হুইসেলব্লোয়ার হয়ে যিনি ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন গোটা বিশ্বকে, তিনিই এখন নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছেন! মনোবিদ জানিয়েছেন, অডিটরি হেলুসিনেশনে ভুগছেন অ্যাসাঞ্জ, গায়েবি আওয়াজ শুনতে পান তিনি...

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটার বিরুদ্ধে তিনি প্রায় একাই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। বিশ্বমোড়লদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন আমেরিকার সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার নাম। একের পর এক রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য চুরি করে সেগুলো জনসন্মুখে প্রকাশ করেছেন, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও দমননীতি প্রকাশ্যে এনেছেন, মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন রাষ্ট্রগুলো তাদের নাগরিকদের কিভাবে বঞ্চিত করছে, কিভাবে ঠকাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। সেই বিপ্লবের সাজাও ভোগ করতে হয়েছে তাকে, সাতটা বছর একটা ছোট ভবনে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে, তারপর সাজানো মামলায় জেলে ঢোকানো হয়েছে- জুলিয়ান পল অ্যাসাঞ্জ নামের মানুষটা বছরের পর বছর এসব ধাক্কা সামলাতে সামলাতে মানসিকভাবেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। 

অ্যাসাঞ্জ এখন লন্ডনের এক কারাগারে বন্দি আছেন, ৩৫০ দিনের সাজা ভোগ করছেন তিনি। বারবার জামিনের আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। জেলে বছরখানেক কাটালেও, অ্যাসাঞ্জের বন্দীদশা চলছে আসলে আট বছরেরও বেশি সময় ধরে। যখন থেকে তিনি লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন, তখন থেকেই তো বন্দী তিনি। বাইরের দুনিয়াটা দেখা হয় না কতগুলো বছর হয়ে গেল! এই মামলার সাজা শেষ হলে হয়তো আমেরিকায় পাঠানো হবে তাকে, সেখানে ভয়ংকর কোন পরিণতিই অপেক্ষা করছে তার জন্য- সব মিলিয়ে অ্যাসাঞ্জের ভেঙে পড়াটাই স্বাভাবিক। 

লন্ডনের বিখ্যাত কিংস কলেজের নিউরোসাইকিয়াট্রির প্রফেসর মাইকেল কোপেলম্যান গত কয়েক মাসে অন্তত বিশবার সাক্ষাৎ করেছেন অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে। জেলের ভেতর মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকা অ্যাসাঞ্জকে সাহায্য করার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। কোপেলম্যানই জানিয়েছেন, গত কিছুদিন ধরেই হেলুসিনেশনে ভুগতে শুরু করেছেন অ্যাসাঞ্জ। ইদানিং তিনি নাকি গায়েবি আওয়াজ শুনতে পান। সেই আওয়াজ তাকে মৃত্যুর কথা বলে, জানায়, তার সময় ফুরিয়ে এসেছে! কাউকে দেখা যায় না আশেপাশে, এমনকি সেই কণ্ঠস্বর অন্য কেউ শোনেনও না, শুধু অ্যসাঞ্জই শুনতে পান। 

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ

মাইকেল কোপেলম্যানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, অডিটরি হেলুসিনেশনে ভুগছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। সোমাটিক হেলুসিনেশন এবং মিউজিক্যাল হেলুসিনেশন নামের দুটো হেলুসিনেশন সিনড্রোম অ্যাসাঞ্জের আগে থেকেই ছিল, জেলে বন্দী হবার পরে সেগুলোর আক্রমণও বেড়েছে। এক পাদ্রীর কাছে অ্যাসাঞ্জ স্বীকার করেছেন, তিনি আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, নিজেকে শেষ করে দেয়ার প্রস্তুতিও নেয়া আছে তার। জেলখানায় তার সেল থেকে কিছুদিন আগেই রেজারের ব্লেড এবং দুটো তামার তার উদ্ধার করা হয়েছে। কারারক্ষীদের প্রশ্নের জবাবে সরাসরি কোন উত্তর না দিলেও, সম্ভবত আত্মহত্যার জন্যেই সেগুলো সংগ্রহ করেছিলেন অ্যাসাঞ্জ। 

বিশটি সেশনে কোপেলম্যানের সঙ্গে প্রচুর কথা হয়েছে অ্যাসাঞ্জের। নিজের হতাশা লুকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা। কোপেলম্যানের মনে হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ নিজেকে পরাজিত হিসেবে ভাবছেন। আবার একজন বিপ্লবী হিসেবে নিজের পরাজিত রূপটা পৃথীবির সামনে আনতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন। নিজের ভবিষ্যতও তাকে ভাবাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে মানসিক চাপটা ক্রমশ বাড়ছে অ্যাসাঞ্জের ওপর, সেটা তিনি খুব বেশিদিন সামাল দিতে না-ও পারেন বলে মনে হয়েছে কোপেলম্যানের কাছে।

যে গায়েবি আওয়াজটা অ্যাসাঞ্জের কানে ভেসে আসে, সেটা নিয়েও কথা বলেছেন কোপেলম্যান। অ্যাসাঞ্জ তাকে জানিয়েছেন, অদৃশ্য একটা কণ্ঠস্বর তাকে বলে- 'তুমি শেষ হয়ে গেছো অ্যাসাঞ্জ, তোমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমরা আসছি তোমাকে নিতে!' ব্যাপারটা অ্যাসাঞ্জের কাছে বাস্তব মনে হলেও, মনোবিদ হিসেবে কোপেনম্যান জানেন, পুরোটাই বিভ্রান্ত মনের কল্পনা। অ্যাসাঞ্জের এই মানসিক সমস্যাটার নাম তিনি দিয়েছেন অডিটরি হেলুসিনেশন। এই রোগে আক্রান্ত রোগী গায়েবি বার্তা শুনতে পায় বলে দাবী করে, যেটা অ্যাসাঞ্জ করছেন। এই রোগে আক্রান্ত অনেকে নিজেকে আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন মানুষ বলেও মনে করে, আবার অনেকে দাবী করে স্রষ্টার সাথে তার সরাসরি কথাবার্তা হয়- এগুলোই অডিটরি হেলুসিনেশনের বৈশিষ্ট্য।

ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে গ্রেপ্তারের সময়

উইকিলিকস প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র আর সরকারগুলোর খুঁটি নাড়িয়ে দিয়েছিলেন অ্যাসাঞ্জ, গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য হ্যাক করে প্রকাশ করেছিলেন জনসম্মুখে। ছোট্ট একটা টিম, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আর বুকভর্তি সাহস নিয়ে অসাধ্যকে সাধন করেছিলেন অ্যাসাঞ্জ। তার ফাঁস করা তথ্যের বদৌলতেই মার্কিন রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির নোংরা খোলসটা বেরিয়ে পড়েছিল। অ্যাসাঞ্জ হয়ে উঠেছিলেন অজস্র মানুষের আদর্শ। তার পথ ধরেই পরে এডওয়ার্ড স্নোডেন হেঁটেছেন একই পথে, আলোর মুখ দেখেছে পানামা পেপারস, সামনে এসেছে অজস্র কেলেঙ্কারির রিপোর্ট। 

প্রভাবশালীদের চটিয়ে দেয়ার সাজা অ্যাসাঞ্জ পাচ্ছেন এখন। এই পৃথিবীতে খারাপ মানুষদের রাজত্ব, তাদের মুখোশটা কেউ খুলে দিলে তারা দলবেঁধে তাকে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লাগবে- এটাই স্বাভাবিক। অন্তর্জালে অন্যরকম এক তথ্যবিপ্লব ঘটিয়ে ফেলা অসামান্য বিপ্লবী অ্যাসাঞ্জকে এখন তাই লড়তে হচ্ছে নিজের মনের সাথে। হুইসেলব্লোয়ার হয়ে যিনি ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন গোটা বিশ্বকে, তিনিই এখন হেলুসিনেশনের কাছে অসহায় হয়ে আত্মহত্যা করতে চাইছেন। পৃথিবীকে বদলে দেয়াটা যার স্বপ্ন ছিল, পৃথিবীর নির্মমতার কাছে অসহায় হয়ে তিনিই বদলে গেছেন চিরতরে...

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- অ্যাক্টিভিস্ট পোস্ট

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা