কীভাবে সিনেমার উন্নতি করা যায়, কোন ধরনের সিনেমা বেশি চলছে, মানুষ কোন সিনেমা বেশি দেখতে আসছে- এগুলো নিয়ে নাকি সবার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতেন। সম্ভবত এই কারণেই মান্নার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া।

 

মান্নার একাদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। সময় কতটা নিষ্ঠুর, এটা কারো মৃত্যুবার্ষিকী আসলে টের পাই। এগারো বছর! চিন্তা করা যায়? এগারোটা বছর ধরে একজন মানুষ নেই, একজন হিরো নেই।মান্নার মৃত্যুটা একদম বাংলা সিনেমার নায়কের মৃত্যুর মতো মনে হয় আমার কাছে। একদিন হুট করে মান্নার বুকে ব্যথা উঠল। সেই ব্যথা নিয়ে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে নিজে হাসপাতালে গেলেন। এরপরে তাকে আর বাঁচানো গেল না। ব্যথা বুকে নিয়ে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করা যাওয়ার অংশটুকু বাংলা সিনেমার সাথে মিলে যায়।

কিন্তু বাংলা সিনেমার শেষে নায়ক মরে যান না, কোন না কোনোভাবে তিনি বেঁচে যান। বাস্তবে সেটা হয়নি। মান্নার অভিনয়ের আলাদা একটা স্টাইল ছিল, বিশেষ করে তার সংলাপ বলার স্টাইল। এই কারণে অনেকে মান্নার মতো করে কথা বলা নকল করতে পারেন। আমাদের খুব নায়কের মাঝে এই জিনিসটা আছে। ইন্ডিয়াতে প্রায় সবারই এই জিনিসটা আছে আর এই কারণে তাদের প্রত্যেককে মিমিক্রি করার মতো আর্টিস্টের অভাব নাই। আমাদের ওমর সানি এরকম আরেকজন।

এই জিনিসটা আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ পছন্দ করি। শত শত কাজ আছে মান্নার। বেশিরভাগ ভালো কাজ কাজী হায়াতের সাথে। একটা সময় মান্না আর কাজী হায়াত একসাথে কাজ করা মানেই ডেডলি কম্বো! দাঙ্গা, ত্রাস, লুটতরাজ, ধর, বর্তমান, কষ্ট, তেজী, আমি জেল থেকে বলছি থেকে শুরু করে আরও অনেক উল্লেখযোগ্য সিনেমা মান্নার। তবে আম্মাজানের কথা বললে আর কিছু বলার থাকে না। এই একটা সিনেমাতে মান্না যা করে দেখিয়েছেন, সেটা আমার মনে হয় না আর কাউকে দিয়ে সম্ভব। আম্মাজান দেখে কতবার চোখে পানি এসেছে হিসাব নেই।

নায়ক মান্না 

আম্মাজানের মেকিং আরও একটু ভালো হলে, ক্যামেরার কাজ, সাউন্ড- এগুলো আরও পলিশড থাকলে এটা আরও দুর্দান্ত কিছু হতো। আপাতত দারুণ হয়েছে শুধু মান্নার অভিনয়ের জন্য। এই মানুষটার জন্য হলেও আম্মাজান বারবার দেখা যায়। কাজী হায়াত মান্নাকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন। মান্না যেদিন মারা যান, সেদিন টিভি ক্যামেরাতে আমি কাজী হায়াতকে উন্মাদের মতো দৌড়াতে দেখেছিলাম আর পাগলের মতো প্রলাপ বকতে দেখেছিলাম। তখনই বুঝতে গিয়েছিলাম দুজনের মাঝে কি চমৎকার সম্পর্ক ছিল।

দুইজনে একসাথে অনেক হিট সিনেমা উপহার দিলেও, একটা সময় গিয়ে দুইজনের ম্যাজিক কেন যেন আগের মতো আর কাজ করছিল না। অনেক ধরনের ক্যারেক্টার করলেও, পুলিশ ক্যারেক্টারে মান্নাকে অন্যরকম ভালো লাগতো আমার কাছে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল মনে হতো রোম্যান্টিক ক্যারেক্টারে। আর আম্মাজান কিংবা কষ্ট সিনেমার তারছিঁড়া ক্যারেক্টারে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী! ভিন্ন রকমের সিনেমাও করেছেন মান্না। কাবুলিওয়ালা, উত্তরের খেপ, সাজঘর এই ধরনের কিছু সিনেমা।

প্রোডিউসার হিসেবেও তিনি সফল ছিলেন। লুটতরাজ, লাল বাদশা, আব্বাজান, স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ, দুই বধূ এক স্বামী, মনের সাথে যুদ্ধ, মান্না ভাই ও পিতা মাতার আমানত তার প্রযোজিত সিনেমা। ঢাকার বাইরে বেশ কিছু সিনেমা হলে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। সেখানকার হল মালিক, হলের স্টাফ, দারোয়ানদের সাথে কথা বলে জেনেছি- মান্না নাকি মাঝে মাঝে তাদের সাথে দেখা করতে আসতেন।

কীভাবে সিনেমার উন্নতি করা যায়, কোন ধরনের সিনেমা বেশি চলছে, মানুষ কোন সিনেমা বেশি দেখতে আসছে- এগুলো নিয়ে নাকি সবার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতেন। সম্ভবত এই কারণেই মান্নার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। তার প্রমাণ আমরা দেখেছি মৃত্যুর পর শহীদ মিনারে যখন তার লাশ রাখা হয়েছিল। তাকে শেষবারের মতো দেখতে যে পরিমাণ মানুষের ঢল নেমেছিল, সেটা বিস্ময়কর! মান্না একজনই। মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা!


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা