অভিনেতা হিসেবে তিনি দুর্দান্ত, মানুষ হিসেবে তার দর্শনও অনন্য। অথচ তুমুল প্রতিভাবান এই অভিনেতা দিনের পর দিন পর্দায় ভাঁড়ামি করে গেছেন, লোক হাসিয়েছেন, জনপ্রিয়তার নেশায় পড়ে নিজের প্রতিভার প্রতি করেছেন অবহেলা।

তাকে নিয়ে পরিবারের খুব একটা আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল না। ছোটবেলা থেকেই উড়নচণ্ডী স্বভাবের ছিলেন, যেটা ভালো লাগতো সেটাই করতেন। স্কুলে যাবেন বলে বের হয়েছেন, হয়তো মাঝ রাস্তায় মনে হলো আজ স্কুলে যাব না, চলে যেতেন নদীর পাড়ে, কিংবা মাছ ধরা দেখতে। একটা ভবঘুরে, যাযাবর জীবন চেয়েছিল যে ছেলেটা, সেই ছেলেটাই অনেক বছর পরে এসে নিজেকে পরিণত করেছে বাংলা নাটকের অবিসংবাদিত জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে। তার মতো জনপ্রিয়তা, মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা এদেশের খুব কম অভিনেতাই পেয়েছেন।ভদ্রলোকের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল শামীম, পরিবারের সবাই তাকে এই নামেই ডাকে এখনও। তবে দেশের মানুষ তাকে চেনে মোশাররফ করিম হিসেবে, এদেশের টিভি নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র, সবচেয়ে প্রতিভাবান অভিনেতাদেরও একজন। 

শামীম থেকে মোশাররফ হবার গল্পটা বেশ মজার। তার সার্টিফিকেট নাম মোশাররফ হোসেন। বাবার নাম আব্দুল করিম। বাবা মঞ্চে অভিনয় করতেন। কিন্তু তাঁর অভিনয় দেখার সৌভাগ্য শামীমের হয়নি। তবে বাবার কণ্ঠে আবৃত্তি শুনেছিলেন, দারুণ দরাজ গলা ছিল বাবার। শামীম যখন পুরোপুরি অভিনয় শুরু করেন, তখন মনে হয় বাবার কিছু একটা তার সঙ্গে সঙ্গে থাকুক। এই ভাবনা থেকেই বাবার নামের একটা অংশ নিজের নামের সঙ্গে লাগিয়ে নিলেন তিনি। পুরো নাম হয়ে গেল মোশাররফ করিম। তারপর থেকে এই নামেই সবাই চেনে তাকে। 

আশির দশকের শেষভাগে নাট্যকেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন মোশাররফ, পড়ালেখা করতে ভালো লাগতো না, অভিনয়ে আসার মূল কারণ সেটাই। অভিনয়ের প্রেমে পড়ে অভিনয়ে আসেননি, বরং অভিনয় করতে করতেই সেটার প্রেমে পড়েছেন তিনি। যাত্রাপালা দিয়ে শুরু, খুব ছোটবেলায়। যাত্রায় অভিনয় করতেন। একদম পেশাদার যাত্রাপালা। লোকে টিকিট কেটে সেই যাত্রাপালা দেখত। তারপর এলেন থিয়েটারে। তারপর টেলিভিশনে, নাটকে সবার হৃদয় জয় করে নাম লিখিয়েছেন সিনেমাতেও, তবে সেখানে নিয়মিত নন তিনি। 

মোশাররফ করিম, ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ে

পুরোদস্তুর অভিনেতা হওয়ার আগে শিক্ষকতা করেছেন মোশাররফ করিম। তবে সেটা টিউশনি ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষক। এর আগে খণ্ডকালীন জরিপের কাজ করেছেন। হয়েছিলেন এইডস বিষয়ক ক্যাম্পেইনের সমন্বয়কারী। করেছেন চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী পোস্টার ডিজাইন। বোহেমিয়ান একটা জীবন ছিল তার, জুতা দেখে ভাগ্য বলে দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ছিলেন মুক্ত, স্বাধীন। সেই জীবনে টাকাপয়সার টানাটানি ছিল, কিন্ত জীবন থেমে থাকতো না, কষ্টে ছিলেন না কখনও, নিজের স্বাধীনতাটাকে উপভোগ করতেন খুব, যে স্বাধীনতাটা এখন পান না খুব একটা। 

'অতিথি' নামের একটা নাটক দিয়ে টেলিভিশনে পা রাখলেন ১৯৯৯ সালে। তবে তার ক্যারিয়ার বদলে গেছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর 'ক্যারাম' নাটকটা দিয়ে। অথচ নাটকটা তার করার কথাই ছিল না, কারণ তখন একটা ধারাবাহিকের শুটিংয়ের জন্য থাইল্যান্ড যাওয়ার কথা তার। মোশাররফ করিম তখনও জনপ্রিয়তা থেকে শতক্রোশ দূরে, তার জন্য থাইল্যান্ডে শুটিং করতে যাওয়া বিশাল ব্যাপার। কিন্ত স্ত্রীর পরামর্শে সেই ধারাবাহিক থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি, নাম লেখালেন ক্যারাম-এ। আর সেটাই বদলে দিলো তার ক্যারিয়ারের গতিপথ। 

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তুমুল জনপ্রিয়তাকে সঙ্গী করে কেবলই সামনে এগিয়ে গেছেন মোশাররফ করিম। একের পর এক নাটকে অভিনয় করেছেন, দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে সেগুলো, নিজের দারুণ অভিনয়ের স্বীকৃতিও মিলেছে, কয়েক দফায় পেয়েছেন মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার। ফ্লেক্সিলোড, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ৪২০, জুয়া, ঠুয়া, লস, সিটি লাইফ, বিহাইন্ড দ্য সিন, পিক পকেট, জাঁতাকল, সাকিন সারিসুরি, তোমার দোয়ায় ভালো আছি মা, এফএনএফ, মাইক, দেনমোহর, বিহাইন্ড দ্য ট্র‍্যাপ, জিম্মি, চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই, আমি হিমু হতে চাই, হাউসফুল, খেলা- একটার পর একঅটা দুর্দান্ত নাটক উপহার দিয়েছেন কেবল। 

এরই মাঝে নাম লিখিয়েছেন সিনেমাতেও। জয়যাত্রা দিয়ে শুরু। তারপর রূপকথার গল্প, দারুচিনি দ্বীপ, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন, অজ্ঞাতনামা, প্রজাপতি, জালালের গল্প, কমলা রকেট, সবশেষ হালদা- প্রতিবারই ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন নিজেকে। টেলিভিশনে চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন, অজ্ঞাতনামায় ফজলুর রহমান বাবুর দুর্দান্ত অভিনয়ও ম্লান করতে পারেনি তাকে। 

মোশাররফ করিম

জনপ্রিয়তা অর্জন করা কঠিণ, তবে রক্ষা করাটা নাকি আরও কঠিণ। মোশাররফ করিম সেটার দারুণ এক উদাহরণ। জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে তার উচিত ছিল বেছে বেছে কাজ করা, সেখানে তিনি মানের সঙ্গে আপোষ করলেন। সিকান্দর বক্সের তুমুল জনপ্রিয়তা দেখে প্রতি ঈদেই সিকান্দার বক্সকে নিয়ে এলেন, ব্যাপারটা যে ভীষণ একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝেও সরে গেলেন না। তারপর জমজ এলো, ইউটিউবে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ, কিন্ত নাটকের মান? তলানীতে। এভাবেই দুর্দান্ত এক ভার্সেটাইল অভিনেতা নিজেকেই নিজে পরিণত করলেন কমেডিয়ানে। 

অথচ এই মোশাররফ করিম যখন 'দারুচিনি দ্বীপ' সিনেমায় স্টেশনে দাঁড়িয়ে আবুল হায়াতকে বলছিলেন, 'চাচা, আমি টাকাটা জোগাড় করতে পারি নাই তো, তাই এবার যাব না- তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি দেখে ইচ্ছে করছিল টিভি পর্দার ভেতরে ঢুকে গিয়ে আমিই তাকে টাকাটা দিয়ে আসি- এত জীবন্ত ছিল সেই অভিনয়! অথচ তুমুল প্রতিভাবান এই মানুষটা দিনের পর দিন পর্দায় ভাঁড়ামি করে গেছেন, লোক হাসিয়েছেন, জনপ্রিয়তার নেশায় পড়ে নিজের প্রতিভার প্রতি করেছেন অবহেলা। 

মোশাররফ করিম চাইলে কি করতে পারেন, সেটার নমুনা হয়ে আছে এই ঈদের দুটো নাটক বোধ এবং যে শহরে টাকা ওড়ে। একটু বেছে কাজ করলে, চরিত্রটাকে একটু সময় দিলে আজও তিনি ক্যামেরার সামনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক অভিনেতা- সেটাই যেন জানান দিয়েছে এই নাটক দুটো। এই মোশাররফ করিমকেই আমরা চাই বারবার, অথচ তিনি সেটা বুঝতে পারেন খুব কম। গত চার-পাঁচ বছরে তার কাছ থেকে কতকিছু পাওয়ার ছিল, আর কি পেয়েছি- এর হিসেব মেলাতে বসলে মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। 

অভিনেতা মোশাররফ করিম দুর্দান্ত, আর মানুষ মোশাররফ করিম যেন এক দার্শনিক। তাড়াহুড়া না থাকলে তিনি যেসব সাক্ষাৎকার দেন, সেগুলো মুগ্ধ হয়ে পড়া যায়, কিংবা শোনা যায়। জীবন নিয়ে তার যে ফিলোসফি, যেভাবে তিনি চিন্তা করেন, তারপর ভাবতে অবাক লাগে, এই লোক কিভাবে যমজ বা সিকান্দার বক্সের মতো সিরিজে টানা অভিনয় করেন? এক সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, অনেক তরুণ তো মোশাররফ করিম হতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন- 

মোশাররফ করিম

‘আমার প্রথম কথা হলো, মোশাররফ করিম হওয়ার চেষ্টা না করা। কারণ এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আলাদা। সবার মধ্যেই সূক্ষ্ম কোনো গুণ নিশ্চয়ই রয়েছে। সেটা বের করে প্রকাশ করা জরুরি। মাথায় রাখতে হবে, কাঁঠাল কিন্তু চৈত্র মাসে বলে না, আমি কেন পাকি না। প্রকৃতির নিয়মে সে জ্যৈষ্ঠ মাসেই পাকবে। একমাত্র মানুষই চৈত্র মাস অর্থাৎ অসময়ে চিৎকার করে। আমি পাকি না কেন? তাই সময়মতো ভালোবাসা দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। নিশ্চয়ই তুমি জ্বলে উঠবে।’

একই সাক্ষাৎকারব আরেকটা প্রশ্ন ছিল এরকম- মোশাররফ করিম হওটা কতটা কঠিণ কাজ? ‘প্রায়ই আমাকে অনেকে একটা কথা বলতে চায়, আমি অনেক স্ট্রাগল করে বড় হয়েছি। এটা ঠিক নয়। আমি আসলে স্ট্রাগল করা ছেলে নই। আমার যা ভালো লাগে আমি তা–ই করি। যেমন আমাকে ছোটবেলায় কখনো বাজারে পাঠাতে পারত না কেউ। আমার দর-কষাকষি ভালো লাগে না। এখনো যে সুপার শপে এসির মধ্যে বাজার, সেখানেও ভালো লাগে না। কিন্তু আমি যখন নাটকের দলে যোগ দিই, তখন থাকতাম খিলগাঁওয়ে। দলের মহড়া হতো নীলক্ষেতে। অনেক দিন আমি হেঁটে হেঁটে গিয়েছি সেখানে। যদি কেউ বলে এই হেঁটে যাওয়া স্ট্রাগল, তাহলে সেটা আমি মানব না। হেঁটে যেতেই আমার আনন্দ লাগত। তো যেটা করে আনন্দ পেতাম বা পাই, সেটা কী করে স্ট্রাগল হয়?’ 

প্রিয় এই অভিনেতার আজ জন্মদিন, এই দিনটাতে তার কাছে প্রত্যাশা থাকবে একটাই, আজেবাজে নাটকে নাম লিখিয়ে নিজের প্রতিভাকে তিনি আর অপমান করবেন না, আমাদেরকেও হতাশ করবেন না। আমরা মোশাররফ করিমকে হাউজফুল বা ক্যারামের মতো নাটকগুলো দিয়েই মনে রাখব, জমজ বা সেইরকম চা খোর দিয়ে নয়। 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা