আরামকোর কর্তাব্যক্তিরা কি কোন সৌদি নাগরিকের গায়ে এভাবে মোবাইল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বসিয়ে মানুষকে সচেতন করতে পারতো? সেই সাহসটা তাদের হতো কিনা?

করোনার প্রকোপ বাড়ছে, বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাস। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে এশিয়া-অস্ট্রেলিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য, মরণব্যাধির আক্রমণ থেকে বাদ যাচ্ছে না কোন জায়গায়। আপনি একটা কোম্পানীর মালিক, বা বড় কর্তা। কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরী করতে চান, সবাই নিজেকে পরিস্কার রাখবে- এমন ইচ্ছে আপনার। কিন্ত সেজন্যে কোন কর্মীর শরীরকে মোবাইল হ্যান্ড স্যানিটাইজার হিসেবে ব্যবহার করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া বা অফিসের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়ার মতো স্টুপিড আইডিয়া নিশ্চয়ই আপনার মাথায় জায়গা নেবে না? 

এই অদ্ভুত, এবং জঘন্য ঘটনাটা ঘটেছে সৌদি আরবে। সৌদি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আরামকো'র মূল ভবনের সামনে কয়েকজন ব্যক্তিকে তারা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তাদের শরীরের ওপরের অংশে লাগানো রয়েছে বাক্স আকৃতির মোবাইল স্যানিটাইজার, পুশ বাটনে চাপ দিলেই বেরিয়ে আসছে তরল, অফিসের কর্মচারীরা সেখান থেকে হাত পরিস্কার করে প্রবেশ করছে ভেতরে- এরকম কয়েকটা ছবি প্রকাশিত হয়েছে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এশিয়া টাইমস, টেলিগ্রাফ, ফক্স নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমসের মতো বিখ্যাত দৈনিকগুলোতে।

প্রবাসী কর্মী বা কর্মচারীদের ওপর সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা মালিকদের অত্যাচার, নির্যাতন এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ঘটনার প্রচুর উদাহরণ আছে। এমন অমানবিক আচরণ এই অমানুষদের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়, তাই অবাক হচ্ছি না। শুধু একটা কথাই মাথায় আসছে- যে গর্ধবের মাথা থেকে এই হিউম্যান হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়ে আস্ত মানুষকে বাইরে দাঁড় করিয়ে দেয়ার প্ল্যানটা এসেছে- তার মাথাটাই আগে স্যানিটাইজার দিয়ে ভালোভাবে পরিস্কার করা প্রয়োজন!

ভুক্তভোগী শ্রমিকের নাম এবং দেশের পরিচয় প্রকাশ করেনি কোনো গণমাধ্যমই। তবে শারিরীক গড়ন এবং বেশভূষা দেখে বোঝা যায়, তার বাড়ি ভারত বা বাংলাদেশেই হবে। ভারতীয় নাগরিকদের সঙ্গে সৌদি আরবের লোকজন এরকম অসভ্যতা করার সাহস পাবে কিনা- এটা একটা বড় প্রশ্ন। কারণ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ভারতীয় দূতাবাস এসব ব্যাপারে খুবই তৎপর, এমন অসভ্য আচরণ কোন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে করার আগে সৌদি আরবের ইতর লোকজন দশবার ভাববে। 

কোন সৌদি নাগরিকের সাথে এমন আচরণ করার সাহস কি আরামকো পেতো?

বাকী রইলো বাংলাদেশ। প্রবাসী কর্মীদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন আর বাজে ব্যবহার যা হয়- সেটার সিংহভাগ আমাদের ওপরেই। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়া নারী গৃহকর্মীদের ওপর অত্যাচারের ঘটনাগুলো শুনে তো গা শিউরে ওঠে। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের নামে ভুক্তভোগী হওয়া সেই শ্রমিকের তাই বাংলাদেশী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। টুইটারে ছবিটা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমালোচনায় মেতেছেন ব্যবহারকারীরা, একটা নামজাদা প্রতিষ্ঠানের এমন অভব্য আচরণে স্তম্ভিত সবাই। এই আচরণটা পরিস্কারভাবেই বর্ণবাদী, এবং বৈষম্যমূলক, অনেকে তো এটাকে তুলনা করেছেন দাসপ্রথার সঙ্গেও! 

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, আরামকোর কর্তাব্যক্তিরা কি কোন সৌদি নাগরিকের গায়ে এভাবে মোবাইল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বসিয়ে মানুষকে সচেতন করতে পারতো? সেই সাহসটা তাদের হতো কিনা? সেরকম কিছু ঘটলে তো এতক্ষণে কোম্পানী বন্ধ হয়ে যেতো, এটার সঙ্গে জড়িতরাও জেলে থাকতেন এতক্ষণে। কিন্ত ভুক্তভোগী ব্যক্তিটি উপমহাদেশীয় হওয়াতেই হয়তো সবার এত উদাসীনতা। 

আরামকো অবশ্য এক বিবৃতিতে নিজেদের হালাল প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছে, বলেছে- "আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি না নিয়েই কেউ এটি করে ফেলেছে। এমন আপত্তিকর ঘটনার জন্য আমরা সত্যিই দুঃখিত।" কাউকে সামাজিকভাবে নিচু করতে নয় বরং স্যানিটাইজারের গুরুত্ব তুলে ধরতেই এটি করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে কোম্পানিটি। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেনো না ঘটে, সে ব্যাপারেও তারা কড়া পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্ত ঘোড়া চুরির পরে আস্তাবলে তালা দিয়ে আর লাভ কি? এমন কুমিরের কান্না দিয়ে কি কারো আআত্মসম্মান ফিরিয়ে দেয়া যাবে? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা