ছেলের মুখে বাবাকে হারানোর কথাগুলো শুনতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হলেন সাংবাদিক ভদ্রলোক। মানবতা তো তাদের মধ্যেও আছে, মানুষের কষ্টে প্রাণ কেঁদে ওঠে তাদেরও, পেশাগত গাম্ভীর্যের মোড়কটা খসে পড়ে...

সাংবাদিক আর পুলিশ, এই দুই শ্রেণীর পেশাজীবিদের নাকি খুব শক্ত মানসিকতার হতে হয়। আবেগী হলে এসব ফিল্ডে না আসাই ভালো, কারণ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন সব ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়, সেখানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে, পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে বিপদ ঘটতে পারে। তবুও কি সাংবাদিকরা সবসময় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরও চোখে জল জমে, বাস্পরূদ্ধ হয়ে আসে গলা, কথা আটকে যায়। এমন একটা নজির স্থাপন হলো আজও। 

ঢাকা মেডিকেলের সামনে একজন ভিক্টিমের সঙ্গে কথা বলছিলেন আরটিভির রিপোর্টার। লোকটার বাবা মারা গেছেন কিছুক্ষণ আগে, অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে বাবা নিথর শরীর নিয়ে শুয়ে আছেন, আর কখনও কথা বলবেন না তিনি। সাংবাদিকের বাড়িয়ে দেয়া মাইক্রোফোনের সামনে ধরে আসা গলায় তিনি বলছিলেন, তার অসুস্থ বাবা কিভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছে। বাবাকে নিয়ে পাবনা থেকে ঢাকায় এসেছেন উন্নত চিকিৎসার জন্য, শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন চিকিৎসার আশায়, কিন্ত সরকারী-বেসরকারী কোন হাসপাতালই চিকিৎসা দেয়নি। 

কেউ বলেছে সিট খালি নেই, কেউ বলেছে করোনা নেগেটিভের রেজাল্ট ছাড়া রোগী ভর্তি নেবে না। মানুষটার বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই। হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন সম্ভবত, করোনার উপসর্গও ছিল। বাবার লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে ভুক্তভোগী সেই তরুণ চোখে আঙুল তুলে আরও একবার দেখিয়ে দিলেন, এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটা আসলে ফাঁকা কলস ছাড়া আর কিছুই নয়। এখানে মরণাপন্ন একজন রোগীকে অক্সিজেন দিতেও কেউ এগিয়ে আসেন না, হাসপাতাল রাজী হয় না রোগী ভর্তি করাতে, অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিনা চিকিৎসার ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয় এদেশের নাগরিককে। 

আরটিভির ক্যামেরার সামনে সদ্য বাবা হারানো যে সন্তানটি কথা বলছিলেন, তিনি পাবনা থেকে এসেছিলেন অসুস্থ বাবাকে নিয়ে। পাবনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো নয়, ভেবেছিলেন রাজধানীতে এলে বাবাকে ভালো চিকিৎসা পাবেন। বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হসপিটালে গিয়েছিলেন প্রথমে, তারা রোগী ভর্তি নিলো না। অথচ রাত তিনটায়ও তারা বলেছিল, রোগী নিয়ে আসেন, ভর্তি করে নিব। রোগীর অবস্থা দেখে তারা নগদে পল্টি নিলেন। 

সেখান থেকে রোগীকে নিয়ে আসা হলো স্কয়ার হাসপাতালে। রোগীর তখন শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে ভীষণ, অথচ স্কয়ারের কেউ তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেও রাজী হলেন না। শুধু পালসটা দেখেই বললেন, আপনারা রোগীকে বাইরে কোথাও নিয়ে যান। সেখান থেকে রামপুরার ডেল্টা হাসপাতাল, তারা রোগী ভর্তি নিলো ঠিকই, কিন্ত কোভিড টেস্টের আগে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয় বলে জানালো। রোগীকে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার ধরিয়ে দেয়া হলো, সেটা নেবুলাইজ করার জন্যেও ডেকে আনা গেল না কাউকে। 

সেখান থেকে আরেকটা প্রাইভেট হাসপাতালে নেয়া হলো। সেখানে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় তারা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে দিয়ে সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালে যেতে বললেন। হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর সময়টা পেলেন না রোগী, অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করলেন। একটার পর একটা হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট হয়েছে। কে জানে, প্রাথমিক চিকিৎসাটা সময়মত পেলেও হয়তো সেই বাবাকে বাঁচানো যেতো, সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগটা পেতেন তিনি। কিন্ত অব্যবস্থাপনায় ভরা এদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্র তাকে সেই সুযোগ দিলো না। 

বাবাকে হারিয়ে পাবনায় ফেরার আগে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কঠিন কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন মৃত লোকটার ছেলে। এই যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বারোটা বাজানো হয়েছে বছরের পর বছর ধরে, কোতি কোটি টাকার পর্দা কেনা হয়েছে টেন্ডার বানিজ্য করে, সেসবের রেশ এখন টানতে হচ্ছে জাতিকে। যারা এসব দুর্নীতি করেছে তারা ঘরে বসে আয়েশ করছে, পেটের দায়ে বেরুতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, আক্রান্ত হচ্ছে তারাই, চিকিৎসা না পেয়ে মরছে জনগন। আর যেসব ভিআইপিরা হেলথ সেক্টরের বারোটা বাজিয়েছেন, তারা আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। যার আপনজন যায়, সেই বোঝে যন্ত্রণাটা। এই অমানুষগুলো সেটা বোঝে না কখনও। 

ছেলের মুখে বাবাকে হারানোর কথাগুলো শুনতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হলেন সাংবাদিক ভদ্রলোক। হয়তো নিজের বাবার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। কথা বলতে গিয়ে থমকে গেলেন, স্বীকারও করে নিলেন, গলা ভারী হয়ে গেছে তার। সাংবাদিক হলেও, মানবতা তো তাদের মধ্যেও আছে, মানুষের কষ্টে প্রাণ কেঁদে ওঠে তাদেরও, পেশাগত গাম্ভীর্যের মোড়কটা খসে পড়ে। মানবতা নেই শুধু দেশটাকে ছিবড়ে খেয়ে দেশের বাইরে সম্পদের পাহাড় জমানো পশুগুলোর, যাদের কারণে সাধারন জনগনের আজ এমন দুর্দশা... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা