নিজেকে ইমাম মেহেদি হিসেবে দাবি করা এক ব্যক্তি ও তার অনুসারীরা পবিত্র মক্কা শরিফকে বন্দুক হাতে দখল করেছিল- আর কাবাকে মুক্ত করতে ফ্রান্স/আমেরিকার কমান্ডোদের সাহায্য নিতে হয়েছিল সৌদি আরবকে! কি ছিলো সেই ঘটনা? 

আল বাকী আল মিজান:

আমাদের ধর্মে ইমাম মেহেদি নামটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছেন। কথিত আছে, পৃথিবী যখন অন্যায় আনাচারে ভরে যাবে, মুসলিমরা যখন অত্যাচারিত হবে, তখন ইমাম মেহেদি নামক একজন বীর এসে মুসলিমদের রক্ষা করবেন। এই ভবিষ্যতবাণী নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ঠিক কবে তিনি আসবেন তা শুধুমাত্র আল্লাহপাকই ভাল জানেন! আর এই বিষয়টা অনেক জঙ্গী সংগঠন কাজে লাগিয়ে মানুষ কে বিভ্রান্ত করে, তাদের বিশ্বাস কাজে লাগিয়ে নিজেদের সংগঠনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।  

সাম্প্রতিক সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে কিছু চরমপন্থি গ্রুপ একই কথা ছড়াচ্ছে যে, কিয়ামত অতি নিকটে! আবার সিরিয়ার কোরআনিক নাম শাম! আর এই শাম থেকেই কিয়ামত শুরু হওয়ার কথা বলা আছে! তাই এটাই সেই কিয়ামত- সবাই জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নিন! বর্তমান সময়ের মত অতীতেও বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠন ইমাম মেহেদি আসার ঘোষনা দিয়েছিল। তাদের প্রত্যেকেই এক বা একাধিক হাদিস (জাল হাদিস বা সহিহ হাদিস) এর ভবিষ্যতবানীকে প্রমান হিসেবে দেখিয়েছিল। কিছু মানুষ তাদের দাবীকে বিশ্বাসও করেছিল। 

এখন পর্যন্ত দুইজন ব্যক্তি নিজেকে ইমাম মেহেদি দাবী করে আন্দোলন করেছিলেন। একজন সুদানের মেহেদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন! ইউরোপীয়রা যখন প্রথম সুদান দখল করে, তখন তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন- পরে গ্রেফতার এবং শহিদ হন! আরেকজন কট্টরপন্থী সালাফি ওয়াহাবি - মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ। তিনি ১৯৭৯ সালে মক্কায় নিজেকে ইমাম মেহেদি হিসেবে দাবি করেছিলেন এবং পবিত্র মক্কা শরিফ বন্দুক হাতে দখল ও করেছিলেন- আর তা মুক্ত করতে ইহুদী নাসারা খ্যাত ফ্রান্স/আমেরিকার সাহায্য লেগেছিল! কি ছিলো সেই ঘটনা? 

ডেডলাইন ১৯৭৯ সালের ২০শে নভেম্বর। আরবি ক্যালেন্ডারে এই দিনটির একটা প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। একটা নতুন শতাব্দীর শুরু সেদিন, হিজরী ১৪০০ সালের প্রথম দিন। পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদ আল হারাম, বা হারাম শরিফ সেদিন হাজার হাজার মানুষে পরিপূর্ণ। সারা পৃথিবীতে থেকে আসা মুসলিমরা সেদিনের ফজরের নামাজে যোগ দেয়ার অপেক্ষায়। মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে চতুস্কোণ কাবা-কে ঘিরে। এটি হচ্ছে ইসলামের পবিত্রতম স্থান। ফজরের নামাজ মাত্র শেষ হতে চলেছে। হঠাৎ সাদা কাপড় পরা প্রায় শ'দুয়েক লোকজন অস্ত্র হাতে বেরিয়ে এলো নামাজীদের মধ্য থেকে। এই অস্ত্র তারা আগেই সেখানে পাচার করে নিয়ে এসেছিল জানাজার খাটিয়ায় করে। 

কয়েকজন অস্ত্রধারী গিয়ে অবস্থান নিল ইমামের চারপাশে। ইমাম যখন তার নামাজ শেষ করলেন, অস্ত্রধারীরা মাইক্রোফোনের নিয়ন্ত্রণ নিল। তারপর তারা মাইকে এমন এক ঘোষণা দিল, যা শুনে হতবাক হয়ে গেল সবাই। অস্ত্রধারীদের একজন মাইকে বলছিল, "আল্লাহপাক প্রতি শতাব্দীতেই একজন ধর্ম সংস্কারক পাঠান । আজ নতুন শতাব্দী শুরু হয়েছে। ১৪০০ সালের ১লা মহররম আজ আমাদের মাঝে এই জমানার ধর্ম সংস্কারককে পেয়ে গেছি।'' তিনি আরো বলেন, ''আমরা আজ ইমাম মাহদীর আবির্ভাব ঘোষণা করছি। তিনি বিশ্বে ন্যায় বিচার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। যে বিশ্ব এখন অন্যায়-অত্যাচার এবং অশান্তিতে ভরে গেছে।" 

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, ইমাম মাহদী বিশ্বে আবির্ভূত হবেন ইসলামকে পুনরুদ্ধার করতে। কেয়ামতের আগে দাজ্জালের শাসনকে উৎখাত করে ইমাম মাহদী বিশ্বে ইসলামকে পুনপ্রতিষ্ঠা করবেন। কেয়ামতের পূর্বে বিশ্ব ধ্বংস হওয়ার আগে ঘটবে এই ঘটনা। সেদিন মক্কায় এই ঘোষণা যারা শুনছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন এক মাদ্রাসা ছাত্র, যিনি মাত্রই তার হজ্জ্ব শেষ করেছেন। বিবিসির সাংবাদিককে তিনি বলেন , "আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম যখন নামাজের পর পরই কিছু লোক হারাম শরিফে মানুষের উদ্দেশে কথা বলার জন্য মাইক্রোফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। তারা বলছিলে, মাহদী পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষ খুশি হয়েছিল যে, যিনি পৃথিবীকে বাঁচাবেন, সেই ত্রাতা, তিনি আত্মপ্রকাশ করেছেন।"

"মানুষ ছিল খুবই উৎফুল্ল। তারা জোরে 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনি দিচ্ছিল।"

যে সশস্ত্র গ্রুপটি সেদিন কাবা এবং হারাম শরিফের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, তারা ছিল সালাফিপন্থী একটি কট্টর সুন্নী গোষ্ঠী। তাদের নেতা ছিলেন এক বেদুইন, জোহাইমান আল ওতাইবি। মসজিদের মাইকে জোহাইমান আল ওতাইবি ঘোষণা দিলেন, ইমাম মাহদি সেখানে তাদের মাঝেই আছেন। তার এই ঘোষণার পর সশস্ত্র গ্রুপটির মধ্য থেকে একজন সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি জোহাইমানের সম্পর্কিত ভাই। তার নাম মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল কাহতানি। জোহাইমান দাবি করলেন, এই মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল কাহতানিই হচ্ছেন ইমাম মাহদী। যিনি আসবেন বলে ইসলামে আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে “আল্লাহ তায়ালা আমার বংশ হতে এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন। আমার নামেই তাঁর নাম, তাঁর পিতার নাম আমার পিতার নামেই থাকবে।” (সহিহ আল-জামে, হা/৫০৭৩, মুসনাদে আহমদ ৩/২৬-২৭, তিরমিযী, হা/২২৩২)। 

জোহাইমান আল ওতাইবি

জোহাইমান দেখালেন, এই ইমাম মেহেদির নাম মোহাম্মদ, তার বাবার নাম আব্দুল্লাহ, আর কাহতানি বংশ কুরাইশ বংশের একটি শাখা। এরপর মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন কাহতানি মসজিদের মিম্বর আর মাকামে ইব্রাহিম (কাবা ঘরের বাইরের একটি জায়গা। কথিত আছে এখানে হযরত ইব্রাহীম (আ) কাবা নির্মানের সময় মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতেন) এর মাঝামাঝি দাঁড়ালেন। যোহাইমান আল ওতাইবি মাইকে একটি হাদিস পড়ে শোনালেন। উম্মুল মুমেনীন উম্মে সালামা (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা:) বলেন- জনৈক খলীফার মৃত্যুকে কেন্দ্র বিরোধ সৃষ্টি হবে। মদিনার একজন লোক তখন পালিয়ে মক্কায় চলে আসবে। মক্কার লোকেরা তাকে খুঁজে বের করে অনিচ্ছা সত্তেও রুকন এবং মাক্কামে ইবরাহীমের মাঝামাঝি স্থানে বায়াআত গ্রহণ করবে (আবু দাউদ শরীফ)। 

এই হাদিস শুনিয়ে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন, যেহেতু তার নাম মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ এবং রুকন ও মাকামে ইব্রাহিম নামক স্থানের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন, সুতরাং তিনিই ইমাম মেহেদি। তারপর যোহাইমান সামনে এগিয়ে আসলো এবং ইমাম মাহদীর প্রতি তাঁর আনুগত্য ঘোষণা করলো। সে লোকজনকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হলো যে, ইনিই হচ্ছেন মাহদী। তখন সবাই মাহদীর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে শুরু করলো। সেদিন ঘটনার সময় মসজিদের ঠিক বাইরে ছিলেন আরেক মাদ্রাসা ছাত্র আবদুল মোনায়েম সুলতান। কী ঘটছে তা জানতে তিনি মসজিদের ভেতরে ঢুকলেন।

"হারাম শরিফের ভেতর সশস্ত্র লোকজন দেখে লোকজন খুব অবাক হয়ে গেল। সেখানে এরকম দৃশ্য দেখতে তারা অভ্যস্ত নয়। কোন সন্দেহ নেই যে, এই দৃশ্য দেখে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল খুবই আপত্তিকর একটি ঘটনা।"

বিদ্রোহীদের নেতা জোহাইমান পবিত্র কাবাকে ঘিরে একটি অবরোধ তৈরির নির্দেশ দিলেন। মসজিদের মিনারগুলিতে জোহাইমান বন্দুকধারীদের অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দিলেন, যাতে কেউ হামলা করলে তাদের প্রতিরোধ করা যায়। সরকারী বাহিনী কিছুই জানতে পারছিল না যে ভিতরে কি হচ্ছে। সৌদি পুলিশ বাহিনীর একটি দল প্রথম এগিয়ে এলো কী ঘটছে দেখতে। বন্দুকধারীদের দৃষ্টিতে সৌদি শাসকগোষ্ঠী হচ্ছে দুর্নীতিগ্রস্থ, নৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং পাশ্চাত্য দ্বারা কলুষিত। কাজেই সৌদি পুলিশকে দেখা মাত্র তারা গুলি চালাতে শুরু করলো। অনেকেই নিহত হলো। শুরু হলো কাবা এবং হারাম শরিফকে ঘিরে অবরোধ। 

মার্ক হেমলি তখন সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাসে একজন 'পলিটিক্যাল অফিসার' হিসেবে কাজ করেন। তার দফতর ছিল জেদ্দায়। ঘটনার পরই সৌদি সরকার এই খবর প্রচারের উপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। খুব কম লোকই জানতো কারা কী কারণে মসজিদ দখল করেছে। একজন মার্কিন হেলিকপ্টার পাইলটের কাছ থেকে ঘটনার প্রতি মূহুর্তের বিবরণ পাচ্ছিলেন হেমলি। হেলিকপ্টারটি মক্কার আকাশে চক্কর দিচ্ছিল। এতে ছিল সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা।

"যে বন্দুকধারীরা গুলি করছিল, তাদের হাতে খুবই ভালো অস্ত্র ছিল। বেশ ভালো ক্যালিবারের বন্দুক। তারা বেশ কিছু লোককে গুলি করে মেরে ফেলতে সক্ষম হয়।" "বন্দুকধারীদের মোকাবেলায় প্রথম চেষ্টাটা ছিল খুবই কাঁচা। অল্প সংখ্যাক ন্যাশনাল গার্ড এবং সামরিক বাহিনীর সদস্য প্রথম সেখানে গিয়েছিল। তারা বেশ সাহসী প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু তাদের সাথে সাথেই গুলি করে মেরে ফেলা হয়।"

কাবা শরীফের ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সুহাইল নারীর ছদ্মবেশ ধরে সেখান থেকে পালালেন এবং সৌদি সরকারকে ভিতরের সিচুয়েশন জানালেন। কাবা শরীফ পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান চালানো হবে কিনা সেটা নিয়ে সবাই দ্বিধান্বিত ছিল । এরা যদি সত্যিই ইমাম মেহেদির দল হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে সেটা খুব পাপ কাজ হবে । কিন্তু এরা যদি ইমাম মেহেদি না হয়ে থাকে, তাহলে কাবা ঘরকে এদের হাত থেকে মুক্ত করা উচিত। সৌদি আরবের প্রধান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ত্ব এ বিষয়ে কোনো ফতোয়া (ধর্মীয় মতামত) দিতে অস্বীকার করলেন। 

অবশেষে কাবা অবরোধের ঘটনার ৮ দিন পর সরকার অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিল। সৌদি সরকার সেখানে হাজার হাজার সৈন্য এবং কমান্ডো পাঠায় মসজিদ পুনর্দখলের জন্য। পাঠানো হয় সাঁজোয়া যান। মক্কার আকাশে উড়তে থাকে যুদ্ধ বিমান। সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে ইমাম মেহেদি এবং তার দল কোরান হাদিস থেকে বিভিন্ন আয়াত পড়তে লাগল। সেই সব আয়াত বলে তারা সৌদি পুলিশ আর আর্মিকে কনভিন্স করতে পারল যে ইনি ইমাম মেহেদি, এর বিরুদ্ধে গুলি করা উচিত হবে না। তারা জাস্ট কাবা ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল, গোলাগুলি করল না। 

তখন সৌদি সরকার ফ্রান্স থেকে কয়েকজন কমান্ডো নিয়ে এলো। কিন্তু তাদেরকে মক্কায় নেওয়া যাচ্ছিল না। আইন অনুযায়ী মক্কার ভিতরে কোনো অমুসলিম ঢুকতে পারবে না। তাদেরকে অফার দেওয়া হল, তোমরা কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে মক্কার ভিতরে ঢুকো, কিন্তু ফ্রেঞ্চ কমান্ডোরা তাদের ধর্ম ত্যাগ করতে রাজি হলো না। অবশেষে বিশেষ ব্যবস্থায় তারা মক্কার ভিতরে ঢুকলো। ফ্রেঞ্চ কমান্ডোদের নেতৃত্বে তখন অভিযান শুরু হলো। পরবর্তী কয়েকদিনে সেখানে তীব্র লড়াই শুরু চলল। সৌদি সরকারি বাহিনী এবং ফ্রেঞ্চ যৌথভাবে একের পর এক হামলা চালাতে লাগলো। মসজিদের একটি অংশ বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হলো। আবদুল মোনায়েম সুলতান বর্ণনা দিচ্ছিলেন সেই লড়াইয়ের-

"সারা রাত ধরেই গোলাগুলি আর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পরদিন ভোর পর্যন্ত এভাবে গোলাগুলি চললো। হারাম শরিফের মিনার লক্ষ্য করে গোলা ছোঁড়ার দৃশ্যও আমি দেখেছি। মক্কার আকাশে সার্বক্ষণিকভাবে হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখেছি।"

মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল কাহতানি এই লড়াইয়ের পুরোভাগে ছিলেন। নিজের চোখে তা দেখেছেন আবদুল মোনায়েম সুলতান।

"আমি মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল কাহতানিকে দৌড়াদৌড়ি করে নিহত সেনাদের অস্ত্র কুড়িয়ে নিতে দেখেছি। এসব অস্ত্র তিনি তাদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন, যারা তাদের অস্ত্র হারিয়েছে। বা যাদের গুলি ফুরিয়ে গেছে।" "দ্বিতীয় দিন আমি তার চোখের নীচে দুটি ছোট আঘাতে চিহ্ন দেখলাম। তার পরনের জোব্বায় গুলি লেগে যেন ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল। তার বিশ্বাস ছিল, তিনি নিজেকে যে কোন বিপদের সামনে দাঁড় করাতে পারেন, কারণ তিনি নাকি অমর। কারণ তিনি হচ্ছেন মাহদী।"

আবদুল মান্নান সুলতান সেই লড়াইয়ের মধ্যে বিদ্রোহীদের নেতা জোহাইমেনকেও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান:

"আত্মরক্ষার জন্য আমরা কাবা'র পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। কারণ ঐ জায়গাটা অনেক বেশি নিরাপদ ছিল। তিনি সেখানে বড়জোর আধঘন্টা বা ৪৫ মিনিটের মতো ঘুমালেন। তার মাথা ছিল আমার পায়ের ওপর। তাঁর স্ত্রী পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী সারাক্ষণই পাশে ছিলেন, এক মূহুর্তের জন্যও তাকে ছেড়ে যাননি। কিন্তু লড়াই যখন তীব্র হয়ে উঠছিল, তখন গোলাগুলির প্রচন্ড শব্দে তিনি জেগে উঠেন। তাকে ডাকছিল তার সহযোদ্ধারা। তিনি অস্ত্র নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন।"

সৌদিরা এর মধ্যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল মসজিদ পুনর্দখলের। বলছিলেন মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা মার্ক হেমলি।

"সৌদি বাহিনীর কিছু এপিসি মূল মসজিদ চত্ত্বরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছিল। তারা ঢুকতেও পেরেছিল। কিন্তু জোহাইমানের লোকজন বেশ ভালো কৌশল নিয়েছিল। তাদের কাছে মলোটভ ককটেল ছিল। তারা মলোটভ ককটেল ছুঁড়তে থাকে এপিসির ওপর।"

শেষ পর্যন্ত সৌদি বাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ি মসজিদ চত্বরে ঢুকলো। তারা মসজিদের দ্বিতীয় তলার গ্যালারিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিল। বেশিরভাগ বন্দুকধারী জঙ্গী তখন মসজিদের ভুগর্ভের করিডোরে গিয়ে আশ্রয় নিল। সেই অন্ধকার জায়গা থেকেই তারা পরবর্তী কয়েকদিন ধরে লড়াই করে গেল। লড়াই আরও তীব্র হয়ে উঠলো। সৌদি সরকারি বাহিনী তীব্র গোলা বর্ষণ শুরু করলো। এই প্রচন্ড গুলির মুখে সবাই ভূগর্ভস্থ কামরায় গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। কিন্তু তারপরই খবর আসলো, এই কথিত ইমাম মাহদী নিজেই গুলিবিদ্ধ এবং মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। অথচ তিনি যদি সত্যিই মাহদী হন, এমনটি হওয়া অসম্ভব! সেই সময়ের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন আবদুল মোনায়েম সুলতান।

"মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ তখন দ্বিতীয় তলায়। যখন তার গায়ে গুলি লাগে, তখন লোকজন চিৎকার করে বলতে থাকে, ইমাম মাহদী আহত হয়েছেন! ইমাম মাহদী আহত হয়েছেন! কেউ কেউ তাঁর দিকে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাঁকে উদ্ধারের জন্য। কিন্তু প্রচন্ড গোলাগুলির জন্য কেউ আগাতে পারছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের পিছু হটতে হয়। কিছু লোক নিচে যায় জোহেইমানকে দেখতে। আমি তাকে জানালাম, ইমাম মাহদী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু জোহেইমান সবাইকে বললেন, লোকের কথা বিশ্বাস করো না। ওরা আসলে দলত্যাগী বিশ্বাসঘাতক!"

মক্কাকে ঘিরে এই অবরোধের অবসানের জন্য সৌদিরা তখন ফরাসী সামরিক অধিনায়কদের সঙ্গে শলাপরামর্শ শুরু করলো। ফরাসী বিশেষ বাহিনীর এই অধিনায়কদের গোপনে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। তারা পরামর্শ এবং অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছিল। এরা মসজিদের ভুগর্ভে যেখানে জঙ্গীরা লুকিয়ে আছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ সিএস গ্যাস ছাড়ার পরামর্শ দিল। আবদুল মোনায়েম সুলতান নিজেও তখন সেই গ্যাস হামলার শিকার হন।

"সেখানে বাতাসে তীব্র কটু গন্ধ পাচ্ছিলাম আমরা, সেখানে থাকাটা খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। হয়তো পোড়া টায়ারের গন্ধ, কিংবা যারা মারা গেছে, তাদের দেহের পচা গন্ধ ভাসছিল সেখানে। সেই সঙ্গে সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমরা বুঝতে পারছিলাম, আমরা মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছেছি। গ্যাসে আমাদের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছিল। আমি জানিনা, কিভাবে আমি সেখান থেকে বেঁচে গেলাম।"

ফরাসী কমান্ডোদের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গীরা

তবে অন্য একটি বর্ননায় পাওয়া যায়, কাবার বেজমেন্ট পানি দিয়ে চুবানো হয়েছিল । পরে সেই পানিতে সক্রিয় ইলেক্ট্রিক তার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল । ফলে অনেকে ইলেক্ট্রিক শক খেয়ে মারা যায়। শেষ পর্যন্ত যে জঙ্গীরা বেঁচে ছিল, তারা আত্মসমর্পণ করলো। এই অবরোধ চলেছিল দুই সপ্তাহ ধরে (২০শে নভেম্বর থেকে ৪ঠা ডিসেম্বর)। এই দুই সপ্তাহ কাবার আশেপাশে কেউ তাওয়াফ করেনি, হারাম শরীফে কোনো আজান হয়নি, নামাজ হয়নি। নিরাপত্তার জন্য মক্কার সকল অধিবাসীকেই শহর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আত্মসমর্পনকারী ৬৮ জন জঙ্গীকে প্রকাশ্যে শিরোশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। এছাড়া উইকিপিডিয়ার হিসাব অনুযায়ী ১১৭ জন জঙ্গী সংঘর্ষের সময় মারা যায়। অপরদিকে সৌদি সেনাবাহিনীর ১২৭ জন মারা গিয়েছিল। 

মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন কাহতানির মৃত্যুর পর অধিকাংশ ইসলামিক স্কলার মতামত দেন যে ইনি আসল ইমাম মেহেদি নন। বর্তমান সময়েও অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠি পৃথিবীতে হানাহানির কথা বলছে। দজ্জাল এবং ইমাম মেহেদি সংক্রান্ত কিছু সুবিধাজনক হাদিস প্রচার করছে। দজ্জালের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিচ্ছে এবং বিশ্বাসীদের সেই জিহাদে যোগ দেয়ার দাওয়াত দিচ্ছে। এদের সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে সবাইকে। 

তথ্যসূত্র-

  • বিবিসি বাংলা
  • রোর বাংলা
  • উইকিপিডিয়া
  • ইউটিউব

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা