২০০৫ সাল, আমরা তখন হাইস্কুলে পড়ি। হিন্দি গানের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে সেই বয়সে। হুট করেই একটা গান আমাদের মধ্যে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে গেল। গানের নাম 'আশিক বানায়া আপনে', অবশ্য সেই গানটা শোনার চেয়ে দেখার প্রতিই আগ্রহ ছিল বেশি। ইমরান হাশমি তখন অনেকের কাছেই মহানায়ক! গানের পেছনের মানুষটাকে আমরা তখনও চিনি না সেভাবে। তবে চিনতে সময় লাগলো না, কিংবা বলা যায়, সেই গায়ক নিজেকে চেনাতে সময় নিলেন না খুব বেশি।

একটার পর একটা হিট গান, বলিউডে প্লেব্যাক মানেই তখন হিমেশ রেশমিয়া, আর হিমেশের গান মানেই বিশেষ কিছু! এলাম, দেখলাম, জয় করলাম- বলিউডে হিমেশের ক্যারিয়ারটাকে এভাবেও লেখা যায়। 'আশিক বানায়া আপনে' সিনেমার ভিডিও গানের প্রতি তরুণদের তুমুল আসক্তি ছিল সেই সময়ে, কিন্ত অনেকেই জানেন না, এই সিনেমার অডিও অ্যালবামটা বিক্রি হয়েছিল বিশ লক্ষ পিস!

আকসার, ফির হেরা ফেরি, চুপ চুপ কে, আপ কি খাতির, ফুল এন্ড ফাইনাল, শাকালাকা বুমবুম... একের পর এক হিট অ্যালবাম আসছিল হিমেশের। সিনেমা ফ্লপ হলেও শুধু হিমেশের কারণেই হিট হয়ে যাচ্ছিল অডিও অ্যালবাম। গলায় অদ্ভুত একটা মাদকতা ছিল তার, গানগুলোকেও সেই সময়ের তুলনায় খানিকটা অগ্রবর্তীই বলা যায়। আর এই দুইয়ের কম্বিনেশনটা শ্রোতারা গ্রহণ করেছিল দারুণভাবে।

হিমেশের ক্যারিয়ারের তখন পিক টাইম। তিনি যেখানে হাত দিচ্ছেন সেখানেই সোনা ফলছে, লোহাও হীরে হয়ে যাচ্ছে, এমন একটা অবস্থা! সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাবেন ভেবেই হুট করে গায়ক থেকে নায়ক হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন হিমেশ, অভিনেতা হিসেবে ২০০৭ সালে অভিষেক হয়ে গেল তার, দুই নায়িকা হ্যান্সিকা আর মল্লিকা শেরাওয়াতের সঙ্গে নায়ক হিসেবে পর্দায় এলেন হিমেশ, সিনেমার নাম আপ কা সুরুর। 

'আপ কা সুরুর' সিনেমা দিয়েই গায়ক থেকে নায়ক হবার শুরুটা করেছিলেন হিমেশ

সিনেমার গল্পটা আহামরি কিছু ছিল না। হিমেশের অভিনয়ের প্রশংসাও করেনি তেমন কেউ। তবুও সিনেমাটা হিট হয়েছিল, শুধু হিমেশের দুর্দান্ত জনপ্রিয়তার কারণেই। আর এই ব্যাপারটাই বোধহয় হিমেশের মাথা খারাপ করে দিল খানিকটা। গানের প্রতি মনোযোগ কমে গেল হুট করেই, নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার দিকেই সময় আর পরিশ্রম ব্যয় করছিলেন বেশি।

কিন্ত হিমেশ ভুলে গিয়েছিলেন, প্রতিটা মানুষেরই একটা স্ট্রং জোন থাকে, সেটা ছেড়ে উইক জোনকে আঁকড়ে ধরতে গেলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। হিমেশের বেলায় সেটাই হয়েছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রূচি বদলে যায়। যে জিনিসটা দুইদিন আগে ভালো লাগছিল, সেটা দুদিন পর ভালো নাও লাগতে পারে। দর্শক-শ্রোতারা নতুনত্ব চায়, সেটা না পেলে পছন্দের শিল্পী বা অভিনেতাকে ছুঁড়ে ফেলতেও দ্বিধা করে না। সময়টা বদলে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে, কিন্ত হিমেশ বদলাতে পারছিলেন না নিজেকে। তার গানে নেশা ধরে যাওয়ার ব্যাপারটাও হারিয়ে যাচ্ছিল। একসময় হিমেশ মানেই ছিল হিট গান, সেই চিরচেনা ফর্মূলাটা বদলে যেতে শুরু করলো। সেখানে শ্রোতাদের দায় প্রায় শূন্য, পুরো দায়টাই নিতে হবে হিমেশকে।

সেই আগের হিমেশ রেশামিয়া

কাজ কমিয়ে দিয়েছিলেন ২০০৯ সালের পরে, কিন্ত তবুও সেভাবে সাফল্য ধরা দিচ্ছিল না হাতে। তেরা সুরুর নামে একটা সিনেমা করলেন, সেটা ডাহা ফ্লপ হলো। আগের সিনেমাটা হিমেশকে যে বিশ্বাসটা দিয়েছিল যে, তিনি যা'ই করবেন সেটাই হিট হবে, সেই বিশ্বাসে বড়সড় ধাক্কা দিল এটা। আর কিছুদিন আগে নিজের হিট গান আশিক বানায়া আপনে'র একটা রিমেক ভার্সন বানালেন হেট স্টোরি-৪ সিনেমার জন্যে, সেটাও প্রশংসার বদলে কাঁড়ি কাঁড়ি সমালোচনা কুড়িয়েছে। বলিউড বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এই কাজটা করেই নিজের ক্যারিয়ারের কফিনে নিজেই শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছেন হিমেশ!

একটা মানুষ খুব অল্প সময়ে শূন্য থেকে কীভাবে শিখরে উঠতে পারে, আবার জনপ্রিয়তার এভারেস্ট থেকে কীভাবে খুব দ্রুতই নেমে আসতে পারে মাটিতে, দুটো ব্যাপারই দেখিয়ে দিয়েছেন হিমেশ। ২০০৬-০৭ সালের সময়টায় বলিউডে তার মতো জনপ্রিয় শিল্পী আর কেউ ছিলেন না। সেই জনপ্রিয়তাটাকে হিমেশ ধরে রাখতে পারেননি, হেলায় হারিয়েছেন, অপচয় করেছেন।

যে মানুষটার গান দিনের বেশিরভাগ সময়, প্রাইম টাইমে টিভি চ্যানেলগুলোতে বাজতো, টানা কয়েকটা বছর রেডিও স্টেশনগুলো টিকে ছিল যার গানের ওপর ভর করে, যাকে কম্পোজার হিসেবে নিলে অডিও অ্যালবাম নিয়ে প্রযোজক-পরিচালককে চিন্তাই করতে হতো না, সেই হিমেশ রেশমিয়া নিজেকেই বলিউডি রাডারের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ধীরে ধীরে!

ভারতীয় শিল্পী হিসেবে ওয়েম্বলি অ্যারেনা আর আমস্টারডামের হেইনকেন মিউজিক হলে গান গাওয়া হিমেশ রেশমিয়া এখন দৃশ্যপটের অনেক বাইরে থাকা একজন। বলিউডের অনেকেই বলে থাকেন, হিমেশ হচ্ছেন একজন ঠান্ডা মাথার খুনী। নিজের গান, নিজের স্বত্ত্বাকে তিনি গলা টিপে খুন করেছেন। হিমেশের এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনের গল্পটা শুনলে এই মতবাদে দ্বিমত করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না খুব একটা...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা