার চলছে। তার হাহাকারটুকু মাথার ভেতর বাজছে। ভিডিওর পুরো সময়টায় মানুষটা লজ্জায়, ক্ষোভে, অপমানে, যন্ত্রণায়, কষ্টে হাহাকারে গোঙাচ্ছিলেন, কাঁদছিলেন আর বলছিলেন-

-বাবা গো আমাকে ছেড়ে দে। "আব্বা গো তোর আল্লাহ'র দোহাই ছাড়ি দে!" 
- এরে আব্বা গো, তোগো আল্লাহ'র দোহাইরে। 
- বাবা গো, ছাড়ি দে...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা