রাজকাঁকড়ার এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রতিবছর লাখ লাখ রাজকাঁকড়া ধরা হচ্ছে। পাঠানো হচ্ছে ল্যাবরেটরীতে। আর এভাবেই ক্রমশ লোপ পাচ্ছে বাস্তুসংস্থানের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রজাতির অস্তিত্ব...

মানবজাতির বেঁচে থাকা আসলে বেশ ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া । সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমাদের বেশ এলিট একটি স্ট্যাটাস তো রয়েছেই। কিন্তু আমাদের এই এলিট স্ট্যাটাসের পেছনে আত্মাহুতি দিচ্ছে যে কতশত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণ, তার হিসেব নেই। এই যেমন ধরুন রাজকাঁকড়ার কথা। এই কাঁকড়ার নীল রক্ত মানুষকে বাঁচানোর জন্যে বেশ অনেককাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসা এক মহৌষধ। শুনি নাহয় এই রাজকাঁকড়া অথবা হর্সহো ক্রাবের আত্মত্যাগের গল্পটাই। 

ধরা যাক, কোনো একটি কোম্পানি একটা রোগের জন্যে ওষুধ বানাচ্ছে। এখন ওষুধ বানানো তো আসলে শেষ ধাপ। সেই ওষুধ বানানোর আগেও রয়ে যায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। রয়ে যায়, বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষা। পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা হয়, ওষুধটি মানবদেহে বিপজ্জনক কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরী করবে কী না। বা ওষুধের মধ্যে কোনো ব্যাকটেরিয়া আছে কী না।  যদি ব্যাকটেরিয়া না থাকে তবেই ওষুধটি বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এখন এই ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করার জন্যে ব্যবহার করা হয় রাজকাঁকড়ার নীল রক্তকে। কারণ এই নীল রক্ত, অল্প ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখায়। যেটার পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে ওষুধ বানানো অথবা না বানানো নির্ভর করে।

সমস্যা হচ্ছে, এই পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্যে প্রতিবছর প্রচুর রাজকাঁকড়ার দরকার হয়। আমেরিকার ল্যাবগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই অজস্র রাজকাঁকড়ার প্রয়োজন হয়। একারণে তাই সমুদ্র থেকে লাখ লাখ রাজকাঁকড়া ধরে প্রতিদিন পাঠানো হয় ল্যাবগুলোতে। ল্যাবে নেয়ার পর কাঁকড়ার শিরায় ছিদ্র করে সামান্য রক্ত নেয়ার পর আবার তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় সমুদ্রে। 

এটুকু পড়েই হয়তো কেউ কেউ ভাবছেন, তাহলে তো হলোই। রক্তও নেয়া হলো, কাঁকড়াও মারা গেলোনা। তাহলে সমস্যা কোথায়? 

সমস্যা আছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এভাবে ল্যাব থেকে যে রাজকাঁকড়াগুলো ফিরে যায় সমুদ্রে, তাদের ত্রিশ শতাংশই আর বাঁচে না। মহিলা কাঁকড়াগুলো হারায় তাদের প্রজননের ক্ষমতাও। এইসব কারণে যেটা হয়েছে, পৃথিবী থেকে ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে রাজকাঁকড়ার মোট সংখ্যা। আস্তে আস্তে এই প্রাণীটি নাম লেখাচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর তালিকায়।

ইউরোপেও একসময়ে অনেক রাজকাঁকড়ার রক্ত ব্যবহার করা হতো এই জাতীয় পরীক্ষানিরীক্ষার জন্যে। কিন্তু তারা সম্প্রতি কৃত্রিম কেমিক্যাল তৈরী করে নিয়েছে পরীক্ষাগারেই। যে কারণে তাদের আর সরাসরি লাগছে না এই স্পেসিস কে। কিন্তু আমেরিকা সহ বড় বড় আরো কয়েকটি দেশে এখনো দেদারসে রাজকাঁকড়াকে ধরে ইচ্ছেমত ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউরোপের দেখানো পথ ধরে বাদবাকি দেশগুলোও কিন্তু ল্যাবে কৃত্রিম কেমিক্যাল তৈরী করে নিতে পারতো, কিন্তু তারা করছেনা। কারণ কৃত্রিম জিনিসের ওপর তাদের খুব একটা ভরসা নেই। 

করোনার এই ক্রান্তিকালে রাজকাঁকড়ার প্রয়োজনীয়তা আরো প্রকট হয়েছে। ভ্যাক্সিন থেকে শুরু করে অনেক কিছুর জন্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে এই নীল রক্ত।  সমস্যা হলো, এভাবে চলতে থাকলে বাস্তুসংস্থানের এক বড়সড় ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা কাম্য না কারোরই। তাছাড়া ইউরোপ যেখানে কৃত্রিম কেমিক্যাল ব্যবহার করে সাফল্য পাচ্ছে, সেখানে সবারই এই উদাহরণ টা অনুসরণ করা উচিত। তাহলেই মানুষ বাঁচবে। সে সাথে বাঁচবে দুর্লভ একটি প্রজাতিও। 

নাহয় আমাদের "ব্লু ব্লাড" বজায় রাখতে গিয়ে আমরা হারাবো নীল রক্তের বিপন্ন সুন্দর এক প্রাণী! 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা