সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক কামাল লোহানী আর নেই। ঢাকার শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকালে তার মৃত্যু ঘটে। নানা রোগের পাশাপাশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮৬ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন তিনি।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে যে কয়জন কিংবদন্তীর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে কামাল লোহানী অন্যতম। পুরো নাম আবু নাইম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী এদেশে কামাল লোহানী নামেই তিনি ছিলেন সুপরিচিত। 

ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। সেই থেকে উত্তাল জীবনের পথচলা শুরু তার। ব্যক্তিজীবনে বেশ কয়েক দফা জেলও খেটেছেন। একই সাথে কারাগারে ছিলেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজদের মতো নেতাদেরও সাথেও। এক পর্যায়ে জড়িত হন বামপন্থী ধারার রাজনীতিতে।

জীবনের শুরু থেকেই ছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ সক্রিয়। ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রনাথ বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো। ১৯৬২ সালে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এরপর পাঁচ বছরের মাথায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন 'ক্রান্তি', যাতে সক্রিয় ছিলেন আলতাফ মাহমুদ সহ আরও অনেকে প্রথিতযশা শিল্পী।

আবার ষাটের দশকের শেষ দিকে যোগ দেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপে এবং সক্রিয় হন আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে। ওই সময় পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে শিল্পীদের সংগঠিত করার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি যে খবরটি শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল, সেই বিজয়ের খবরটি এসেছিল কামাল লোহানীর কণ্ঠে, “আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।” খুব সংক্ষিপ্তভাবে এক কথায় বলেছিলেন কামাল লোহানী, তারপর নিজেরা মেতেছিলেন বিজয় উদযাপনে, সেই সঙ্গে গোটা দেশও। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ বেতারের পরিচালকের দায়িত্ব পান।

পঁচাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আবারো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িত হন। পরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নীতিবিরোধী ক্ষমতাবানদের সাথে মতবিরোধে জড়িয়েছেন আজীবন। তবুও কর্মক্ষেত্রে কখনো আপোস করেননি এই মানুষটা। ১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হলে ‘দৈনিক বার্তা’ ছেড়ে ‘বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট’ এ যোগ দেন।

১৯৯১ সালে তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ষোলো মাসের মাথায় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি পিআইবিতে ফিরে আসেন। ২০০৮ সালে দুই বছরের জন্য আবার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। 

রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাইরে কামাল লোহানীর দীর্ঘ পেশাগত জীবন ছিলো সাংবাদিকতায়। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৫ সালে একুশে পদক পান তিনি। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় কাজ করার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।  

৮৫তম জন্মদিনের সংবর্ধণায় কামাল লোহানী 

কাজের পাশাপাশি নেতৃত্ব দিয়েছে সাংবাদিকদের সংগঠনুগলোতেও। অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ছায়ানট ছাড়াও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাথে কামাল লোহানীর সংশ্লিষ্টতা ছিলো দীর্ঘকালের।

বাঙালির দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পথ ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের চার দশকে - রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যে অসামান্য ভূমিকা তিনি রেখে গেছেন তা সবসময়ই নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীনতা থেকে নিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আত্মনিবেদিত ছিলেন কামাল লোহানি। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভ্রুকুটির তোয়াক্কা না করে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার লড়াকু সৈনিক ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসটা যতটা না গণমাধ্যমের, তারচেয়েও বেশি বস্তুনিষ্ঠতার। একটা সময় ছিলো যখন এদেশের সাংবাদিকেরা নিজেদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতেন না। নৈতিকতার মানদণ্ডে যেটা ঠিক মনে করতেন সেটার পক্ষেই কলম ধরতেন, কথা বলতেন। সেই উত্তাল সময়গুলোর ধারক ও বাহক ছিলেন কামাল লোহানী। করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন এই কিংবদন্তী। তার জন্য রইলো বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী।

আরও পড়ুন- 

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা