একজন নারীর বাইকে চড়া দেখে আমরা অবাক হচ্ছি, তাহলে হাজার মিটার ওপর থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে ঝাঁপ দেয়া ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌসের কীর্তিগাঁথা শুনে তো আমাদের ভিরমি খেয়ে পড়ে যাওয়ার কথা!

মাটি থেকে এক কিলোমিটার ওপরে তখন বিমানটা। ফেব্রুয়ারী মাস, বাংলা ক্যালেন্ডারে মাঘ মাস চলছে। কণকণে ঠান্ডার মধ্যেও ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌসের কপালে ঘাম জমেছে, সেটা উত্তেজনায়, নাকি নার্ভাসনেসের কারণে, বোঝা যাচ্ছে না ঠিকঠাক। আর কয়েকটা সেকেন্ড, তারপরই শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে দেবেন তিনি, প্যারাকমান্ডো ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে তাকে প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দিতে হবে এক হাজার মিটার ওপর থেকে। যে কাজটা এর আগে কোন বাংলাদেশী নারী করেননি, সেটাই করতে চলেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস! 

২০০৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। তিন বছরের মধ্যেই ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হলেন। কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিয়ারি অ্যাকাডেমির কম্পিউটার ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে। পরিবারও খুশি, আর্মিতে গেলেও মেয়ে নিরাপদ জায়গাতেই আছে, ডেস্কজবের মতোই নয়টা-পাঁচটার কাজ। মেয়ে হয়ে বন্দুক-পিস্তল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে, সেটা কি আর ভালো দেখায়? 

কিন্ত জান্নাতুল ফেরদৌসের নেশা ছিল প্রচলিত নিয়ম ভাঙা, সমাজের স্টেরিওটাইপ চিন্তাভাবনাগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়া। আর তাই মিলিটারি কমান্ডো ট্রেনিংয়ের বিজ্ঞপ্তি দেখেই তিনি আবেদন করলেন। কাছের মানুষজন তো বটেই, তার সহকর্মীরাও অবাক হয়েছিলেন এই সিদ্ধান্তে। নব্বইয়ের দশক থেমে কমান্ডো কোর্সে প্যারাস্যুট প্রশিক্ষণ কোর্সটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, ২০১২ সাল পর্যন্ত সশস্ত্রবাহিনীর প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য এই কোর্স কমপ্লিট করেছেন। কিন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তখন পর্যন্ত কোন নারী কর্মকর্তা সেই কোর্সে অংশ নেননি। জান্নাতুল ফেরদৌসই প্রথম নারী, যিনি নাম লিখিয়েছিলেন সেই কোর্সে। 

ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস, প্রশিক্ষণ চলাকালে

২০১৩ সালের জানুয়ারী থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হলো সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্টে। দলে চল্লিশের বেশি সদস্য, তাদের মধ্যে নারী মাত্র একজন- ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস! শুরুতে খানিকটা ভয় ছিল, কিন্ত প্রশিক্ষকরা ভীষণ আন্তরিকভাবেই সাহায্য করলেন জান্নাতকে। এই প্রথম একজন নারী প্যারাট্রুপার হতে এসেছেন, তাকে সফল বানানোর দায়িত্বটা সবাই মিলে কাঁধে তুলে নিলেন যেন! ওই চ্যালেঞ্জে হার মানা যাবে না কোনভাবেই! প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিস শিখতে লাগলেন জান্নাত, প্যারাস্যুট কখন খুলতে হবে, কিভাবে খুলতে হবে, ঝাঁপ দেয়ার ঠিক পরপর কি করতে হবে, প্যারাস্যুট না খুললে কিভাবে নিজেকে শান্ত রাখতে হবে... সবকিছু আত্মস্থ করে নিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস।

তারপর এলো প্র‍্যাকটিস মোমেন্ট। এবার সত্যি সত্যি আকাশ থেকে ঝাঁপ দিতে হবে, ধীরে ধীরে উচ্চতা বাড়বে এই রাউন্ডে। পাঁচ সপ্তাহের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে দিনে ও রাতে মোট সাতবার আকাশ থেকে নেমে আসতে হয়। ৫ই ফেব্রুয়ারী প্রথমবার আকাশ থেকে ঝাঁপ দিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস, নিরাপদে অবতরণও করলেন। সেই দৃশ্য দেখার জন্য ঢাকা থেকে সাংবাদিকরা ছুটে গিয়েছিলেন সিলেটে, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্যারাট্রুপার আকাশ থেকে অবতরণ করছে প্যারাস্যুটের মাধ্যমে- এটা তো কম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়! 

বিমান থেকে ঝাঁপ দেয়ার ঠিক আগে তোলা ছবি

তারপর এলো ১২ই ফেব্রুয়ারীর দিনটা, এদিন জান্নাতদের ব্যাচের ফাইনাল জাম্প ছিল। পনেরো জন হবু প্যারাট্রুপারকে পেটের ভেতরে নিয়ে আকাশে উড়লো বিমানবাহিনীর একটি বিমান। জান্নাতুলের তখন হয়তো বাবার কথা মনে পড়ছিল। তার মেয়ে প্যারাকমান্ডো কোর্সে নাম লিখিয়েছে শোনার পরে বাবা বলেছিলেন, "কোনো মেয়ে তো যায়নি, তুমি কেন?" জান্নাতুল ফেরদৌস জবাব দিয়েছিলেন, "কাউকে না কাউকে তো একদিন যেতে হবে বাবা। ভয়ের কিছু নেই!"

ভয়ের কিছু ঘটতে দেননি ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস। প্রশিক্ষণ পর্বের আগের জাম্পগুলোর মতো এদিনও প্যারাস্যুটে চড়ে নিরাপদেই নেমে এসেছিলেন মাটিতে, এক হাজার মিটার ওপর থেকে! ইতিহাসে লিখেছিলেন নিজের নাম। সিলেটের পানিছড়া নামের যে জায়গাটায় জান্নাতুল অবতরণ করেছিলেন, সেটা তখন লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল, সবাই অবাক হয়ে দেখছিল আকাশ থেকে বিজয়ীনির বেশে এক নারীর নেমে আসার দৃশ্যটা। জান্নাতুলের পা মাটি স্পর্শ করতেই শুরু হয়েছিল করতালির বন্যা, সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে ধরেছিলেন তার অনুভূতি জানার জন্য। ক্যাপ্টেন জান্নাতুল হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, "আরেকবার জাম্প করতে পারলে মন্দ হয় না!" 

জান্নাতুল ফেরদৌস, অবতরণের পরে

সেই সপ্তম অবতরণ শেষে তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো হিসেবে, পরিয়ে দেয়া হয়েছিল ব্যাজ। খুব সাধারণ একটা পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস, বাবা জিয়া সার কারখানার কর্মকর্তা ছিলেন, মা গৃহিনী। তিন বোন-দুই ভাইয়ের সংসার। আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবার যেমন হয়, তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। সেই জায়গা থেকে উঠে এসে জান্নাতুল হাজারটা বাধা পেরিয়ে সেনাবাহিনীর ৫৯তম ব্যাচে যোগ দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, তারপর কমান্ডো হয়ে তো গড়েছেন ইতিহাসই। দেশের প্রথম নারী প্যারা কমান্ডো হিসেবে জান্নাতুল ফেরদৌসের নামটা লেখা থাকবে আজীবন। 

যশোরে মোটরসাইকেলে চড়ে এক তরুণী নিজের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করেছেন, আর সেকারণে তাকে গালাগালি করা হচ্ছে বিচ্ছিরিভাবে, ফতোয়া দেয়া হচ্ছে, নারীর অমুক করা উচিত নয়, নারীর তমুক করা শোভা পায় না! একজন নারীর কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয়, সেটা ঠিক করে দেয়ার অথোরিটি পুরুষকে কে দিয়েছে? একজন নারীর বাইকে চড়া দেখে আমরা অবাক হচ্ছি, তাহলে জান্নাতুল ফেরদৌসের কীর্তিগাঁথা শুনে তো আমাদের অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার কথা। নারী যদি মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে হাজার মিটার ওপর থেকে ঝাঁপ দিতে পারে, সেই নারী যে কোন কিছুই করতে পারে, তাকে দমিয়ে রাখার সাধ্য কারো নেই... 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা