দেলোয়ার হোসেন সাইদী উচ্চস্বরে ওয়াজ করছেন- “জাহান্নামের ইমাম। চেনেন তো… চেনেন না…ঐ যে রাজাকারের নাকি বিচার করবে... মিথ্যুক! আলেমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী এই মহিলা। দেখেন না আলেমদের নামে মিথ্যা বলার কারণে আল্লাহ তার জবান কেড়ে নিসেন। তার মুখে ক্যান্সারের খবর আপনারা জানেন…”

কয়েক বছর পরের কথা; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেলোয়ার হোসেন সাইদীকে রাষ্ট্রপক্ষ দেলু, দেইল্লা বলে ডাকায় উত্তেজিত সাইদী বিচারকদের তিরস্কার করে বলেন, ‘মাননীয় বিচারক, আমাকে এখানে আনার পর প্রসিকিউটর আমার নাম বিকৃত করে বলেছিল। আমি আশা করেছিলাম আপনি এর প্রতিবাদ জানাবেন। কিন্তু আপনি সেটা করেননি। আপনি আদেশ দেয়ার সময় একই বিকৃত নাম বলেছেন।’ সুরা হুজরাতের ১১নং আয়াতে নামের বিষয়ে বলা আছে- কোনও মানুষকে বিকৃত করে ডেকো না।’

স্বাধীন দেশে সাইদী আর মুজাহিদদের বিচার আমরা করেছি। মুজাহিদ ফাঁসিতে ঝুলেছে, সাইদী কারাগারে।

শহিদ জননী তাঁর যে সন্তানের জন্য শহিদ জননী উপাধি পেয়েছিলেন, সেই ভাগ্যবান সন্তানটির নাম ছিল রুমী। রুমী আর তাঁর সহযোদ্ধারা রাতে অন্ধকারে আর্মির হাতে ধরা পড়ার ভয়ে জলে ডুবে লুকিয়ে থাকেন। পকেটের সিগারেটগুলো ভিজে একাকার হয়ে যায়। সিগারেট চাইলেই কেনা যায় না। ঘাসের উপর শুয়ে পরের দিনের যুদ্ধের প্ল্যান করার সময় একটা প্যাকেট অনেকজন মিলে ভাগ করে খায়। সে কারণে ঢাকায় অপারেশন করতে বাসায় এসে মা’য়ের কাছে রুমীর আবদার ছিল একটা ভালও সিগারেটের বক্স, যেটাতে পানি ঢুকে সিগারেট ভিজে যায় না।

মেলাঘরে তাঁর ছেলে টিলার উপরে বেড়ার ঘরে ,তাঁবুতে থাকে। পরিস্কার কাচের গ্লাসে এক কণা ময়লা দেখলে যে ছেলে আবার গ্লাস ধুয়ে নিতো, গমের আটা দু’বার করে চেলে নিতে হতো, রান্না ডালে খোসা দেখলে যেই ছেলে আর খাবে না, সে এখন যুদ্ধে গিয়ে খায় পোকা সেঁকা রুটি আর ঘোড়ার ডাল।

মা জাহানারা ইমাম ঢাকার সব মার্কেট ঘুরে অবশেষে এমন একটা সিগারেটের বক্স পেলেন, যেটাতে সিগারেট রেখে তাঁর ছেলে পাক বাহিনীর ভয়ে জলের নিচে ডুব দিয়ে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারবে, কিন্তু তাঁর সিগারেট ভিজবে না।

সপরিবারে জাহানারা ইমাম

২৯ / ০৮ /১৯৭১ রাত ১২ টা। রুমী-জামীদের বাসার সবাই তখন ঘুমে। হঠাৎ গেটে ধুমধাম শব্দ। জাহানারা ইমাম আর শরীফ সাহেব নিচে নেমে এলেন। তাঁদের সারা বাগান বাড়ি পুলিশে ঘেরা। আশেপাশের বজলুর রহমান, সাত্তার, কাসেম সাহেবদের বাড়িগুলোর সামনের রাস্তাতেও অনেক মিলিটারি। শরীফ সাহেব দরজা খুলতেই খুব অল্প বয়সী আর্মি অফিসার দাঁড়িয়ে আছে, নাম বলল ক্যাপ্টেন কাইয়ুম। প্রশ্ন করলো ‘তোমার ছেলেদের নাম কী? ‘রুমি, জামী এগিয়ে গেলো।

শরীফ সাহেবকে নিজের গাড়ি চালিয়ে তাদের সাথে আসতে বলে পুলিশ রুমীদের হাঁটিয়ে নিয়ে গেলো। সামনের রাস্তায় নিয়ে ক্যাপ্টেন কাইয়ুম রুমীর বাহু চেপে ধরে বললো, ‘তুমি এসো আমার সঙ্গে’। তারপর ওরা নামে এমপি হোস্টেলের সামনে। আরেক পাকিস্তানি আর্মি অফিসার এসে বলে ‘ হু ইজ রুমী? ‘ রুমী সেদিন তাঁর বাবাকে ফিসফিস করে বলেছিল, ‘তোমরা কেউ কিচ্ছু স্বীকার করবে না, আমি তোমাদের কিচ্ছু বলিনি’।

রুমীর বাবা কিছু স্বীকার করে না; রুমি নিখোঁজ হয়। ৪৪ বছর বাদেও ওঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না…

১৯৭১ সালে শহিদ হওয়া তরুণ এই যোদ্ধার গল্প ১৯৭১ সালেই শেষ হয়ে যেতে পারত অন্য তিরিশ লক্ষ শহিদের মতো, কিন্তু সেই তরুণ যোদ্ধাটি বড় ভাগ্যবান ছিল। তাঁর ছিল একজন মা, যেই মা তাঁর সন্তানকে হারিয়ে যেতে দেননি, যেই মা’য়ের হাত ধরে লেখা হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বের গল্পটি।

২০ বছর পরের কথা, নিজের সন্তান সহ অসংখ্য শহিদের বিচারের দাবীতে এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্র একাত্তরের ঘাতক দালাল রাজাকার আলবদরদের নির্মূল করতে উদ্যোগী হলেন জাহানারা ইমাম। এই ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানকে রুখে দিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন জাহানারা ইমাম।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠনে তিনিই মূল ভূমিকা রাখেন। আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম।

দেশের লাখ লাখ মানুষ শামিল হয় নতুন এই প্লাটফর্মে। এই কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ‘গণআদালত’-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠিত করে। গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের পক্ষ থেকে জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

জাহানারা ইমাম

গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। তারপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২এপ্রিল ১৯৯২ গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবী সংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন। চিন্তায় চেতনায় মননে ও মেধায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালনকারী ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করলে আন্দোলনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ৩০ জুন ১৯৯২ সংসদে ৪ দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। তবে এ চুক্তি কার্যকর হয়নি আজও।

২৮ মার্চ ১৯৯৩ নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম। তিনি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান রাজপথে। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্রপত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম।

গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। ২৬ মার্চ ১৯৯৩ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশিনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন।

এ সময় খুব দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৯৪ সালের ২ এপ্রিল চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি মারা যান।

বিকেল চারটা পঞ্চাশ মিনিটে ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজ বিএ-১৪৮ নম্বর ফ্লাইটের ৭৪৭ বিমানটির চাকা স্পর্শ করল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে। তারপর দৌড়ে এসে থামলো রানওয়ের ঠিক উত্তর মাথায়। কান ফাটানো গর্জন থামতেই দরজা খুলে গেল বিমানটির। জুড়ে দেয়া হলো সিঁড়ি। যাত্রীরা নামতে শুরু করলেন একে একে। হয়তো তাদের অনেকেই জানেন না তাদের সঙ্গে আরো একজন ফিরে এসেছেন চিরতরে তাঁর আপনার মাতৃক্রোড়ে। কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না সিঁড়ির মাথায় হাত উঁচিয়ে দাঁড়াতে। যাবে না আর।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, তাঁর শেষ চিঠি;

এই আন্দোলনকে এখনো অনেক দুস্তর পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, ছাত্র ও যুবশক্তি, নারীসমাজসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইয়ে আছে। তবু আমি জানি জনগণের মতো বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই গোলাম আযম ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দায়িত্বভার আমি আপনাদের, বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পন করলাম। অবশ্যই, জয় আমাদের হবেই।

- জাহানারা ইমাম।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা