তার মৃত্যুতে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন পড়ে গিয়েছিলো, ভেঙে পড়েছিলো তৎকালীন ইন্টারনেট ব্যবস্থা। তার নামটি মিলিয়ন মিলিয়ন বার সার্চ হবার কারণে গুগল কর্তৃপক্ষ ভাবে তাদের সার্চ ইঞ্জিন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। ফলে আধঘণ্টা বন্ধ থাকে গুগুল...

বিশ্ব মাতিয়েছেন অনেকেই। তার মতো করে মাতাতে পারেনি কেউই। তিনি একজন, সর্বকালের সেরা মাইকেল জ্যাকসন। তাকে ডাকা হয় কিং অফ পপ নামে। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল বিক্রিত অ্যালবামের সংগীত শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম তিনি।

সেই আশির দশকেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছান। বর্ণবাদী সেই সময়টাতে একজন কৃষ্ণাঙ্গের পক্ষে যা একেবারেই অসম্ভব ছিলো। সেসময় মানুষ টেলিভিশন ব্যবহার করতো জনপ্রিয় হবার জন্য। এক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো, বলা হয়ে থাকে যে তার গানের মিউজিক ভিডিও বদৌলতে এমটিভির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। গানের সঙ্গে জ্যাকশনের নাচের কৌশলগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার জনপ্রিয় নাচের মধ্যে রয়েছে রোবোট ও মুনওয়াক।

তার ডাকনাম ছিলো ওয়্যাকো জ্যাকো। যা খুব একটা পছন্দ করতেন না। ১৯৫৮ সালের ২৯শে আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকান-আমেরিকান এক দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। দশ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন অষ্টম। বাবা সামান্য ইস্পাত শ্রমিক, মা নিজেও খন্ড-কালীন কাজ করতেন। তবে তার মা-বাবার একটি ব্যাপারে খুব মিল ছিলো। তারা দুজনেই ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী। বাবা গিটার বাজাতেন আর মা পিয়ানো।

তাদের কাছ থেকেই মনে হয় এই গুনটা পেয়েছিলেন মাইকেল। তাইতো মাত্র চার বছর বয়স থেকেই গান গাওয়া শুরু করে দিলেন তিনি। বয়স যখন পাঁচ, তখন থেকেই পুরোদস্তুর স্টেজ পারফর্মার। তারা পাঁচ ভাই মিলে প্রতিষ্ঠা করেন গানের দল ‘জ্যাকসন ফাইভ’। প্রায় সাত বছর ভাইয়েদের সাথে গান গাওয়ার পর, ১৯৭১ সালে নিজের সোলো ক্যারিয়ার শুরু করেন মাইকেল জ্যাকসন।

সেই আইকনিক পোজে মাইকেল জ্যাকসন 

একে একে প্রকাশ পেতে থাকে তার মিউজিক অ্যালবাম। যার মধ্যে ‘অফ দ্য ওয়াল (১৯৭৯), থ্রিলার (১৯৮২), ব্যাড (১৯৮৭), ডেঞ্জারাস (১৯৯১) এবং হিস্টরি (১৯৯৫) এই পাঁচটি অ্যালবাম স্থান পায় বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত এলব্যামের তালিকায়। এর ভেতর ‘থ্রিলার’ এখনও পর্যন্ত ১১১ মিলিয়নের উপর বিক্রি হয়েছে, যা সর্বোচ্চ বিক্রিত হওয়া অ্যালবাম।

১৯৮৪ সালে আটটি গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। এক আসরে এতগুলো গ্র্যামি পুরস্কার ঝুলিতে ভরার রেকর্ড এত বছরেও ভাঙতে পারেননি আর কোনো সংগীতশিল্পী। জীবদ্দশায় মোট ১৩টি গ্র্যামি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনিই সবচেয়ে বেশি অ্যাওয়ার্ড ও নমিনেশন পাওয়া তারকা। এ জন্য হলিউড ওয়াক অব ফেমে ঠাঁই পেয়েছে তার নামে দুটি তারকা চিহ্ন। একটি তার নিজের জন্য, অপরটি জ্যাকসন ফাইভ ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে। সংগীতের স্বীকৃতিস্বরূপ এতো বড় সম্মাননা আর কেউই পায়নি।

এতো যশ, খ্যাতি, সম্মাননা, সফলতা পাবার পরেও তার চরিত্রের কিছু অন্ধকার দিকের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন খুব। শিশুদের প্রতি যৌনাসক্ত ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। জীবদ্দশায় অন্তত ২৪ জন বালককে যৌন হয়রানি করেছেন তিনি। আর এতে তিনি ব্যয় করেছেন ৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। 

দৃশ্যত মাইকেল জ্যাকসনের কাছে পর্নোগ্রাফি, জীবজন্তুদের উপর নিপীড়ন, স্যাডো-ম্যাসোকিজম আর শিশুদের উপর যৌন অত্যাচার সংক্রান্ত মিডিয়ার এক বিশাল সংগ্রহ ছিলো৷ এসব নথিপত্র নাকি ২০০৫ সালে জ্যাকসনের বিরুদ্ধে শিশু নিপীড়ন মামলার শুনানিতে পেশ করা হয়েছিলো৷ পরে অবশ্য সেই নথিপত্র আর প্রকাশ করা হয়নি৷ অবশেষে ২০১৩ আদালত মাইকেলকে নির্দোষ বলে রায় দেয়। তবুও, আমরণ এ বিতর্ক তার পিছু ছাড়েনি।  

তবে সুন্দর এই পৃথিবীর মোহ-মায়া তারও ছিল। তাইতো অমর হওয়ার পথ খুঁজেছিলেন তিনি। দেড়শো বছর বাঁচার পরিকল্পনা করেছিলেন। নিজের ক্লোনও তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কাড়ি কাড়ি অর্থ খরচ করেছিলেন এর পেছনে। তার অটোবায়োগ্রাফি লেখক এসব তথ্য জানিয়েছিলেন।

নিজের গায়ের রঙ নিয়ে আজীবন কমপ্লেক্সে ভুগেছেন তিনি। কোটি কোটি ডলার খরচ করে করিয়েছেন কসমেটিক সার্জারি। বদলেছেন গায়ের চামড়ার রঙ। প্রথম কসমেটিক সার্জারি করার পর একটি এক্সিডেন্টে তার নাক ভেঙে যায়। সেটাও পরে ঠিক করান অপারেশন করে।  তিনি ত্বকের সমস্যায়ও ভুগছিলেন। প্রায়ই তাকে মুখোশ পরা অবস্থায় দেখা যেত, ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে। যদিও তিনি দাবি করেন, আসলে চর্মরোগের কারণে তিনি প্লাস্টিক সার্জারি করাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে এ পর্যন্ত আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০০ মিলিয়নে। এটি জ্যাকসনের রেকর্ড পরিমাণ আয় করা ‘থ্রিলার’ অ্যালবামের চেয়েও বেশি। গান, নাচ ও ফ্যাশনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে বিতর্কিত পপসম্রাট বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে চার দশকেরও বেশি সময় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন।

কমপক্ষে ১৫০ বছর বেঁচে থাকার জন্য তৈরি করেছিলেন অক্সিজেন চেম্বার। সেখানেই ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে চেয়েছেন। সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু পাওয়ার জন্য তিনি এ পন্থা বেছে নিয়েছিলেন। অথচ তার মৃত্যু নিয়েও রয়েছে রহস্য। বলা হয়ে থাকে মাত্রাতিরিক্ত প্রপোফল সেবনে কার্ডিয়াক এরেস্টে ২০০৯ সালের ২৫ জুন ৫০ বছর বয়সে মৃত্যু হয় জ্যাকশনের।

তার মৃত্যুতে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন পড়ে যায়। ভেঙে পড়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থা। মাইকেল জ্যাকসন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকে তার ভক্ত ও সাধারণ মানুষ গুগলে সার্চ শুরু করে। মাইকেল জ্যাকসন শব্দটি মিলিয়ন মিলিয়ন বার ইনপুট হওয়ার কারণে গুগল কর্তৃপক্ষ ভাবে, তাদের সার্চ ইঞ্জিন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। যার কারণে তার মৃত্যুর দিনে আধঘণ্টা বন্ধ থাকে গুগুল। কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম।

বেঁচে থাকতে পুরো দুনিয়াকে মাতিয়েছেন, তার মৃত্যুতে যেন থমকে গিয়েছিলো বিশ্ব। এ জগতে অনেক শিল্পী এসেছেন, তবে এখনো তার সেই জায়গা কেউ দখল করতে পারেনি। কখনো পারবেও না বোধ হয়। তিনি যে একজন, মাইকেল জ্যাকসন। সর্বকালের সেরা সেনসেশন!   


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা