গেম অফ থ্রোন্স এর কাহিনীর বিশালতা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন? মহাভারতের কাহিনী তার চাইতে কয়েক লক্ষ গুণ জটিল। মহাভারতের চরিত্রগুলো ল্যানিস্টার, স্টার্ক্স আর ডোথরাকিদের সবাইকে একসাথে যোগ করলে সেভেন কিংডমের যে জটিলতা হয়- তার কয়েকশ গুণ জটিল।

মহাভারতকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম 'উপন্যাস'। এই কথাটির সাথে আমি সর্বাংশে একমত। এরকম সুবৃহৎ পটভূমিতে এতগুলো চরিত্রের অসামান্য যে সমাহার, বিশ্বসাহিত্যে এর দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। কয়েক হাজার বছর ধরে কয়েক লক্ষ কবি বিন্দু বিন্দু করে এতে তাঁদের জ্ঞান যুক্ত করেছেন। মানব সম্প্রদায়ের ইতিহাসে মহাভারত হচ্ছে 'কালেক্টিভ নলেজ' এর শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। 

মহাভারতের আরেকটা নাম হচ্ছে 'জয়'। যে ব্যক্তি কোনোকিছুতে জয়লাভ করতে চান তিনি মহাভারত পড়লে মনস্কামনা পূরণ হয়- সেই থেকে এই নাম।মহাভারতে কি এমন কোনো মন্ত্রতন্ত্র আছে যা পড়লে আকাশ থেকে বিজয় নেমে আপনার হাতে ধরা দেবে? উত্তরটা হচ্ছে- একেবারেই না। বরং মহাভারতের কাহিনীর প্রতিটি ছত্রে ছত্রে যে সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ জ্ঞান লুকিয়ে আছে, এই জ্ঞান ব্যবহার করে জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব। আর কিছু না, স্রেফ স্ট্রাটেজিক দিক দিয়ে দেখলে মহাভারত একটি মাস্টারপিস।

শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধকৌশল, অন্যায়কারীর সাথে সংগ্রামে কূটকৌশলের ব্যবহার, স্থিতধীচিত্তে বিপদের মুখোমুখি হবার উপায়- প্রতিটা দিক পূঙ্ক্ষানুপূঙ্ক্ষভাবে বর্ণিত আছে মহাভারতে। দৃষ্টি উন্মুক্ত করে, মনের দুয়ার খুলে রেখে পড়তে থাকুন, সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন। 

গেম অফ থ্রোন্স এর কাহিনীর বিশালতা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন? মহাভারতের কাহিনী তার চাইতে কয়েক লক্ষ গুণ জটিল। মহাভারতের চরিত্রগুলো ল্যানিস্টার, স্টার্ক্স আর ডোথরাকিদের সবাইকে একসাথে যোগ করলে সেভেন কিংডমের যে জটিলতা হয়- তার কয়েকশ গুণ জটিল। 

টাইরিয়ন ল্যানিস্টারের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দেয়া বক্তৃতা দেখে শিহরিত হচ্ছেন? যুদ্ধের ঠিক পূর্বে কুন্তীর প্রতি কর্ণের কথাগুলো শুনুন, সহস্রগুণ আনন্দ পাবেন। একটা মহাভারতের কাছে ওরকম দশটা গেম অফ থ্রোন্স, বিশটা হ্যারি পটার আর ত্রিশটা লর্ড অফ দা রিংস স্রেফ নস্যি।

সারা পৃথিবীতে মহাভারতের কয়েক হাজারের বেশি ভার্সন আছে। ভীল উপজাতি পাণ্ডবদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছিল বলে শোনা যায়। তারা কৌরবদের পক্ষে ছিল। ভীল উপজাতির মহাভারতের কাহিনীতে পাণ্ডবরা অতি দুর্বল চরিত্র, নাগরাজ বাসুকি মহাশক্তিধর। এর মানে হচ্ছে, প্রচলিত কাহিনীর সম্পূর্ণ উল্টোপুরাণ গাওয়া হয়েছে এই মহাভারতে! নাগরাজ বাসুকি তো মূল মহাভারতে নামকরা চরিত্রগুলোর মধ্যে পড়েই না! মহাভারতের ধারাভাষ্যকার সৌতি ঠাকুর তো শুরুতেই বলেছেন- "আমার আগেও হাজার কবি মহাভারতের কথা লিখেছে, আমার পরেও হাজার কবি লিখবে"। মহাভারতের বিকৃতি নেই, যে কবি মহাভারতকে যেভাবে দেখবেন সেটাই মহাভারত! 

যুদ্ধরীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মবিদ্যা- কী নেই এতে! সবচাইতে বেশি আছে মানব চরিত্রের বিচিত্র চিত্রন! মহাভারতের চরিত্ররা নিপাট ভালোমানুষ বা নরাধম খল কোনোটাই নন। প্রত্যেকেই দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী। কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ, তা বিচার করার ভার আপনার। মহাভারত পড়ে আপনি জানতে পারবেন, প্রত্যেক সাধুর আছে একটা অতীত, আর প্রত্যেক পাপীর আছে ভবিষ্যৎ। আপনার দেখার পরিধি বাড়বে, বিশ্লেষণশক্তি বৃদ্ধি পাবে, একই ঘটনাকে অন্তত ডজনখানেক উপায়ে দেখতে পারবেন। মহাভারত পাঠ আপনার মস্তিষ্কের জন্য শ্রেষ্ঠতম ব্যায়াম।

বলুন তো মহাভারত পড়ার সবচাইতে বড় সুফল কী? আনন্দ। নির্ভেজাল, নিষ্কলঙ্ক, অমলিন আনন্দ। এই আনন্দের কাছে রাজার ঐশ্বর্যও তুচ্ছ। পৃথিবীতে দুই প্রজাতির মানুষ আছে। 

এক) যারা মহাভারত পড়েছে 

দুই) যারা অন্ধ

কীভাবে পড়বেন মহাভারত

১) একদম সহজ করে পড়তে চাইলে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর 'ছেলেদের মহাভারত' পড়তে পারেন।

২) সেবা প্রকাশনীর 'ছোটদের মহাভারত' পড়তে পারেন, মঞ্জুলা মকবুলের লেখা। বইটির পিডিএফ পাওয়া যায় একটু খুঁজলেই। 

৩) রাজশেখর বসুর 'মহাভারত- গদ্যসারসংক্ষেপ' পড়তে পারেন।

৪) কাশীরাম দাসের মহাভারত পদ্যানুবাদ সবচাইতে জনপ্রিয়, যদিও সেই সময়ের ভাষা পড়তে কষ্ট হতে পারে। 

৫) মাহবুব লীলেনের 'অভাজনের মহাভারত'- বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন। ঢাকাইয়া ভাষায় মহাভারতের মতো গুরুগম্ভীর মহাকাব্যকে এত অসামান্যভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারাটা স্রেফ অবিশ্বাস্য। এটারও পিডিএফ পাওয়া যায়। 

৬) সব মহাভারতের রাজা হচ্ছে হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের তেতাল্লিশ খণ্ডের সংস্কৃত-বাংলা মহাভারত। পুরো এক লক্ষ শ্লোকের টীকা টিপ্পণিযুক্ত অনুবাদ রয়েছে এতে। 

আমার এক মাসের বেতন খরচ হয়েছে এটা ভারত থেকে কিনে বর্ডার পার করে দেশে আনতে। এটা পড়তে হলে আপনাকে আমার মতো অর্ধউম্মাদ হতে হবে। মহাভারত পড়ুন, মনের অন্ধত্ব দূর করুন! 

সতর্কতা: আমার এ আলোচনা ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে নয়। অলৌকিকতা ইত্যাদি সম্পূর্ণ পরিহার করা হয়েছে এখানে।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা