পাহাড়ে ভোরগুলো একটু অন্যরকম হয়। প্রথমে চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে, তারও অনেকক্ষণ বাদে আকাশটা ফুঁড়ে লাল কুসুমের মতো সূর্যটা উঁকি দেয়। চারপাশ পাহাড়ে ঘেরা থাকায় সঙ্গে সঙ্গে সেটার দেখা মেলে না। পাহাড়ের মানুষগুলোও খানিকটা তেমনই, চট করে ওদের ভেতরকার প্রতিভাটা বোঝা যায় না।

যার কথা বলছি, হিমাচলের পাহাড়ি এলাকায় তেত্রিশ বছর আগে বনেদী একটা পরিবারে তার জন্ম। দাদা-পরদাদারা বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, গত শতকের মাঝামাঝি সময়টায় হিমাচল প্রদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের একজন ছিলেন তার প্রপিতামহ। এমনই ডাকসাইটে নেতা, যাকে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী চিঠি লিখতেন! 

বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি, তবে তার জন্ম হওয়াতে খুব একটা খুশি হয়নি কেউ। প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ায় এবার একটা ছেলের আশা করেছিল সবাই, আবারও মেয়ে হওয়াতে খুশির বদলে বরং বিরক্তির একটা আঁচ দেখা গেল।

ছোটবেলা থেকেই ভীষণ জেদি আর একরোখা ছিল মেয়েটা, যা বলবে, সেটা করেই ছাড়বে সে। সিনেমার পোকা ছিল, শাহরুখের দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে দেখে স্বপ্নের মেঘেরা উঁকি দেয়া শুরু করলো তার মনের আঙিনায়। জানালার পাশে বসে মেয়েটা শুধু ভাবতো, কাজলের জায়গায় যদি সে নায়িকা হতো, তাহলে কেমন দাঁড়াতো পুরো ব্যাপারটা? 

শিমলা তখনও মফস্বল শহরের মতোই। ছোট শহরের বাবা-মায়েরা যেমন হয়, পড়ালেখার জন্যে কড়াকড়ি করে সারাক্ষণ, এই পরিবারেও তেমনটাই ছিল। বাড়িতে যখন মেয়েকে সামলানো যাচ্ছিল না, তখন তাকে পাঠানো হলো চণ্ডিগড়ে, সেখানে কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করা হলো তাকে, থাকার ব্যবস্থা করা হলো কলেজ হোস্টেলেই। সেখানে স্বাধীনতার স্বাদ নেই, তবে লুকিয়ে ভোগ করা যায় সেটা। স্কুলের পড়ায় মেয়েটার মন বসে না, সেখানে ফাঁকি দিয়ে থিয়েটারে ভর্তি হয়ে গেল সে। ক'দিন পরে হোস্টেল ছেড়ে বান্ধবীদের সাথে বাসা নিলো, সেই খবর আবার পৌঁছে গেল বাড়িতে। দাদা আর বাবা এসে তাকে নিয়ে এলেন শিমলায়।

কঙ্গনা রনৌত

বকাঝকা করা হলো যথেষ্ট, তাতে কার কী? এসব কথা শুনতে বয়েই গেছে মেয়েটার! মেজাজ খারাপ করে বাবা বললেন, তুই আমার মেয়েই না! পড়ালেখা যদি না করিস, তাহলে আর একটা পয়সাও দেয়া হবে না তোকে। মেয়েও জেদ দেখিয়ে বললো, না দিলে না দেবে। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেই করণীয় ঠিক করে ফেললো সে। ভোরের সূর্য পাহাড়ের ফাঁকে উঁকি দেয়ার আগেই ঘর ছাড়লো সে, পেছনে তখন মা কাঁদছেন, বাবা হুঙ্কার দিচ্ছেন, আর দাদা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন। মেয়েটার যে খারাপ লাগেনি তা নয়, কিন্ত সে তো তখন নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটা শুরু করেছে, যে পথটা তাকে একদিন 'কঙ্গনা রনৌত' বানিয়ে দেবে, পরিচিত করে তুলবে কোটি মানুষের কাছে। 

শিমলা থেকে এবার দিল্লি চলে এলেন কঙ্গনা। তখন তার বয়স মাত্র ১৫! মডেল এজেন্সিগুলোর কাজকর্ম সম্পর্কে ধারণা ছিল আগে থেকেই, যোগাযোগ করলেন কয়েকটার সাথে, নিজের পোর্টফোলিও জমা দিলেন সেগুলোতে। এরমধ্যে এলিট মডেলিং এজেন্সি নামের একটা প্রতিষ্ঠানের কর্তারা তাকে বেশ পছন্দ করলেন, নতুন করে পোর্টফোলিও করা হলো তার। তবে একদম নতুন হওয়ায় শুরুতে কাজ মিলছিল না তেমন। বিজ্ঞাপনে এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবেই দিন পার করছিলেন। থাকা-খাওয়ার খরচাটা উঠে আসছিল অবশ্য। এরমধ্যে থিয়েটারও শুরু করলেন নতুন করে, চোখে পড়লেন অরবিন্দ গর নামের এক পরিচালকের। তার সঙ্গে বেশ কয়েকটা নাটকও করলেন।

মুম্বাইয়ের বিখ্যাত পরিচালক মহেশ ভাট তখন নিজের জীবনের ছায়া অবলম্বনে সিনেমা বানানোর জন্যে নায়িকা খুঁজছেন। অনুরাগ বসুর সঙ্গে আরেকটা সিনেমা বানানোর কথা চলছে তার, সিনেমার নাম গ্যাংস্টার। এক এজেন্টের মাধ্যমে মহেশ ভাটের অফিসে এলেন কঙ্গনা। মুম্বাইয়ে এর আগেও এসেছেন, পেহলাজ নেহলানির একটা সিনেমা করার কথা চলছিল তখন, পাকা হয়নি কিছুই। এরমধ্যে অডিশনের ডাক পড়লো ভাটদের অফিস থেকে। তাকে দেখে মহেশ ভাট বললেন, এই মেয়ের তো বয়স একদম কম, নায়িকা হিসেবে চলবে না। অতএব, বাতিল! 

কিন্ত কপালের লিখন, না যায় খণ্ডন! বিধাতা নিজের হাতে লিখে রেখেছিলেন, বলিউডে কঙ্গনার অভিষেক হবে মহেশ ভাটের সিনেমা দিয়ে, সেটা বদলানোর সামর্থ্য কি মানুষের আছে? কঙ্গনাকে বাদ দিয়ে চিত্রাঙ্গদা সিংকে নায়িকা হিসেবে নিয়েছিলেন ভাট আর বসু, কিন্ত ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চিত্রাঙ্গদা সরে দাঁড়ালেন গ্যাংস্টার থেকে। মহেশ ভাটের তখন প্রথমেই মনে পড়লো কঙ্গনার কথা, ডাকলেন তাকে, চুক্তি হয়ে গেল সেদিনই।

গ্যাংস্টারের সেই কঙ্গনা

২০০৬ সালে মুক্তি পেলো গ্যাংস্টার, দুর্দান্ত অভিনয় করে অভিষেকেই বাজীমাত করলেন কঙ্গনা, এক সিনেমাতেই খুশি করে ফেললেন দর্শক-সমালোচক সবাইকে! সেরা নবাগত অভিনেত্রী হিসেবে জিতে নিলেন ফিল্মফেয়ারও!  এরপরে ও লামহে, মহেশ ভাটের ড্রিম প্রোজেক্টেও তিনিই নায়িকা। বলিউডি নায়িকা পারভীন ববির আদলে সৃষ্ট চরিত্রে নিজেকে উজাড় করে দিলেন তিনি, আবারও কেড়ে নিলেন সব প্রশংসা।

ফ্যাশনে অভিনয়ের জন্যে পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জিতলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শাহরুখ খানের মতো অভিনেতা কৌতুক করে বলেন, অভিনয়ের জন্যে একটা জাতীয় পুরস্কার পেলে তিনি অভিনয় থেকে অবসরই নিয়ে নেবেন! সেখানে কঙ্গনার ঝুলিতে তিন তিনটা ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড! ২০১৪ আর ২০১৫ সালে টানা দু'বার সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন তিনি, কুইন এবং তানু ওয়েডস মানু রিটার্নস সিনেমার জন্যে।

কঙ্গনার ক্যারিয়ার নিয়ে লিখতে গেলে একটা শাহনামা হয়ে যাবে। দারুণ সব পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন, কেন্দ্রীয় চরিত্র না হয়েও সবটুকু আলো কেড়ে নিয়েছেন, তবে সবচেয়ে বেশি থেকেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই। সেটা নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই হোক, কিংবা অন্য কাউকে কথার শূলবিদ্ধ করেই হোক। তারকাখ্যাতি পাবার পরেও লোকে নাক সিঁটকেছে, এই মেয়ের চেহারায় তো মাধুর্য্য নেই, চুলগুলো এমন কেন, আরও কত যে কথা! আদিত্য পাঞ্চোলি থেকে অধ্যয়ন সুমন, কিংবা হালের ঋত্বিক রোশান, সবার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে জলঘোলা হয়েছেই। কিছু জায়গায় কঙ্গনা নিজেও তো দায়ী এসবের পেছনে!

চাঁছাছোলা কথাবার্তার জন্যে বি-টাউনে সুনাম (বা দুর্নাম) আছে তার, করন জোহর থেকে সনু সুদ কিংবা রনবীর সিং- কেউই রেহাই পাননি তার বাক্যবাণ থেকে। স্ট্রাগল করে আজকের এই পর্যায়ে এসেছেন, তাকে লড়তে হয়েছে নেপোটিজমের বিরুদ্ধে, তাকিয়ে দেখেছেন, কীভাবে তার রোলগুলো অন্য কোন তারকার সন্তানকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাই বরাবরই নেপোটিজমের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তিনি, করণের সঙ্গে তার যুদ্ধটাও মূলত একারণেই।

বরাবরই নেপোটিজমের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তিনি

সম্পর্ক আর ছাড়াছাড়ির ইস্যুতে তো অনেকদিন টক অব দ্যা টাউন ছিলেন কঙ্গনা-ঋত্বিক, ন্যাশনাল টেলিভিশনে এসে একচেটিয়া দোষারোপ করাটা ভুল, না ঠিক- সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তবে দিনশেষে এটাও মানতে হবে, তারকাখ্যাতি কঙ্গনাকে খুব একটা বদলে দিতে পারেনি। এখনও তিনি জেদি, একগুঁয়ে, ঠোঁটকাটা, বছর আঠারো আগে ঘর ছাড়ার সময়ে শিমলার কিশোরি মেয়েটা যেমন ছিল... 

ভালো আর মন্দ মিলিয়েই মানুষ। কঙ্গনাও তার ব্যতিক্রম নন। তবে বিতর্ক একপাশে রেখে অভিনয়প্রতিভার কথা যদি বলা হয়, তাহলে এই মূহুর্তে বলিউডের সেরা অভিনেত্রীদের একজন অবশ্যই কঙ্গনা। ওয়ান ওম্যান আর্মি বলতে যা বোঝায়, কঙ্গনা সেটাই। নারীপ্রধান সিনেমা হয়েও কুইন আর তানু ওয়েডস মানু রিটার্ন্স যে বক্স অফিস থেকে একশো কোটি রূপির বেশি আয় করেছে, সেটার বড়সড় কৃতিত্ব কঙ্গনা অবশ্যই পাবেন।

গত বছর রিলিজ পাওয়া মনিকর্ণিকাতে তো তিনি পরিচালকই ছিলেন, অবশ্য সেটা নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। খানদের সঙ্গে সিনেমা না করার ঘোষণা দেয়া, নেপোটিজম ইস্যুতে স্বোচ্চার হওয়া বা বলিউডে নিজের একটা ব্র‍্যান্ডভ্যালু তৈরি করা- সব মিলিয়ে কঙ্গনাকে অনন্য একজন বলতেই হয়। না বললে তার সংগ্রাম, তার প্রতিভা আর পরিশ্রমকেই অস্বীকার করা হবে...


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা