বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনে ওই বাবা যেভাবে দেশকে ভালবেসেছেন, মাশরাফিও যে সেভাবে ভালবেসেছেন ক্রিকেটকে! ক্রিকেটকে তো মাশরাফি বলতেই পারেন, 'তুমি মিশেছো মোর দেহের সনে, তুমি মিলেছো মোর প্রাণে-মনে!'

'মামা, আমি কি বাঁচপানি? ও মামা! আমি কি বাঁচপানি?

ছেলেটার বয়স তখন মাত্র ১০বছর। বন্ধুদের সাথে খেলে বেড়াচ্ছিল নানা বাড়িতে। খেলতে খেলতে বেখেয়াল হয়ে পড়ে যায় ৩তলার বারান্দা থেকে! বন্ধুদের চিৎকার শুনে এগিয়ে আসে বাড়ির লোকজন। প্রাণপ্রিয় ভাগ্নেকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের পথে দৌঁড় দেন তার ছোট মামা। যাবার পথে এভাবে বার বার মামার কাছে মাশরাফির জিজ্ঞাসা ছিল যে সে বেঁচে থাকবে কি না!

আল্লাহর অশেষ রহমতে সেবার বেঁচে গিয়েছিলেন মাশরাফি। এমনকি হয়নি বড় কোন ইনজুরিও। বিস্ময়করভাবে ভাঙ্গেনি হাত-পাও। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রেখে ডাক্তাররাও জানিয়ে দেন,'বাড়ি নিয়ে যান, কিছুই হয়নি!'

সেবার ৩ তলা থেকে পড়ে গিয়েও যেই ছেলেটার কিছুই হয়নি, সেই ছেলেটাই এরপর অনেকবার পড়ে গিয়েছেন। তবে সব বার আর ছোটবেলার মত অল্পের পর দিয়ে যায়নি। হয়েছে একের পর এক ইনজুরি! ছোটবেলায় যে মাশরাফির পড়ে যাবার খবরে কেঁপে উঠেছিল তার পরিবারের মানুষের বুক, এরপর বিভিন্ন সময়ে তার জন্য কেঁপে উঠেছে পুরো দেশের মানুষের বুক। মনে হয়েছে, 'তবে কি, এবারই শেষ বার?'

খেলার মাঠে মাশরাফি পড়ে গেছেন অজস্রবার। সম্ভবত উঠে দাঁড়িয়েছেন তার চেয়েও বেশি বার। প্রতিবারই মনে হয়েছে হয়তো এইবারই শেষ বার। কিন্তু থামেননি মাশরাফি। কারণ তার অপরিসীম জীবনী শক্তি, তীব্র জেদ, খেলাটির প্রতি ছেলেমানুষী ভালবাসা আর বুক ভরা সাহস।

বুক ভর্তি সাহস নিয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন মাশরাফি

এই বুক ভরা সাহসের কথা বলতে গিয়েই মনে পড়ে গত এশিয়া কাপের ফাইনালে ড্রেসিংরুম থেকে লিটন দাসকে দেখানো তার 'বুকে সাহস রাখ' ইঙ্গিত। যেই সাহস বাংলাদেশ ক্রিকেটে মাশরাফি বয়ে এনেছিলেন ক্যারিয়ারের একেবারেই শুরুতে।

এই প্রসঙ্গে সবসময় মনে পড়ে মাশরাফির শুরুর দিকের অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনের কিছু কথা। তীব্র গতিতে জিম্বাবুয়ের ডিওন ইব্রাহিমের স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলা মাশরাফিকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'আগে আমরা বোলিং এর শুরুতে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে পারতাম না। মাশরাফি আসায় এখন সেটা সম্ভব হয়েছে!'

মাশরাফিকে দিয়েই আমরা জেনেছিলাম মাছে-ভাতে বাঙালি ছেলের পক্ষেও ক্রিকেটে গতির ঝড় তোলা সম্ভব। সম্ভব প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের বুকে কাঁপন ধরানো। আর অন্যকে ভয় দেখাতে পারা মানেই নিজের কলিজাতেও জড়ো হওয়া অসীম সাহস। যেই সাহস ছড়িয়ে যায় এক থেকে দশে, দশ থেকে হাজারে, হাজার থেকে লক্ষ-কোটিতে।

সর্বশেষ অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটির কথা মনে আছে? সেদিন ম্যাচের শুরুতেই শরীফুল-আর সাকিব কাঁপিয়ে দয়েছিলেন ভারতীয় ওপেনারদের। বোলিং এ তীব্র গতি হয়তো তাদের ছিল না, কিন্তু ছিল বুক ভরা সাহস। যেই সাহসটা এসেছে পূর্বসূরি মাশরাফির দেখানো পথ ধরেই। অথচ হালের ফেসবুক প্রজন্ম কত সহজে একজন মাশরাফির অবদানের কথা ভুলে যায়!

২০১২ সালের এশিয়া কাপ থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের এশিয়া কাপ। মাঝের এই সময়টাতে বাংলাদেশ দল কিন্তু খুব একটা খারাপ খেলছিল না। কিন্তু কেন জানি পক্ষে আসছিল না ফলাফল। 'কিসের জানি একটা ঘাটতি'তে বার বার ভাল খেলতে খেলতেও হার মানতে হচ্ছিল বাংলাদেশকে। সেই অজানা ঘাটতিটা পূরণ করতে দৃশ্যপটে অবির্ভাব 'অধিনায়ক মাশরাফি'র। 

অধিনায়কত্ব মাশরাফি আগেও পেয়েছেন। কিন্তু ইনজুরির কারণে দল থেকে ছিটকে পড়ে কন্টিনিউ করা হয়নি। ২০১৪এর শেষভাগে নতুন করে দায়িত্ব নিয়ে শুরু করেছেন নতুন যুগের সূচনা। এনে দিয়েছেন একের পর এক সাফল্য।

আর অধিনায়ক মাশরাফির তীব্র আলোর ঝলকানিতে আড়ালে পড়ে গেছে বোলার মাশরাফির অবদান। ইনজুরির কারণে শুরুর সেই তীব্র গতি হারিয়ে গেলেও নিয়ন্ত্রত বোলিং এ মাশরাফি ছিলেন দলের অন্যতম সেরা বোলার। ২০১৯বিশ্বকাপের ঠিক আগে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচে ৩টি করে উইকেট নিয়েছিলেন। সেই আয়ারল্যান্ড সিরিজে পাওয়া চোট পরবর্তীতে ভুগিয়েছে বিশ্বকাপেও। বড় বড় চোট-আঘাতকে বার বার হার মানিয়ে ফিরে আসা মাশরাফি একই চেষ্টা করেছেন বিশ্বকাপেও। কিন্তু এবার আর পারেননি।

আর সেই না পারার কারণে অনেকেই মাশরাফিকে বলতে শুরু করলেন, 'অনেক হয়েছে, এবার থামো!'

ক্রিকেটটা মাশরাফির কাছে বরাবরই ছেলেমানুষী আনন্দের নাম। ক্রিকেট জীবনের একদম শুরুতে একটা উইকেট পেলে তিনি যেমন আনন্দ পেতেন, এখনও ঠিক ততখানিই আনন্দ পান। গত কয়েকটা বছর মাশরাফি ক্রিকেট খেলা চালিয়ে গিয়েছেন এটা মাথায় রেখে যে, যেকোন ডেলিভারিই হতে পারে তার জীবনের শেষ ডেলিভারি। সেই মাশরাফি আপনার আমার কথায় ক্রিকেট ছেড়ে দেবে এটা আমরা কেমন করে ভেবে নিলাম?

জিম্বাবুয়ে সিরিজের শেষ ম্যাচের আগে মাশরাফি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, সেই ম্যাচের পর তিনি আর অধিনায়ক থাকছেন না। শুধু খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলে জায়গা পেলে খেলবেন, নাহল বাদ পড়বেন। এরপরেও কি আমরা মাশরাফিকে তার মতো থাকতে দিয়েছি?

ওয়েস্ট ইন্ডিজে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন মাশরাফি, শঙ্কা জেগেছিল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার

লেখার শুরুতেই বাংলালিংক এর একটা বিজ্ঞাপনের কথা মাথায় ভাসছিল। যুদ্ধাহত একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিদিন সকালে তার ছেলের হাত ধরে বাসার ছাদে যান। সেখান থেকে পাশের স্কুলে ছাত্রদের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে শোনেন। জাতীয় পতাকাকে সগর্বে উড়তে দেখেন।

তার ছেলেটা মাঝে মাঝেই বলে, 'আজও যাবা?' 'প্রতিদিনই কি যেতে হবে বাবা?' 'ডাক্তার না তোমাকে মানা করছে?'

ডাক্তার তো মানা মাশরাফিকেও করেছিল। জানিয়ে দিয়েছিল আরেকবার বড় ইনজুরিতে পড়ে অচল হয়ে যাওয়ার আশংকাও। মাশরাফি শোনেননি। সেই মাশরাফিকে অবসরের কথা বলার আপনি-আমি কে?

প্রতিদিন কেন এতো কষ্ট করে ছাদে যেতে হবে, তার জবাবে ঐ বাবা তার ছেলেকে বলেছিলেন, 'তুই কি একদিন নিঃশ্বাস নিয়ে, তিনদিন না নিয়ে থাকতে পারিস?'

ঐ বাবা যেভাবে দেশকে ভালবেসেছেন, মাশরাফিও যে সেভাবে ভালবেসেছেন ক্রিকেটকে! ক্রিকেটকে তো মাশরাফি বলতেই পারেন, 'তুমি মিশেছো মোর দেহের সনে, তুমি মিলেছো মোর প্রাণে-মনে!'

প্রিয় মাশরাফি, আপনিও তেমনি আমাদের মনে-প্রাণে মিশে আছেন...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা