হঠাৎই একদিন ফ্রান্সিস রাইটের বন্ধু তাকে বললেন, 'তুমি এরকম একটি সেক্সিস্ট জাতীয় সংগীত কীভাবে গাইছ, ফ্রান্সিস?'

১৯৯৭ সালে ফ্রান্সিস রাইট প্রথম লক্ষ্য করেন যে কানাডার জাতীয় সংগীত 'ও কানাডা'য় কিছু একটা যেন নেই। ওই বছরই তিনি কানাডায় নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য 'ফেমাস ফাইভ' নামে পরিচিত যে পাঁচজন নারী আন্দোলন করেছিল, তাদের নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির কাজ শুরু করেন। এবং তাদের প্রথম ইভেন্টগুলোর একটিতেই আশ্চর্য এক জিলিস লক্ষ্য করেন। 'ও কানাডা' গানটি শুরু হচ্ছে এভাবে,

O Canada! Our home and native land! True patriot love in all thy sons command.

মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমানো রাইট এর আগে গানটি নিয়ে বেশি কিছু ভেবে দেখেননি। কিন্তু এবার গানটি শেষ হওয়া মাত্র তার এক বন্ধু যেন তার চোখে আঙ্গুল দিয়ে সমস্যাটি ধরিয়ে দিলেন। বললেন, 'তুমি এরকম একটি সেক্সিস্ট জাতীয় সংগীত কীভাবে গাইছ, ফ্রান্সিস?' তিনি একটু ভালো করে খেয়াল করে দেখলেন, গানে কেবলমাত্র কানাডার পুত্রদের স্তুতি গাওয়া হচ্ছে, কন্যাদের কথা যেন ভুলেই যাওয়া হচ্ছে। 

সেই থেকে ক্রমান্বয়ে কানাডার জাতীয় সংগীত নিয়ে মানুষের প্রশ্ন তোলার সূচনা। এরপর রাইট অনেক ইভেন্টে উপস্থিত থেকেছেন, যেখানে জাতীয় সংগীতটি গাওয়া হয়েছে। এবং তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছেন, অনেক বাবাই এই গানের কথা নিয়ে তাদের বিরক্তির কথা ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেছেন, 'আমার একটি পুত্র ও একটি কন্যা আছে। কিন্তু জাতীয় সংগীতে তো আমি কেবল আমার পুত্রের উল্লেখ পাচ্ছি'। 

চোখের সামনে বারবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখে রাইট ঠিক করলেন, কিছু একটা তো করতেই হবে। যদি পুরো জাতীয় সংগীতটি পরিবর্তন করা না-ও যায়, অন্তত একটি চরণে তো সামান্য পরিবর্তন আনাই যায়। যাতে করে জাতীয় সংগীতটি থেকে লিঙ্গ বৈষম্য দূর হয়।রাইটের এই প্রচেষ্টার যাত্রা নেহাত সহজ ও ছোট ছিল না। লম্বা একটি পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। কিন্তু অবশেষে তিনি সফলতার মুখ দেখেছেন।

ফ্রান্সিস রাইট

২০১৮ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে কানাডার সিনেটে একটি বিল পাস করার মাধ্যমে 'ও কানাডা' গানটিকে লিঙ্গ নিরপেক্ষ করে তোলা হয়েছে। এবং এটি রাজকীয় অনুমোদনও পেয়েছে। সেদিন থেকে গানটিতে "in all thy sons command" এর পরিবর্তে গাওয়া হয়, "in all of us command"। 

'ও কানাডা' গানটি মূলত রচিত হয় ১৮৮০ সালে। কিন্তু এটিকে অন্তত এক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয় কানাডার প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয় সংগীতের মর্যাদা লাভ করতে। কুইবেকের স্বাধীনতার প্রশ্নে ৪০% ভোটার যখন কানাডার ছাড়ার পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন দেশটির সংযুক্ত সরকার 'সেভ দ্য কুইন' এর পরিবর্তে 'ও কানাডা'-কে জাতীয় সংগীত হিসেবে মনোনীত করে। ততদিনে 'ও কানাডা' গানটি খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু তারপরও অনেকেই এই গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে মেনে নিতে পারেননি।

পুত্রদের প্রাধান্য দেয়ার বিষয়টি যদি বাদও দেয়া হয়, আরেকটি চরণে রয়েছে "our home and native land", যা অনেকেরই বিরক্তি উদ্রেক করে। তবে তখনও এটি নিয়ে আন্দোলন খুব একটা জোরদার হয়নি, যা পরবর্তীতে হয় রাইটের হাত ধরে। তিনি এই গানের কথা পরিবর্তন বা সংশোধনের দাবিতে একটি পিটিশন বের করেন, এবং জনে জনে গিয়ে গণস্বাক্ষর যোগাড় করতে শুরু করেন। কিন্তু তখনও সামাজিক যোগাযোগের যুগ শুরু হয়নি। তাই জনমত গড়ে তোলা মোটেই সহজ কোন কাজ ছিল না। ফলে শেষমেষ মাত্র ৪০০-৫০০টি স্বাক্ষর যোগাড় করতে সমর্থ হয়েছিলেন রাইট।

জনমত গড়ে তোলা মোটেই সহজ কোন কাজ ছিল না

সাধারণ অনেক মানুষ তাকে সাহায্য তো করেইনি, বরং অনেকেই তার ওপর চরম রাগান্বিতও হয়ে ওঠে। অনেকেই বলতে শুরু করেন, 'আপনারা কেন এটি পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন? আমাদের তো এই গান নিয়ে কোন সমস্যা নেই। মিলিটারিতে কাজ করা অধিকাংশই তো পুরুষ!' তবে এতে দমে যাননি তিনি। আসলেই তো, সাড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষ নিয়মিত যেই গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গেয়ে আসছে, এত সহজেই কি আর সেটির একটি লাইন পাল্টে দেয়া সম্ভব? এটি সম্ভব করে তুলতে যে সময় দরকার, তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তিনি ও তার সহযোদ্ধারা। সবমিলিয়ে ১৩ বার জাতীয় সংগীত সংশোধনের বিলটি পাসের চেষ্টা করা হয় কানাডার সিনেটে। প্রথম ১২বারই এ উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলেও, ১৩তম বারে মেলে সাফল্য।

কীভাবে সম্ভব হলো তা? এর একটি প্রধান কারণ ছিল ২০১৫ সালে লিবারেল পার্টির স্বঘোষিত নারীবাদী জাস্টিন ট্রুডোয়ের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। এর পরেরবার ট্রুডোর একজন সংসদ সদস্য মাউরিল বিলেঙ্গার জাতীয় সংগীতটি সংশোধনের জন্য সিনেটে একটি বিল উত্থাপন করেন। উল্লেখ্য, তিনি আগেও একবার এমন বিল উত্থাপন করেছিলেন। ওই সময়ে তিনি অ্যামিওট্রোফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস রোগে ভুগছিলেন, এবং এই বিলটি উত্থাপনের জন্য তাকে একটি আইপ্যাড অ্যাপের সাহায্য নিতে হয়। 

ওই বছরের, অর্থাৎ ২০১৬ সালের জুনে, কানাডার হাউজ অফ কমন্সে বিলটি পাস হয়, আর এর দুই মাস পর বিলেঙ্গার মারা যান। হাউজ অফ কমন্সে বিলটি পাস হয়ে যাওয়ার মানে হলো, এরপর আর শুধু সিনেটে বিলটি পাস হওয়াই বাকি ছিল। কিন্তু তখন আবার নতুন এক নাটক শুরু হয়। জাতীয় সংগীত সংশোধনের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী একটি গোষ্ঠীও দেশজুড়ে জোর প্রচারণা চালাতে শুরু করে। তাদের পক্ষে দাঁড়ায় কয়েকজন জাতীয় অ্যাথলেটও। তাদের দাবি ছিল, বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তারা বদলে যাওয়া জাতীয় সংগীত গাইতে পারবেন না, এতে ভুল হওয়ার আশংকা দেখা দেবে। 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এমন অদ্ভূত দাবি ধোপে টেকেনি। কানাডার জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার প্রায় ৪০ বছর পর, ফ্রান্সিস রাইট ও তার মত অনেকের অক্লান্ত পরিশ্রম, সাধনা ও প্রচেষ্টায় 'ও কানাডা' গানটির কথা পরিবর্তিত হয়। এবং এভাবে কানাডার জাতীয় সংগীত ফিরে পায় তার লিঙ্গ নিরপেক্ষতা

সুত্র- বিবিসি

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা