পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্য আমার ভয় হয়, কারো কিছু হয়ে গেলে শেষ মুহূর্তে তাকে দেখতে পাবো তো? তার মুখে অক্সিজেনের নলটা গুঁজে দেয়া যাবে কি?

ট্র‍্যাজেডি শব্দটার সবচেয়ে ভালো বাংলা কি? বিপর্যয়? ইতালিতে এখন যেটা ঘটছে, সেটাকে বিপর্যয় বললে আসলে খুব কম বলা হবে। বৃদ্ধ রোগীরা মারা যাচ্ছেন, আমরা তাদের বাঁচাতে পারছি না। বাঁচানোর চেষ্টাটাও করতে পারছি না, কারণ পর্যাপ্ত আইসিইউ বেড নেই আমাদের হাতে, করোনায় আক্রান্ত হলে বৃদ্ধদের ভালো হবার সুযোগ কম, আর তাই অপেক্ষাকৃত কম বয়েসী রোগীদের ভর্তি করছি আমরা। বৃদ্ধ মানুষগুলো ফিরে যাচ্ছেন, তাদের চোখ ভর্তি জল আর সেই জলের আড়ালে বাঁচার তীব্র আকুতি আমার নজর এড়ায় না। কিন্ত কি করব বলুন, আমরা তো অসহায়! 

এই মানুষগুলো কারো বাবা, কারো মা, কারো বা দাদা-দাদী। শেষ সময়টাতে পরিবার-পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে বিদায় নেয়ার কথা ছিল ওদের, হাসিমুখে শেষ স্পর্শের অনুভূতিটা গায়ে মাখার কথা ছিল। সেটা তারা করতে পারছেন কই? কামরার ছোট্ট একটা অংশে আলাদা থেকে পার করতে হচ্ছে শেষ প্রহরগুলো, মোবাইলের ক্যামেরায় বিদায় জানাতে হচ্ছে প্রিয়জনকে। স্পর্শসুখ? সে তো অলীক কল্পনা! সেধে সেধে মরণ ডেকে আনবে কে? 

এভাবে ওরা বিদায় জানাতে চায়নি, এভাবে মরতেও চায়নি। মানুষগুলো সজ্ঞানে, সমস্ত কষ্টকে সহ্য করতে করতে মরে যাচ্ছেন। স্বামী-স্ত্রী একই দিনে মারা যাচ্ছেন, কে জানে, হয়তো তারা কথা দিয়েছিলেন, কেউ কাউকে আগেভাগে ছেড়ে যাবেন না! বৃদ্ধ দাদা-দাদি, নানা-নানীর তাদের নাতিদের মুখ শেষবারের মতও দেখতে পাচ্ছেন না।

ইতালিতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে করোনাভাইরাস

এই রোগটা সাধারণ ফ্লু'র চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। বিশ্বাস করুন, ফ্লু'র চেয়ে একদমই আলাদা অসুখ এটা। এই রোগটাকে দয়া করে তাই ফ্লু বলে উড়িয়ে দেবেন না। ফ্লু'তে একদিনে চারশো মানুষ মারা যায় না। জ্বর যখন আসে, তখন রোগীর মনে হয় ভূমিকম্প হচ্ছে চারপাশে। দম এমনভাবে বন্ধ হয়ে আসতে চায়, যেন মানুষটা ডুবে যাচ্ছে অথৈ সাগরে। শখ করে হাসপাতালে আসতে চায় না কেউই। শুধু একটু অক্সিজেন পাবার জন্য অসহায় এই মানুষগুলো বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। 

এই রোগটার কোন প্রতিষেধক নেই, এটার বিরুদ্ধে খুব সামান্য কিছু ওষুধ কাজ করে। আমরা সীমিত সামর্থ্য নিয়েই সাহায্য করার সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু ধীরে ধীরে হেরে যাচ্ছি মৃত্যুর কাছে। বৃদ্ধ রোগীরা এই রোগের সঙ্গে যুদ্ধে পেরে উঠছেন না। বিশ্বাস করুন, আমরা কাঁদছি, পাগলের মতো কাঁদছি, কারণ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। আমাদের নার্সরা কাঁদছে। সবাইকে বাঁচিয়ে তোলার সামর্থ্য আমাদের নেই- এই চিন্তাটাই আমাদের ভেঙেচুরে ফেলছে বারবার। 

মৃত্যু আমি কম দেখিনি জীবনে। কিন্ত এমন মৃত্যুর সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি। চোখের সামনে মেশিনের পর্দায় মানুষগুলোর জীবন থেমে যেতে দেখছি প্রতিদিন, একজন, দুজন, দশজন...পঞ্চাশ, একশোজন। প্রচুর রোগী আসছে। খুব দ্রুত আমাদের আরও অজস্র বেড প্রয়োজন হবে। সবার একই সমস্যা।  সাধারণ নিউমোনিয়া। প্রচন্ড শক্তিশালী নিউমোনিয়া। আমরা জানি, কি ভয়াবহ ঘাতককে তারা পুষে রেখেছেন শরীরের ভেতরে, দৈত্য হয়ে সেটি এখন আশ্রয়দাতাকেই খুন করার মিশনে নেমেছে! আমাকে বলুন, কোন ফ্লু এমন ট্র‍্যাজেডির জন্ম দেয় ? 

আমাদের হাসপাতালে এখন কোনো সার্জারি আর হচ্ছে না, অন্য রোগের চিকিৎসাও বন্ধ, সবাই ব্যস্ত করোনা নিয়ে। বাচ্চাদের জন্ম, চোখের অপারেশন, কিংবা ত্বকের চিকিৎসা- সব বন্ধ। সার্জারি রুমগুলোকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বানিয়ে ফেলা হয়েছে। সবাই যুদ্ধ করছি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে, অদৃশ্য এক শত্রুর বিরুদ্ধে। প্রতি ঘন্টায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলছে, মনে হচ্ছে ফাস্ট ফরোয়ার্ড মুডে কোন সিনেমা চলছে বুঝি! ক্রমাগত হাতে আসছে টেস্ট রেজাল্ট। সব পজিটিভ! পজিটিভ! পজিটিভ! এই শব্দটা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা আগে জানতাম না। 

সব রোগীর একরকমের অভিযোগ: অসম্ভব জ্বর, শ্বাস কষ্ট, কাশি, ডুবে যাবার মত দমবন্ধ অনুভূতি। প্রায় সবাই ইনটেনসিভ কেয়ারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ অক্সিজেন মাস্কের নিচে থেকেও শ্বাস নিতে পারছেন না। ইতালিতে অক্সিজেন মেশিন এখন সোনার চাইতেও দামি। বিশ্বাস করতে পারছি না, কত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটে গেল! আমরা সবাই ভীষণ ক্লান্ত, আকস্মিক এই ধাক্কাগুলো আর নিতে পারছি না। 

লাফিয়ে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা

কিন্তু থেমে যাওয়ার লক্ষণ নেই কারো মধ্যে। সবাই মাঝরাত পর্যন্ত কাজ করে চলেছি একটানা। ডাক্তাররা নার্সদের মত অবিরাম কাজ করে চলছেন। দুই সপ্তাহ ধরে আমি বাসায় যাই না। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্য আমার ভয় হয়, কারো কিছু হয়ে গেলে শেষ মুহূর্তে তাকে দেখতে পাবো তো? তার মুখে অক্সিজেনের নলটা গুঁজে দেয়া যাবে কি? অবস্থাদৃষ্টে সেরকম আশা দেখছি না। আমার বাচ্চাদেত সঙ্গে ক্যামেরা ব্যবহার করে কথা বলছি। মাঝে মাঝে আমি স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদি। মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে, কি পাপ করেছিলাম আমরা? তারপর মনে হয়, আমাদের কারো আসলে কোন দোষ নেই। তাহলে দোষটা কার?

যারা আমাদের বলেছিল এই রোগটা আসলে তেমন ভয়ংকর নয়, ভীতিকর নয়- সমস্ত দোষ তাদের। ওরা বলেছিল এটি সাধারণ এক ধরনের ফ্লু। প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, চীনের অবস্থা দেখার পরেও না! এখন আমরা লড়ছি  কিন্ত বড্ড দেরী হয়ে গেছে, দানব ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতরে, আক্রান্ত করেছে শরীরকে। 

খোদার ওয়াস্তে ঘরের বাইরে বের হবেননা। আমার কথাগুলো শুনুন। শুধুমাত্র ইমার্জেন্সি কারন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না। সাধারণ মাস্ক ব্যবহার করুন। প্রফেশনাল মাস্কগুলো আমাদের ব্যবহার করতে দিন। মাস্কের অভাবে আমাদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে। কোন কোন ডাক্তার এখন আক্রান্ত। তাদের পরিবারের অনেকেই জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আপনারা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করুন। পরিবারের বয়স্ক মানুষগুলোকে দেখে রাখুন, তাদেরকে ঘরে থেকে বের হতে দেবেন না কয়েকটা দিন। 

আমাদের পেশার কারণেই আমরা ঘরে থাকতে পারছি না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা রোগীদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি, যুদ্ধে আমরা হেরে যাচ্ছি জানি, কিন্ত হাল ছাড়ছি না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমরা নিজেদেরকেও আক্রান্ত করে ফেলছি। ভাইরাস বাসা বাঁধছে আমাদের শরীরে, মনটা তো আগেই ভেঙে পড়ে আছে। যাদের বাঁচাতে পারছি না, তাদের শরীরের কষ্ট কমানোর চেষ্টা করছি। কাল সব ঠিক হয়ে গেলে আমাদের কথা সবাই ভুলে যাবে। ডাক্তারদের এটাই পেশা- থ্যাংকলেস জব। এটা আমি জানি, তাই মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। 

এই রোগ আপনাকে ছোঁয়নি মানেই যে আপনি নিরাপদ, এমনটা কিন্ত নয়। সাবধানে থাকুন। জনসমাগম থেকে দূরে থাকুন। সিনেমা দেখতে যাবেন না, মিউজিয়ামে যাবেন না, খেলার মাঠে যাবেন না। বেঁচে থাকলে পরে অজস্র সিনেমা দেখতে পারবেন, খেলা উপভোগ করতে পারবেন, ডেট করতে পারবেন। মরে গেলে সব শেষ। 

দয়া করে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ মানুষগুলোর কষ্টটা অনুভব করার চেষ্টা করুন। তাদের জীবন আপনাদের হাতে। এবং আপনারা আমাদের চাইতে বেশি মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম। আপনি চাইলেই তাদের রক্ষা করতে পারেন, আপনার একটুখানি সাবধানতা পারে একশোটা জীবন বাঁচাতে। লেখাটি শেয়ার করুন। শেয়ার করুন যেন পুরো ইতালি, পুরো বিশ্ব এই চিঠিটি পড়তে পারে। সবকিছু শেষ হবার আগেই যেন পড়তে পারে, সাবধান হতে পারে...

-বে গাভাস্তানি হাসপাতাল থেকে ডাক্তার ড্যানিয়েল মানচিনি


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা