মড্রিচ আদালতে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলেছেন, দেশের সঙ্গে বেইমানী করে একজন অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। সেই অপরাধের ক্ষমা নেই ক্রোয়েশিয়ানদের কাছে। মডরিচ যদি ২০১৮ বিশ্বকাপে দলকে চ্যাম্পিয়নও করে ফেলতেন, তবুও ক্রোয়েশিয়ান জনগণের মনটা জিততে পারতেন না...

কেউ বলেন হিরো। কেউ বলেন, আইডল। কারো মতে তিনি গত দশকের সেরা মিডফিল্ডার। মেসি রোনালদোর বলয় ভেঙ্গে ব্যালন ডি-অর জিতেছিলেন তিনি, মাঝারী মানের দল নিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে তুলেছিলেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। নিজের দেশে কিংবদন্তীর খেতাব পাওয়াটা তার প্রাপ্য। অথচ লুকা মডরিচের নামে ক্রোয়েশিয়ার মানুষ কি বলে জানেন? "লুকা মডরিচ, ইউ লিটল পিসেস অফ শিট!" বিশ্বাস হচ্ছে না? ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলকে যিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন, সেই মানুষটাকে নিয়ে গর্ব করার পরিবর্তে দেশের লোকজন তাকে ঘৃণা করবে কেন? চলুন, তাহলে একটা গল্প শোনাই আপনাদের।

অনেকদিন আগের কথা নয়, ধরুন, বছর বারো-চৌদ্দ আগেকার কথা। ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলে তখনকার প্রধান ব্যক্তিটির নাম ছিল ড্রাভকো মামিচ। দুর্নীতিগ্রস্থ এই লোক ডায়নামো জাগরেব ক্লাবের পরিচালকও ছিলেন তখন। ২০০৮ সালে টটেনহ্যামে যোগ দেয়ার আগে মডরিচও এই ক্লাবেই খেলতেন। মামিচের একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল। এখানে সেখানে তরুণ প্রতিভার খোঁজ পেলেই তিনি তার সঙ্গে চুক্তি করে রাখতেন, টাকা পয়সা দিয়ে তাদের সাহায্য করতেন। আর চুক্তিগুলো এমন হতো, যে সেই খেলোয়াড় পরবর্তীতে অন্য কোন ক্লাবে গেলে, বা ভালো বেতন পেলে সেখান থেকে বড় রকমের মুনাফা পাবেন মামিচ। মডরিচের সাথেও এমন চুক্তি ছিল তার। আরও অনেকের সাথেই ছিল।

২০০৮ এ মডরিচ যখন ডায়নামো জাগরেব ছেড়ে টটেনহ্যামে পাড়ি জমালেন, ট্রান্সফার অ্যামাউন্টটা ছিল ১০.৫ মিলিয়ন ইউরো। কিন্ত পর্দার আড়ালে থেকে মামিচ পেয়েছিলেন ৮.৫ মিলিয়ন ইউরো। এই অর্থ মডরিচ আর টটেনহ্যাম হটস্পার্স, দুই পক্ষের পকেট থেকেই গিয়েছিল। ট্যাক্স ফাঁকি সহ কয়েকটা মামলায় গ্রেফতার হবার পরে মামিচের এসব অবৈধ আয়ের বিষয়গুলো সামনে আসে, তখন তলব করা হয় মডরিচকে। মডরিচের সতীর্থ ভারসালিকো, মাতেও কোভাচিচ, এদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল আদালত, তাদের সঙ্গেও মামিচের চুক্তি ছিল। মামলার জবানবন্দীতে মামিচের বিরুদ্ধেই কথা বলেছিলেন মডরিচ। কিন্ত আদালতে গিয়ে মডরিচ যেটা করলেন, তাতে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল ক্রোয়েশিয়ার মানুষ। নিজের আগের জবানবন্দীটাকে বেমালুম অস্বীকার করে মড্রিচ দাবী করেন, তিনি যেসব বলেছেন, সেগুলো সত্যি নয়। এই সম্পর্কিত কোন তথ্যই তার মনে পড়ছে না, এমনকি মামিচের বিরুদ্ধে তার কোন অভিযোগও নেই, তার সঙ্গে মডরিচের যেসব চুক্তি ছিল, সবটাই ব্যাক্তিগত... 

ড্রাভকো মামিচের সঙ্গে লুকা মডরিচ

ক্ষোভে ফুঁসে উঠতে সময় নেয়নি ক্রোয়েশিয়ার মানুষ। একজন চিহ্নিত অপরাধীর বিরুদ্ধে এমন মৌনব্রত গ্রহণ করার ব্যাপারটা একটুও ভালো চোখে দেখেনি তারা। দেশের নানা জায়গায় মডরিচের ছবি সংবলিত বিলবোর্ড নামিয়ে ফেলা হয়েছে, রাস্তার মোড়ে আঁকা প্রতিকৃতির মুখে রঙ ঢেলে দিয়েছে কেউ কেউ। সেই থেকে শুরু। ক্রোয়েশিয়ার মানুষ এখনও ক্ষমা করতে পারেনি মডরিচকে। হয়তো মডরিচের জন্যে মামিচ বন্ধু ছিলেন, সাহায্যকারী ছিলেন, কিন্ত দেশের জন্যে তো তিনি শত্রু। সেই শত্রুকে বাঁচানোর চেষ্টাটা ঘরের ছেলে হয়ে মডরিচ কিভাবে করতে পারলেন, সেটা এখনও বোঝেন না অনেক ক্রোয়েশিয়ান।

ক্রোয়েশিয়ার পথেঘাটে বা রাস্তার পাশে দেয়ালে হুটহাট ইংরেজিতে মডরিচের নাম লেখা দেখতে পাবেন, সঙ্গে ইংরেজী হরফেই ক্রোয়েশিয়ান কোন বাক্য লেখা। হয়তো ভাবতে পারেন, কেউ বুঝি নিজের খেলোয়াড়ের প্রশংসা করছে! তবে ভাষাটা বুঝলে বোকা বনে যেতে সময় লাগবে না। এসব দেয়ালিকার শতকরা ৯০ ভাগই মডরিচকে ব্যাঙ্গ করে লেখা! কি লেখা আছে জানেন? 'মড্রিচ, তুই একটা পচা আবর্জনা!' 'লুকা, তুমি জাহান্নামে যাও!' 

ভাবতে পারেন, যে মানুষটা ক্রোয়েশিয়ার মতো মধ্যবিত্ত একটা দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন, শিরোপাটা জেতানোর জন্যে লড়ছেন, সেই মডরিচকেই কিনা তারা তুলোধোনা করছেন দেশের সঙ্গে বেইমানী করার জন্যে। ওদের কাছে সবার আগে দেশ, সবকিছুর ওপরে নীতিবোধ। ফুটবল, বিশ্বকাপ, শিরোপা, এসবের স্থান অনেক পরে। এজন্যেই ওরা মডরিচের দশ নাম্বার জার্সি গায়ে জড়িয়েও মডরিচের নামটা কেটে দেয়, সেখানে লিখে রাখে- 'I Can't Remember...' যে হোটেলে শরণার্থী জীবন কাটিয়েছিলেন মডরিচ আর তার পরিবার, সেখানে তারা লিখে আসে, 'একদিন তোমার সবকিছু মনে পড়ে যাবে লুকা...'

জাগরেবের দেয়ালে মডরিচের ছবিতে গালাগালি লিখে রেখেছে কেউ

২০১৭ সালে মামিচের ব্যাপারে মডরিচের সাক্ষ্য দেয়ার কিছুদিন পরে ক্রোয়েশিয়ায় একটা জরিপ হয়েছিল, সেদেশের সবচেয়ে ঘৃণিত দশ ব্যক্তি কে এটা নিয়ে। তালিকার এক নম্বরে ছিলেন ড্রাভকো মামিচ। আর দুই নম্বরে ক্রোয়েশিয়ানরা জায়গা দিয়েছিলেন মামিচের বন্ধু লুকা মড্রিচকে! হ্যাঁ, ক্রোয়েশিয়ার মানুষ এতটাই ঘৃণা করে তাদের এই ফুটবল আইকনকে! অবিশ্বাস্য হলেও, পুরোটাই সত্যি। কয়েকজনের সাফ জবাব, যে মিথ্যুক, বিশ্বকাপ জেতালে তো সে সত্যবাদী হয়ে যাবে না, মিথ্যুকই থাকবে!  

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচটা জিতে ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়েরা যখন ড্রেসিংরুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, দেশটার প্রেসিডেন্ট গ্রাভার কিতারোভিচ গিয়েছিলেন সেখানে। নিজের ছেলে মতো সবাইকে একে একে জড়িয়ে ধরেছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিও দেখে আপনি-আমি মুগ্ধ হয়েছি, শেয়ার দিয়ে দুটো লাইক কামিয়েছি। ক্রোয়েশিয়ানরা কিন্ত এটাকে পাবলিক স্ট্যান্টের বেশি কিছু ভাবতে রাজী ছিলেন না। পরের বছর ক্রোয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচন, আর সেজন্যেই একটু সহানুভূতি কামাতে চাইছেন কিতারোভিচ- এরকমটাই বিশ্বাস করেছে ক্রোয়েশিয়ার মানুষ। নইলে এটা তো নতুন কোন আইডিয়া নয়, জার্মানীর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলকেই নকল করছেন তিনি। শুনলে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, বেশিরভাগ ক্রোয়েশিয়ান কিন্ত এমনটাই মনে করে!

ক্রোয়েশিয়ানরা এটা দেখে না যে মড্রিচ কোন ক্লাবে খেলছেন, তিনি বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডার কিনা, কয়টা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা আছে তার নামের পাশে, কিংবা তার জেতা ব্যালন ডি-অরের মাহাত্ম্য কতটা- এগুলো তাদের দেখার বিষয় নয়। তারা শুধু দেখে, মড্রিচ আদালতে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলেছেন, দেশের সঙ্গে বেইমানী করে একজন অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। সেই অপরাধের ক্ষমা নেই ক্রোয়েশিয়ানদের কাছে। মডরিচ যদি ২০১৮ বিশ্বকাপে দলকে চ্যাম্পিয়নও করে ফেলতেন, তবুও ক্রোয়েশিয়ান জনগণের মনটা জিততে পারতেন না...

তথ্যসূত্র- ইএসপিএন এফসি, দ্য সান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা