গাভাস্কারের অভাব শচীন পূরণ করেন, শচীনের বিদায়ের পর হাল ধরার জন্য কোহলি হাজির হন। কিন্ত ধোনিদের অভাবটা কখনও পূরণ হয় না। মহাকাল গাভাস্কার বা শচীনের রিপ্লেসমেন্ট তৈরি করে দেয়, ধোনির বিকল্প কেউ আসে না, আসবেও না...

কমেন্ট্রিবক্স থেকে উচ্চারণ করা রবি শাস্ত্রীর সেই লাইনটা ভারতীয় ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে, থাকবে আজীবন- 'Dhoni finishes off in style!' নুয়ান কুলাসেকারার বলে সেই ঐতিহাসিক ছক্কা, যেটা ভারতকে আঠাশ বছর বাদে বিশ্বকাপের স্বাদ এনে দিয়েছিল, প্রিয় হেলিকপ্টার শটে টেনেছিলেন ম্যাচের ইতি। গতকাল সন্ধ্যায় মহেন্দে সিং ধোনি নামের মানুষটা যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন ঘোষণা দিয়ে, তখনও তিনি আগের মতোই আনপ্রেডিক্টেবল, নিজের স্টাইলেই শেষের গল্পটা লিখলেন, একদম নিজের মতো করে। 

একশোজনের মধ্যে নিরানব্বই জনই জানতেন, ধোনিকে আর কখনও ভারতের নীল জার্সি পরে মাঠে নামতে দেখা যাবে না। কিন্ত জানা, আর মানায় তফাৎ আছে। শেষবারের মতো ধোনি মাঠ থেকে বিদায় নেবেন, সতীর্থরা তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে গোটা মাঠে চক্কর দেবে, লজ্জাবনত মুখ নিয়ে হাত নাড়বেন ধোনি, গ্যালারি থেকে ভেসে আসবে মুহুর্মুহু গগনবিদারী চিৎকার- ধোনি! ধোনি! আবেগের এই বহিঃপ্রকাশটুকু ছাড়া কি ধোনিকে বিদায় জানানো যায়? ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণময় চরিত্র যিনি, ভারতকে যিনি সবগুলো আইসিসি ট্রফি জিতিয়েছেন, টেস্ট র‍্যাংকিংয়ে এক নম্বর আসনে তুলেছেন- তিনি একটা ইন্সটাগ্রাম পোস্ট দিয়ে বিদায় বলে দেবেন- এটা ভক্তরা মানবে কেন? 

কিন্ত মানুষটার নাম তো মহেন্দ্র সিং ধোনি, সারাটা জীবন যিনি নিজের খেয়ালে, নিজের সূত্রে চলেছেন, কোন অনুরোধ, কোন চাপ যাকে টলাতে পারেনি, শেষবেলায় আবেগের কাছেই বা তিনি হার মানবেন কেন? এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একরকম নিভৃত জীবন কাটিয়েছেন, ছিলেন ক্রিকেট থেকে অনেক অনেক দূরে। কবে ফিরবেন মাঠে, কবে অবসর নেবেন- এসব প্রশ্নের একটাই জবাব দিয়েছেন, সময় হলেই জানতে পারবেন! সময়টা গতকাল হলো ধোনির, তার আগে কেউ জানতে পারলো না, কেউ কল্পনাও করতে পারলো না। 

ইন্সটাগ্রামে এলো বিদায়ের ঘোষণা

২০০৭ সালে কল্পনা করতে পারেননি মিসবাহ উল হকও, জোহানেসবার্গে শেষ ওভারে চোখের সামনে যোগীন্দর শর্মাকে দেখে। শেষ ওভারটা হরভজন সিং করবেন, এমনটাই ধারণা ছিল তার। কিন্ত চতুর ধোনি বোলিংয়ে নিয়ে এলেন যোগীন্দরকে, খেললেন বিশাল এক জুয়া। মিসবাহ তখন ক্রিকেট বলটাকে ফুটবলের সাইজে দেখছেন, তার সামনে যোগীন্দরকে আনাটা বাঘের খাঁচায় হরিণ ছেড়ে দেয়ারই শামিল। অথচ ধোনির কৌশল কাজে দিয়েছিল, কাজে লেগেছিল ফাইন লেগ থেকে শ্রীশান্তকে এগিয়ে এনে শর্ট ফাইন লেগে দাঁড় করানোর টোটকাটাও। ঠিক সেখানেই ধরা পড়লেন মিসবাহ, জয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের ছয় রানের দূরত্বটা ঘুচলো না আর- ধোনির জয়রথের শুরুটা তো সেখান থেকেই! 

ক্যারিয়ারজুড়ে এমন আচমকা জুয়া খেলেছেন ধোনী; মাঠে, মাঠের বাইরে সব জায়গায়। প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিয়েছেন, হতবাক করেছেন ভক্ত সমর্থকদেরও। নিজেকে পড়ার বা বোঝার সুযোগ দেননি কাউকে, অধিনায়ক ধোনী তাই যতোটা আনরিডেবল, মানুষ ধোনী আরো অনেক বেশী আনপ্রেডিক্টেবল। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্যাটিং অর্ডার ভেঙে ফর্মে থাকা যুবরাজ সিংকে বসিয়ে নিজেই ব্যাট হাতে নেমে এসেছিলেন ধোনি, কারণ উইকেটে তখন গম্ভীর আছেন, বোলিং করছেন মুরালিধরণ। মুরালির সামনে দুজন বাঁহাতিকে ছেড়ে দিতে চাননি, তাই আচমকা সিদ্ধান্তে  বদল হয়ে গেল ব্যাটিং লাইনআপে। বাকীটা তো ইতিহাস! 

সাফল্য তার হাতে ধরা দিয়েছে বারবার, কিংবা বলা ভালো, সাফল্যকে তিনি নিজ কৃতিত্বে ছুঁয়েছেন প্রতিবার। একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে ভারতকে জিতিয়েছেন পঞ্চাশ ও বিশ ওভারের বিশ্বকাপ, সেই সাথে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ট্রেবল; যে কৃতিত্ব নেই আর কারো, যার পুনরাবৃত্তি করাটাও প্রায় অসম্ভব। ২০০৭ সালে বিশ্বকাপ বিপর্যয়ের পর জাতীয় দলের দায়িত্ব হাতে পেয়েছিলেন, একগাদা তরুণ তুর্কীকে সঙ্গী করে ঘরে তুলেছেন ওয়ার্ল্ড টি-২০'র শিরোপা; বদলে দিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটের খোলনলচে, পুরো দলের সাথে একশো ত্রিশকোটি ভারতীয়কেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করিয়েছেন, আমরা পারি, আমরাই পারবো। জয়ের ক্ষুধা তৈরী করে দিয়েছেন প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের মধ্যে; সে ইশান্ত শর্মা হোন কিংবা রোহিত শর্মা।

বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই ঐতিহাসিক ছক্কার পর

ভারতের ক্রিকেটে ধোনির আসনটা অন্যরকম উচ্চতায়। সেটা শুধু তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন বলে নয়, পরিসংখ্যানের কারণেও নয়। তিনি তার দলের ভেতরে একটা মন্ত্র গুঁজে দিয়েছেন, বিশ্বসেরা হবার মন্ত্র। ধোনি কি জিনিস সেটা জানেন বিরাট কোহলি, অধিনায়ক হবার পরে যিনি অন্ধের মতো অনুসরণ করতেন ধোনির দেয়া পরামর্শগুলোকে। ভারতীয় ক্রিকেটে ধোনিই একমাত্র অধিনায়ক, যিনি স্বেচ্ছায় অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে অনুজের অধীনে খেলেছেন চার বছরেরও বেশি সময়। ইগো ক্ল্যাশের রমরমা খবরগুলো শুধু ট্যাবলয়েডের পাতাই ভরিয়েছে, ড্রেসিংরুমের অন্দরমহলে ঢুকতে পারেনি কখনও।

অনেকেই বলে, ধোনি দারুণ একটা দল পেয়েছিলেন, এজন্যেই এতসব জিতেছেন। এতে তার কি অবদান? ধোনি কি জিনিস, সেটা জানে স্ট্যাম্প মাইক্রোফোন। জাদেজা-অশ্বিন থেকে শুরু করে আজকের চাহাল-জাদব, যাকে খুশি জিজ্ঞেস করুন, প্রায় প্রতিটা উইকেটের ভাগীদার হিসেবে তারা ধোনির নাম নেবেনই। মাইক্রোফোনে শোনা 'ইধার সে নেহি, দুসরি তারাফ সে ডাল' (ওভার দ্য উইকেট) কিংবা 'বিচওয়ালে ডান্ডে সে মার' (মিডল স্ট্যাম্প বরাবর) সাজেশন আসার পরের বলেই ব্যাটসম্যান যখন রেসিপি অনুযায়ী বোকা হয়ে উইকেটটা বিলিয়ে দিয়ে আসেন, তখন ধোনির অবদান অস্বীকার করাটা হবে অকৃতজ্ঞতার শামিল। ধোনির মাস্টারমাইন্ড ট্যাকটিকস না থাকলে টি২০ বিশ্বকাপে ভারতের কাছে বাংলাদেশ এক রানে হারে না, মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা জেতা ম্যাচটা পান্ডিয়ার হাতে ছেড়ে দিয়ে আসেন না! 

অভিজ্ঞতার ওপরে তারুণ্যকে বরাবরই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি, আজকের রোহিত শর্মা যখন বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের মালিক হন, তখন হঠাৎই মনে পড়ে, ছয় থেকে তুলে এনে রোহিতকে দিয়ে ইনিংস ওপেন করার সিদ্ধান্তটা কিন্ত ২০১৩ সালে ধোনিই নিয়েছিলেন। লোকজন সমালোচনা করেছে, গালাগাল দিয়েছে, কিন্ত ফলাফল হিসেবে ধোনি বিশ্বকাপ নিয়ে এসেছেন ঘরে, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছেন ইংল্যান্ডের প্রতিকূল কণ্ডিশনে, টেস্টে দলকে বানিয়েছেন এক নম্বর। ধোনিকে পছন্দ না করা লোকটাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়, ভারতের ক্রিকেটে সফলতার অন্যরকম একটা মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছিল ধোনির হাত ধরেই। 

২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগেই বলেছিলেন, ভারতকে বিশ্বের সেরা ফিল্ডিং টিম বানাবেন। ধোনি কথা রেখেছেন। স্কোয়াডের প্রতিটা সদস্যকে আলাদাভাবে ফিল্ডিং কোচের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। ফিটনেস নিয়ে ধোনি নিজে খেটেছেন, দলের সবাইকে খাটতে বাধ্য করেছেন। কারন ধোনি জানতেন, ফিল্ডাররা কুড়িটা রান বাঁচাতে পারলে সেটা দলের জন্য কত বড় আশীর্বাদ হয়ে আসে। এই যে জাদেজা-রায়না-কোহলি বা রোহিত-পান্ডিয়া-ধাওয়ানরা বিশ্বসেরা ফিল্ডারে পরিণত হয়েছেন, সেটার মূল কৃতিত্ব ধোনির, তিনিই তাদের এভাবে গড়ে তুলেছেন। সৌরভ-দ্রাবিড়-লক্ষণের মতো কিংবদন্তী ক্রিকেটারদের তিনি বসিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র তারা ফিল্ডিঙে আপ টু দ্য মার্ক নন বলে। ২০১১ বিশ্বকাপের পরে গম্ভীরকেও ছেঁটে ফেলেছেন টিম কম্বিনেশনে জায়গা না হবার কারণে। 

উইকেটের পেছনে তিনি ছিলেন বিশ্বসেরা

আনন্দবাজার পত্রিকায় গৌতম ভট্টাচার্য একবার লিখেছিলেন- "অধিনায়ক এমএসডি'র সবচাইতে বাজে এবং সবচেয়ে দারুণ সিদ্ধান্ত একটাই- ২০০৮-এ সৌরভ-দ্রাবিড়-লক্ষণকে ওয়ানডে টিম থেকে ছেঁটে ফেলা।" ব্যাটিং অর্ডারের তিন মহীরূহকে ছাড়াই তিন বছর পরের বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে দল গোছানোটা চাট্টেখানি কথা নয়। ধোনি নিজের ক্যারিয়ারকে বাজি রেখে জুয়া খেলেছিলেন, সঙ্গী ছিল উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস, নিজের পরিকল্পনার ওপর ভরসা। পরের গল্পটা তিনি নিজের হাতে লিখেছেন ভারতীয় দলকে সঙ্গে নিয়ে। 

শতকোটি ভক্ত সমর্থকের প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে আটাশ বছর পর ভারতকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন ধোনি, প্রমাণ করেছেন নিজের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা। উপমহাদেশীয় আবেগের ছিটেফোঁটাও ধোনির মধ্যে দেখা যায়নি কখনও। মাথার ওপর এভারেস্ট সমান প্রত্যাশার চাপ নিয়ে দশটি বছর ভারতের মতো ফলপ্রত্যাশী দলের ক্যাপ্টেনের হটসিট সামলেছেন দারুণ দক্ষতায়। নেতৃত্বের জোয়াল কাঁধে টেনে নিয়েছেন অম্লান বদনে, বুকের ভেতরে মাউন্ট ফুজির আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে রেখে, যে আগুনে পুড়েছে প্রতিপক্ষ, কত শতবার!

বিদায় প্রিয়! সাতটা বেজে উনত্রিশ মিনিটের এই সময়টা ভারতীয় ক্রিকেটের, বা বিশ্ব ক্রিকেটেরই ইতিহাসে বেদনার্ত একটা মুহূর্ত হিসেবে লেখা রবে অনেকদিন। ধোনির বেড়ে ওঠার প্রত্যক্ষদর্শী আমরা, একদম নোবডি থেকে তাকে ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসটা সাফল্যের সোনারঙা কালিতে নিজের হাতে লিখতে দেখেছি। রাঁচি নামের ছোট শহরটার এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রিকেটারে পরিণত হওয়া মহেন্দ্র সিং ধোনী একজন অ্যাথলেট নন শুধু, কেবল একজন সফল অধিনায়কও নন। ধোনী একটা ব্র‍্যান্ড নেম, একটা বিপ্লবের নাম, যে বিপ্লব ভারতীয় ক্রিকেটটাকেই একটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

বিদায়বেলায় একটা বাস্তবতা স্বীকার করে যাই- গাভাস্কারের অভাব শচীন পূরণ করেন, শচীনের বিদায়ের পর হাল ধরার জন্য কোহলি হাজির হন। কিন্ত ধোনিদের অভাবটা কখনও পূরণ হয় না। মহাকাল গাভাস্কার বা শচীনের রিপ্লেসমেন্ট তৈরি করে দেয়, ধোনির বিকল্প কেউ আসে না, আসবেও না...

 *

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা