কম্পিত হাতে মেশিনের দিকে এগিয়ে যান জুয়ানিটা নিটালা, রোগীর দিকে তাকান বারবার, ইচ্ছে করে সুইচে হাত না দিতে। কিন্ত উপায় তো নেই!

ডাক্তার বলুন, নার্স বলুন কিংবা হাসপাতালের টেকনিশিয়ান- যে কোন স্বাস্থ্যকর্মীর লক্ষ্য থাকে একটাই, সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে রোগীকে সুস্থ করে তোলা। অথচ জুয়ানিটা নিটালা নামের এই সিনিয়র নার্স কিনা শত শত রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন! স্বেচ্ছায় বা খুশিমনে করেছেন, ব্যাপারটা তা নয়, তার কাজটাই এমন, মৃত্যুদূত হওয়াটা তার দায়িত্ব। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত রয়্যাল ফ্রি হাসপাতালের সিনিয়র নার্স হিসেবে কাজ করেন জুয়ানিটা, ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউতে একজন অভিজ্ঞ ভেন্টিলেটর অপারেটর হিসেবে তার রয়েছে আলাদা সুনাম, বেতনও মন্দ নয়। কিন্ত তার সঙ্গে মৃত্যুদূত হবার কি সম্পর্ক?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, তাদের প্রায় সবারই মূল সমস্যা হচ্ছে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। করোনাভাইরাস আক্রমণ করে ফুসফুসে, ফলে নিঃশ্বাস আটকে আসে, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। সেই সময় সবচেয়ে দরকারী বস্তু হচ্ছে ভেন্টিলেটর মেশিন। ফুসফুস যখন বুকের ভেতরে বাতাস টেনে নিতে পারে না, তখন ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে শরীরে পৌঁছে যায় মহামূল্যবান অক্সিজেন। মানুষ তখন খানিকটা সুস্থির হয়ে দম নিতে পারে, সেই দমে দমে টিকে থাকে বাঁচার আশা। 

করোনার এই ক্রান্তিকালে ভেন্টিলেটরকে বিবেচনা করা হচ্ছে জীবনরক্ষার অন্যতম শেষ অস্ত্র হিসেবে। ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশগুলো করোনার প্রতিষেধক আবিস্কারে যতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে, ঠিক ততটাই গুরুত্ব দিচ্ছে ভেন্টিলেটর মেশিন বানানোর দিকেও। নইলে অকালে ঝরে যাবে হাজার হাজার প্রাণ। ডোনাল্ড ট্রাম্প তো তার বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আদেশ দিয়েছেন অনতিবিলম্বে ভেন্টিলেটর মেশিন বানিয়ে হাসপাতালে সরবরাহ করার জন্য। 

করোনা রোগীর চিকিৎসায় এই ভেন্টিলেটরই শেষ ভরসা

তবুও অনেক সময় নিয়তির অমোঘ টানকে অগ্রাহ্য করা যায় না। শেষ বাঁশিটা বেজে যায়, করোনার কাছে হার মানতে হয় রোগীকে। বয়স, শারীরিক দুর্বলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কমতি বা এরকম অনেক কারণেই ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, ভেন্টিলেটরের আশ্রয়ে থাকা প্রাণটা নিস্তেজ হয়ে আসে ধীরে ধীরে। 

ভেন্টিলেটর কেবল শরীরে অক্সিজেন পৌঁছেই দেয় না, করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুস মেরামতে মুমূর্ষু জীবনকে লড়াই করার জন্য বাড়তি খানিকটা সময়ও দেয়। তবে এই সময়টুকু সবার বেলায় কাজে আসে না, সবাই পারেন না এই সময়ের সদ্যবহার করতে। হাসপাতালের মেডিকেল টিমকে তখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তার আগে রোগীর কেস হিস্ট্রি নিয়ে হয় চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিবেচনায় আনা হয় রোগীর বয়স, আগের কোনো গুরুতর অসুস্থতার ইতিহাস। তারপর অনুমোদন হয় মৃত্যুর সনদ। 

তখন ডাক পড়ে জুয়ানিটা নিটালার। তার কাজ, ভেন্টিলেটরের সুইচ অফ করে রোগীকে চিরমুক্তি দেয়া। সময় খুব বেশি লাগে না এতে, সুইচ অফ করার পরে মিনিট দুয়েকের মধ্যেই রোগী ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। এই দুটো মিনিটকে অনন্তকালের মতো দীর্ঘ মনে হয় জুয়ানিটার কাছে। 

জুয়ানিটার বয়স এখন ৪২ বছর। ষোলো বছর ধরে নার্সের চাকরী করছেন, ছয় বছর হলো আইসিইউতে শিফট হয়েছেন, ভেন্টিলেটর মেশিন বন্ধের দায়িত্বটা চেপেছে তার কাঁধে। কিন্ত এখনও এটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি তিনি। আগে হয়তো বছরে এক-দুইবার কাজটা করা লাগতো, কিন্ত এখন দিনে কয়েকবারই তার ডাক পড়ছে  কারণ করোনায় আক্রান্ত হয়ে গণহারে মরছে মানুষ, বৃটেনেই সংখ্যাটা ইতিমধ্যে কয়েক হাজার পেরিয়ে গেছে। এদের মধ্যে কয়েকশো মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে জুয়ানিটার হাতে। 

সহকর্মীদের সঙ্গে জুয়ানিটা নিটালা

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর এই মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয় জুয়ানিটার। ভেন্টিলেটর মেশিনের সুইচ বন্ধ করতে গিয়ে তার শুধু মনে হয়, এই মানুষগুলোর মৃত্যুর জন্যে আসলে তিনিই দায়ী, অন্য কেউ নন। নিজের মধ্যে ভীষণ অপরাধবোধ চেপে বসে। কম্পিত হাতে তবুও তিনি মেশিনের দিকে এগিয়ে যান, রোগীর দিকে তাকান বারবার, ইচ্ছে করে সুইচে হাত না দিতে। কিন্ত উপায় তো নেই! 

সপ্তাহ তিনেক আগের একটা দিনের কথা স্পষ্ট মনে করতে পারেন জুয়ানিটা। বছর পঞ্চাশের এক রোগীর বিদায়ঘন্টা বেজে গেছে, জুয়ানিটা এসেছেন সুইচ বন্ধ করতে। ওই মহিলাও পেশায় নার্স ছিলেন, হাজার হাজার রোগীর সেবা করেছেন, জীবন বাঁচাতে, সুস্থ হতে অবদান রেখেছেন। অথচ মেডিকেল সায়েন্স আজ তাকেই বাঁচাতে পারছে না, হাল ছেড়ে দিয়েছে! মৃত্যু কি ভীষণ শাশ্বত সত্যি, জুয়ানিটা শুধু সেটাই ভাবেন। 

নিয়ম অনুযায়ী ভেন্টিলেটর মেশিনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে রোগীর স্বজনদের একজনকে ফোন দেয়া হয়। জুয়ানিটার ফোনটা ধরলেন রোগীর মেয়ে। জুয়ানিটা তাকে বললেন, আমরা আপনার মায়ের ভেন্টিলেটর কানেকশানটা খুলে দিচ্ছি। ওপাশ থেকে কান্নাভেজা কণ্ঠে মেয়ে জিজ্ঞেস করে- আমার মায়ের কি খুব কষ্ট হচ্ছে? উনি কি ব্যাথা পাচ্ছেন? জুয়ানিটা শান্ত গলায় বলেন, না, উনি ঘুমিয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে না কোন যন্ত্রণা পাচ্ছেন। 

জুয়ানিটা নিটালা

রোবটের মতো গলায় জুয়ানিটা জিজ্ঞেস করেন, আপনার মায়ের কি কোন শেষ ইচ্ছে ছিল? বা কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা? মেয়েটি তার মায়ের সঙ্গে একবার কথা বলতে চাইলো। যদিও মা শুনতে পাবেন না সেটা। জুয়ানিটা পর্দা সরালেন, ফোনটা রাখলেন রোগীর কানের পাশে, ভলিউমটা বাড়িয়ে দিলেন একটু। ফোনের ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে, কিছু একটা প্রার্থনার সুর শোনা যাচ্ছে। জুয়ানিটা সরে গেলেন জানালার পাশে। পর্দা সরিয়ে দিলেন। ভোর হচ্ছে, আকাশ আলোকিত হচ্ছে। আর এদিকে একটা প্রাণ নিভে যাচ্ছে চিরতরে, সেই নিভিয়ে দেয়ার কাজটা করতে হচ্ছে তাকে! নিজের কাজের প্রতি সেদিন তীব্র অভিমান জন্ম নিয়েছিল জুয়ানিটার। 

সেই অভিমান কেটে গেছে এখন। জুয়ানিটা জানেন, এটাই জীবন, এটাকে মেনে নিয়েই বাঁচতে হবে, টিকে থাকতে হবে। সুইচ বন্ধ করার কাজটা তিনি না করলে অন্য কেউ করবে, মৃত্যুপথযাত্রী কারো জীবন তো তিনি বাঁচাতে পারবেন না, যতোক্ষণ না করোনার ঔষধ আবিস্কার হচ্ছে। জুয়ানিটা তাই অপেক্ষা করেন সুদিন ফিরে আসার, একদিন সূর্য উঠবে, তার ডাক পড়বে না আইসিইউতে, ভেন্টিলেটর মেশিনের দিকে কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে যেতে হবে না তাকে- এই স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকেন জুয়ানিটা নিটালা... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা