অপরাজেয় একটা দলকে নিজের হাতে তৈরী করেছেন ক্লপ, সম্ভাব্য সব শিরোপা জিতেছেন, ৩০ বছরের শিরোপা খরা ঘুচিয়ে দলকে লিগ টাইটেল জিতিয়েছেন সাত সপ্তাহ বাকী থাকতেই। এই লোকটাকে কি 'নরমাল' বলা যায়?

২০১৫'র অক্টোবরে যখন ডর্টমুন্ড থেকে তাকে উড়িয়ে এনেছিল লিভারপুল, সংবাদ সম্মেলনে তার দিকে একটা প্রশ্ন বক্রোক্তির মতো ছুটে গিয়েছিল। তিনি জানতেন, এই প্রশ্নের সামনে পড়তে হবে তাকে। উত্তরটাও তাই প্রস্তুত করেই এনেছিলেন। মিথ্যে আশার ফুলঝুরি না ছড়িয়ে বলেছিলেন, চার বছরের মধ্যে লিভারপুল প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিতবে। সাংবাদিকদের অনেকেই কথাটা শুনে হেসেছিলেন, এমন প্রতিশ্রুতি তো কতজনই দিলেন গত দুই যুগে! রয় ইভান্স পারলেন না, জেরার্ড হুলিয়ার পারলেন না, রাফায়েল বেনিতেজ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এনে দিলেন, লিগ জেতা হলো না। দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে এসে কেনি ডালগ্লিশও ব্যর্থ- আর জার্মানী থেকে উড়ে আসা এই লোক বলছেন চার বছরের মধ্যে প্রিমিয়ার লিগ জিতবেন? ইংলিশ লিগের কচুটা বোঝেন তিনি! 

সরাসরি কেউ বলেননি সেদিন, কিন্ত চাপা হাসিগুলো নজর এড়ায়নি জার্গেন ক্লপের। এই হাসি তো তার কাছে নতুন ছিল না। মেইনজের হয়ে যখন পেশাদার কোচিং শুরু করেছিলেন, তখনও লোকে তার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তিনি জবাব দিয়েছেন ফলাফল দিয়ে। ডর্টমুন্ডের ম্যানেজার হবার পর বলা হয়েছিল বড় দল সামলানোর ক্ষমতা তার নেই, সেই দলটাকে ক্লপ জার্মান বুন্দেসলিগা জিতিয়েছেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তুলেছেন। লিভারপুলে আসার পরেও একই কথা, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দলটাকে কি এমন এনে দিতে পারবেন ক্লপ? 

জার্গেন ক্লপ মৃদুভাষী লোক, কথাবার্তা কম বলেন। ম্যাচের আগে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে আসা না লাগলে বোধহয় মিডিয়ার মুখোমুখিই হতেন না খুব একটা। তাই বোলচালের পরিবর্তে বরং পারফরম্যান্স দিয়েই জবাবটা দিতে পছন্দ করেন তিনি। কে কি বললো, কে কি ভাবলো, সেসব নিয়ে চিন্তা করতে তার বয়েই গেছে, সেই সময়টায় তিনি বরং পরের ম্যাচটা নিয়ে ছক সাজাতে পছন্দ করেন। সেটার ফলাফল তো চোখের সামনে! ১৪ বছর পর লিভারপুল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে তার হাত ধরে। একটাই টাস্ক বাকি ছিল, সেটাও পূরণ হয়ে গেল গতকাল। পাক্কা ত্রিশ বছর বাদে ইংলিশ লিগ সেরা হয়েছে লিভারপুল, প্রিমিয়ার লিগের ট্রফিটা প্রথমবারের মতো পা রেখেছে অ্যানফিল্ডে। ইংলিশ লিগের নাম প্রিমিয়ার লিগ হবার পরে এই প্রথম লিগ জিতলো দলটা! 

এই অশ্রু আনন্দের অশ্রু

ক্লপ যেটা করেছেন, সেটাকে অসাধ্য সাধন বললেও কম বলা হবে। ২০০৫ সালে রূপকথা গড়ে মিলানের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা।জিতেছিল অলরেডরা। এরপর থেকে বড় কোন শিরোপাই জিততে পারেনি তারা। একসময়ের হেভিওয়েট দলটা পরিণত হয়েছে মিডিওকারে, তোরেস-সুয়ারেজ-কৌটিনহোরা ক্লাব ছেড়েছেন, জেরার্ড অবসরে গেছেন, কাঙ্ক্ষিত ফলের অনেকটা দূরে থেকেই লিগ রেস শেষ করেছে লিভারপুল, এমনকি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতাও অর্জন হয়নি- এমনও কত মৌসুম কেটেছে তাদের! একসময়ের তারকাসমৃদ্ধ দলটা কালের গর্ভে পরিণত হয়েছে মিডিওকার টিমে, এভারটন-লেস্টার সিটির সঙ্গে জিততেও যাদের কষ্ট হয়! 

তারপর ক্লপ এলেন, তবে জাদু দেখানোর বাসনা নিয়ে নয়। পরিকল্পনা করে, ছক কষে এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। ম্যাচ বাই ম্যাচ, সিজন বাই সিজন প্ল্যান করলেন, যেটা তার স্বভাব, যেটা এর আগে মেইনজে করেছেন, ডর্টমুন্ডে করেছেন। নিজে বয়সে তরুণ, তারকা কিংবা অভিজ্ঞদের চেয়ে তরুণ প্রতিভা ঘষামাজা করাতেই তার মনযোগ বেশি। লিভারপুলেও তার ব্যতিক্রম করলেন না, ট্রান্সফার মার্কেটে ঢুকে অদ্ভুত সব কাণ্ড দেখালেন, অনেকের কাছে যেটা পাগলামি মনে হতে পারে। ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে কিনলেন ডিফেন্ডার ভ্যাব ডাইককে, সবার চোখ কপালে উঠলো। কিন্ত সেটা যে ক্লপের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফল, তা তো বোঝা যাচ্ছে এখন।

দলে বেড়ালেন ফ্যাভিনহো আর নেবি কেইটাকে৷ শাকিরিকে কিনলেন পানির দামে। দলে এনে গোলকিপারের গ্লাভসটা ধরিয়ে দিলেন এলিসন বেকারকে। ফিরমিনো-মানে-সালাহকে ব্যবহার করলেন চমৎকারভাবে। সময় গড়ালো, লিভারপুল হয়ে উঠতে থাকলো পরাশক্তি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠে হারলেন রিয়ালের কাছে, রেকর্ড ৯৭ পয়েন্ট পেয়েও ম্যানচেস্টার সিটির পেছনে থেকে শেষ করলেন লিগ রেস। নিন্দুকেরা তখন মুচকি হাসছে, পত্রিকার পাতায় শিরোনাম আসছে, সাতটা মেজর টুর্নামেন্টের মধ্যে ছয়টার ফাইনালেই হেরেছেন ক্লপ, তবে কি তিনি বিগ টুর্নামেন্টের জন্য পারফেক্ট চয়েজ নন? 

সাফল্য দিয়েই বারবার নিজেকে প্রমাণ করেছেন ক্লপ

ক্লপ জবাবটা দিলেন ২০১৯ সালে। বার্সেলোনার কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে আসা দলটাকে কি সঞ্জীবনী সুধা পান করিয়েছিলেন, সেটা ক্লপই ভালো জানেন। কিন্ত অ্যানফিল্ডের ফিরতি লেগে ফুটবলার নয়, লিভারপুলের জার্সি গায়ে যেন একদল এলিয়েন নামলেন! মেসি-সুয়ারেজরা পাত্তাও পেলেন না, একের পর এক আক্রমণের ঢেউ আছড়ে পড়লো বার্সেলোনার ডিবক্সে, গুণে গুণে চারবার বার্সার জালে বল ঢোকালো লিভারপুল। ম্যাচের অন্তিম কয়েকটা মিনিটে লিওনেল মেসির চেহারাটা দেখে মনে হচ্ছিল, দুঃস্বপ্নের সেই রাতটা ভুলে যেতে পারলেই তিনি বাঁচেন! বিশ্বসেরা ফুটবলারকে এমন দুঃস্বপ্ন উপহার দেয়া লোকটা তো আর কেউ নন, জার্গেন ক্লপ! 

অল-ইংল্যান্ড ফাইনালে টটেনহ্যামকে হারিয়ে চৌদ্দ বছর বাদে ইউরোপসেরার শিরোপা ঘরে তুলেছে লিভারপুল, জিতেছে ক্লাব বিশ্বকাপও। বাকি ছিল শুধু প্রিমিয়ার লিগ জেতাটা, ক্লপ যেটা জেতাবেন বলে অঙ্গীকার করেছিলেন চার বছর আগে। মৌসুমের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে অল-রেডরা, প্রতিটা ম্যাচকে সমান গুরুত্ব দেয়া, প্লেয়ারদের রোটেশন সিস্টেমে খেলিয়ে ইনজুরিমুক্ত রাখা, প্রতিপক্ষের মাইন্ডসেটকে বিবেচনায় নিয়ে ম্যাচ বাই ম্যাচ ট্যাকটিকস বদলানো, গোল না পেলে ম্যাচের মাঝখানেই ফরমেশন বদলে আক্রমণে ওঠা- একের পর এক মাস্টারস্ট্রোক হাঁকিয়েছেন ক্লপ, ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। 

উদযাপনের এই উপলক্ষ্য তো ক্লপই এনে দিয়েছেন অ্যানফিল্ডে

লিগ রেসের শুরু থেকেই সবার ওপরের স্থানটা নিজেদের করে নিয়েছিল লিভারপুল, ধারেকাছে ঘেঁষতে দেয়নি কাউকে, দুর্ঘটনার জন্ম হতে দেয়নি। গতকাল ছিল ৩১তম ম্যাচ ডে, সম্ভাব্য ৯৩ পয়েন্টের মধ্যে লিভারপুলের অর্জন ৮৬ পয়েন্ট! ২৮ ম্যাচেই জয় এসেছে, হেরেছে কেবল একটা ম্যাচে, বাকি দুটো ম্যাচ ড্র! দ্বিতীয় স্থানে থাকা ম্যানসিটির সঙ্গে পয়েন্ট ব্যবধান ২৩। লিভারপুল বাকি সাত ম্যাচের প্রতিটাতে হারলেও তাদেরকে ছোঁয়া সম্ভব নয় সিটির পক্ষে! ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এত বেশি ম্যাচ হাতে রেখে শিরোপা নিশ্চিত করেনি আর কেউ, নিজের প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপাটা কি দোর্দণ্ড প্রতাপেই না জিতলেন ক্লপ! 

২০১৫ সালে যখন অ্যানফিল্ডে এসেছিলেন, তখন এক সাংবাদিক ক্লপকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কি লিভারপুলের স্পেশাল ওয়ান হবেন? ক্লপ হেসে বলেছিলেন, আমি নরমাল ওয়ান, স্পেশাল হওয়াটা আমার কাজ নয়। ক্লপ যতোই বিনয়ী হতে চান না কেন, লিভারপুলের ফুটবল ইতিহাসে তার নামটা তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তীক্ষ্ম মস্তিস্ক খাটিয়ে অপরাজেয় একটা দলকে নিজের হাতে তৈরী করেছেন তিনি, সম্ভাব্য সব শিরোপা জিতেছেন, লিগ শিরোপার রোমাঞ্চ শেষ করে দিয়েছেন সাত সপ্তাহ বাকী থাকতেই, লিভারপুলের পথে প্রান্তরে আনন্দের যত উদযাপন গত ২৪ ঘন্টা ধরে, সব তো তারই সৌজন্যে! এই লোকটাকে কি 'নরমাল' বলা যায়? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা