যত হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে সেই টাকা বের করতে পারলে করোনা চিকিৎসার টাকার অভাব তো হবেই না, উল্টো প্রণোদনাও দেয়া যাবে সবাইকে। আর না পারলে বুঝতে হবে এই রাষ্ট্র বারবারই এসব দুর্নীতিকে ছাড় দেয়।

সারা পৃথিবীতেই তো করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। কিন্তু কোথাও শুনেছেন করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ক কেনা নিয়ে সেখানে দুর্নীতি হয়েছে? কোথাও শুনেছেন একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত সেই দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে হয়েছে? না বাংলাদেশ বাদে আর কোথাও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমি অন্তত শুনিনি।

পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের কোন নাগরিক যদি শোনেন, করোনা মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে সাধারণ মাস্ক দেওয়া ঘটনা ঘটেছে নিশ্চয়ই তারা বিস্মিত হবেন। যখন শুনবেন হাসপাতাল থেকে চিঠি দিয়ে এই অভিযোগ জানানোর পরেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তখন সেই বিস্ময় আরো বাড়বে। আর যখন শুনবেন দেশটির দেশটির প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে কথা বলার পরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে তখন হয়তো তারা ভাববেন এ আবার কেমন দেশ? হ্যাঁ এই আমার বাংলাদেশ।

শুনে আনন্দিত হতেও পারেন, এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে সাধারণ মাস্ক দেওয়া ঘটনা তদন্তে সোমবার রাতে একটি কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। অথচ এই খবরটি টেলিভিশন ও পত্রিকায় এসেছিল আরো তিন সপ্তাহ আগে। যে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ঘটনা সেই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি কিন্তু স্থানীয় সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনিও এই অনিয়ম নিয়ে কথা বলেছিলেন। না কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 

দেখেন সারা দুনিয়া জানে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সেবা দেওয়ার সময় এন–৯৫ মাস্ক বা এফএফপি–২ মানের অথবা সমমানের মাস্ক লাগে। অথচ বাংলাদেশে কোথাও কোনো চিকিৎসক নাকি এন–৯৫ মাস্ক পাননি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাকি পাচ্ছে না কোথাও। অথচ দেখেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বলছেন, তিনি চায়না থেকে এই মাস্ক এনেছেন। 

আচ্ছা মানলাম এন–৯৫ মাস্ক পাননি, কিন্তু একটু ভালো মাস্ক তো দেবেন? যেসব মাস্ক পেয়েছেন সেগুলোর মান নিয়ে প্রথম থেকেই কিন্তু প্রশ্ন তুলেছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্তারা তা মেনে নেন নাই। উল্টো কয়েকজন ডাক্তারকে শোকজ করা হয়েছে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়েছে, যারা এসব নিয়ে কথা বলবেন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে। আজকে প্রধানমন্ত্রী চোখে আঙ্গুল দিয়ে না দেখিয়ে দিলে হয়তো তদন্ত কমিটিটাও হতো না। এই তদন্ত কমিটিটাও যে লোক দেখান একটা কমিটি সেটা বুঝতেও খুব বেশি জ্ঞানী হওয়া দরকার নেই। কিন্তু এটাই কি অনিয়মের একমাত্র ঘটনা? মোটেও নয়।

মাস্ক দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে হয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেও!

আচ্ছা আপনাদের আবজাল নামের সেই লোকটার কথা মনে আছে? ওই যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আবজাল হোসেন যিনি 'আলাদিনের চেরাগ' পেয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকায় তার বাড়ি।‌ তার স্ত্রী রুবিনা বেগমওএকই বিভাগে স্টেনোগ্রাফার পদে চাকরি করতেন। ধারণা করা হয়, ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বাগিয়ে বিদেশে পালিয়েছেন। 

আচ্ছা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের একজন কর্মচারীর যদি হাজার কোটি টাকা থাকে তাহলে সেখানকার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কি অবস্থা? কি অবস্থা প্রভাবশালী‌ ঠিকাদারদের? এই মন্ত্রী, সেই মন্ত্রী, মন্ত্রীর ছেলে আরো কত কিছু শোনা যায় তাদের কি অবস্থা? কত হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে? 

আমার জানা দুটো ঘটনার কথা বলি। বিসিএস অডিটের এক সৎ কর্মকর্তা বছর দশেক আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতি নিয়ে একটি অডিট করেছিলেন। হাসপাতালে মালামাল সরবরাহের নামে কি ধরনের ভয়াবহ অনিয়ম করা হয় সেই চিত্র ফুটে এসেছিল তার অডিট রিপোর্টে। তিনি আমাকে বলেছিলেন বাস্তবে যে দুর্নীতি তার সামান্যতম তিনি তার অডিট রিপোর্ট আনতে পেরেছিলেন। ফলাফল কী শুনবেন? 

ওই কর্মকর্তাকে তৎক্ষণাৎ বদলি করা হয়েছিল খুবই বাজে এক জায়গায়। ‌ তার বাকি চাকরির জীবনটা দুর্ভোগেই কেটেছে। আপনার কী জানেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত বছরের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। কারো বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? ওই ঘটনার পর দুদকের এক সৎ কর্মকর্তাকেই বদলি করা হয়েছিল বলে শুনেছি‌। 

প্রধানমন্ত্রী আজকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আজ বললেন, আপনারা যাদেরকে এনগেজড করেন, যাদেরকে ব্যবসাটা দেন বা যারা দেয় সাপ্লাই দেয়, তারা সঠিকটা দিল কি না দেখবেন। কিন্তু কেন দেখবেন তারা? কারণ তারা তো জানেনই মাল গুলো সব দুই নম্বর? এই যে দেখেন এন-৯৫ মাস্ক নয় জানার পরেও তারা কিন্তু এন-৯৫ এর বিল দিয়েছে। আসলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তো বছরের পর বছর ধরে‌ এসব দুর্নীতিই চলছে। 

হাসপাতালের যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে পর্দা- বালিশ সবকিছু কেনার নামে চলছে সেখানে শত শত কোটি টাকা লুটপাট।‌ জেলা উপজেলায় সরকারি হাসপাতাল গুলোতে গেলে বেরিয়ে আসবে আর বিবর্ণ চিত্র। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। আরেকটা ঘটনা বলি। 

সাংবাদিক বদরুদ্দোজা বাবু পাবনা জেনারেল হাসপাতাল ধরে একটি রিপোর্ট করেছিলেন পাঁচ বছর আগে। পাবনার সেই রিপোর্টটির সূত্র ধরে হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনাকাটার অনিয়ম নিয়ে কয়েক মাস পরেই আরো দুটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেন। দুটি রিপোর্টই একাধিক পুরস্কার পেয়েছে। কিন্ত আশ্চর্য্যজনকভাবে রিপোর্টগুলো সব সময় আড়ালে থেকে গেছে। কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 

বরং একদিকে দুর্নীতিবাজ ঠিকাদাররা ফুলে-ফেঁপে বড়লোক হয়েছেন। আরেকদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাঁপিয়ে বেড়ানো দুর্নীতিবাজ এক ঠিকাদারের সাথে হেলিকপ্টারে করে প্রভাবশালীরা ঘুরতেন। গত ১২ বছরের স্বাস্থ্য খাতে কত হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে কারা লুটপাট করেছে সেটি বের করতে পারলে ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসবে। 

রাষ্ট্রকে বলবো পারলে স্বাস্থ্যখাতে লুটপাট করা সেইসব দুর্নীতির খোঁজ নিন। কারা এসব দুর্নীতি করেছে, কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেখান থেকে ঘুষ পেয়েছে,‌ ঠিকাদার কারা ছিল, প্রভাবশালী কারা ছিল, দেশের হাসপাতালগুলোর কেন এত ভয়াবহ অবস্থা খোঁজ নিন। পারলে দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করুন। তাদের পেটে পাড়া দিয়ে টাকা বের করুন। যত হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে সেই টাকা বের করতে পারলে করোনা চিকিৎসার টাকার অভাব তো হবেই না, উল্টো প্রণোদনাও দেয়া যাবে সবাইকে। আর না পারলে বুঝতে হবে এই রাষ্ট্র বারবারই এসব দুর্নীতিকে ছাড় দেয়। আর এভাবেই ধ্বংস হয় প্রতিটি খাত।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা