মানুষের মৃত্যু নিয়ে শুরু করলেন তিনি ব্যবসা। বানালেন বিষ। এমন বিষ, যে বিষের নেই স্বাদ-বর্ণ-গন্ধ। মৃত্যুর পরে মৃতের দেহেও পাওয়া যায় না কোনো অস্তিত্ব। লাশের পাহাড়ে সওয়ার হয়ে আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন তিনি!

রেনেসাঁর সময় তখন, সপ্তাদশ শতাব্দী। ইতালিতে তখন পুরুষরাই সর্বেসর্বা।  পুরুষশাসিত সমাজ-ব্যবস্থায় তাদের কথাই শেষ কথা। নারীদের কিছু বলার ছিলোনা। বিয়ের পরে নারীরা হয়ে যেতো স্বামীর সম্পত্তি। এবং বিয়েগুলোতে ছিলোনা কোনো বিচ্ছেদেরও সুযোগ। পরিবার থেকে বিয়ে দেয়া হতো মেয়েদের। স্বামী যেরকমই হোক, স্ত্রীদের বলার কিছু থাকতোনা। অত্যাচার, নির্যাতন সবকিছু সহ্য করে নিতে হতো তাদের। বিচ্ছেদের বিষয় যেহেতু নেই। তাই, মেয়েদের পরিত্রাণ পাওয়ার পথটাও একেবারে বন্ধ হয়ে রইলো। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলো নির্যাতিত মহিলাদের। কী করা যায়? কিছুই করার বুদ্ধি আসছে না মাথায়।

এমন সময়ে আবির্ভাব হলো এক রহস্যময় মহিলার, যার নাম- গিউলিয়া তোফানা। তিনি বললেন- 'সমস্যা যেটা হোক, সেটাকে নিকেশ করে ফেললেই তো ভালো। এই নিন বিষ, মেরে ফেলুন স্বামীকে। স্বামীও মারা গেলো, আপনিও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলেন।' শুনতে যতই নৃশংস মনে হোক বিষয়টা, অনেক মহিলাই আর কোনো উপায় না পেয়ে এই বিষ, যার নাম 'একুয়া তোফানা' কিনতে শুরু করলেন। স্বামীদের বিষের সাহায্যে মারাও শুরু করলেন। গিউলিয়ার ব্যবসাও আস্তে আস্তে রমরমা হতে শুরু করলো। 

গিউলিয়ার পরিচয় টা দিয়ে দেয়া যাক। প্রথমেই বলে রাখা দরকার, গিউলিয়ার আসল পরিচয় খুঁজে পাওয়া একটু শক্ত। পৃথিবীর কোনো বইয়ে নেই তাকে নিয়ে কোনো ছবি, নেই কোনো পুরোপুরি সঠিক তথ্য। তবে ধারণা করা হয় আনুমানিক ১৬২০ সালে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের পালেরমো শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মা থোফানিয়া ডি আদেমো'র ছিলো মেকআপের বিজনেস। মেয়ে বড় হয়ে মায়ের মেকআপ বিজনেস দেখাশোনা শুরু করেন। তবে এখানে চমকে যাওয়ার মত একটা তথ্য হলো- গিউলিয়ার মা থোফানিয়াও একসময়ে বিষের ব্যবসা করতেন। বহু মানুষকে মেরেছিলেন তিনিও! 

মায়ের মেকআপ ব্যবসা মেয়ে গিউলিয়া সামলাচ্ছিলেন। এরমধ্যেই মহিলাদের ওপরে নির্যাতন চরমে উঠলো ইতালিতে। নিপীড়িত স্ত্রী'রাও চাইলেন পথের কাঁটা স্বামীকে সরাতে। গিউলিয়া মেকআপের আড়ালে শুরু করলেন বিষের ব্যবসা। আর্সেনিক, লেড আর বেলাডোনা মিশিয়ে তিনি একটা তরলের মত বানাতেন। যেহেতু তিনি মেকআপ বক্স বিক্রি করতেন, সেই মেকআপ বক্সের একগাদা সরঞ্জামের সাথে থাকতো তরলের এই ছোট শিশিটিও। শিশির ওপরে থাকতো সেইন্ট নিকোলাস এর ছবি। মানুষজন ভাবতো, এটা সম্ভবত পবিত্র কোনো তরল। তাই সমীহ করতো। খুব একটা ঘাঁটাতো না।

এই তরলের দুই-তিন ফোঁটা গ্রহণ করলেই মৃত্যু ঘটতো স্বাভাবিক মানুষের৷ তবে সাথেসাথে না। বিষপ্রয়োগের দুই-তিন অথবা ক্ষেত্রবিশেষে এক সপ্তাহ পরে মারা যেতেন, বিষ পান করা মানুষটি। এবং ময়নাতদন্তেও পাওয়া যেতোনা কিছুই। অর্থাৎ, সাপও মরতো। লাঠিও থেকে যেতো অক্ষত! 

এভাবেই চলছিলো। গিউলিয়ার ব্যবসাও ফুলেফেঁপে উঠছিলো। কিন্তু এরপরেই ঘটলো এক ঝামেলা। এক মহিলা একদিন স্বামীর জন্যে 'একুয়া তোফানা' কিনলেন। বাড়িতে এসে স্যুপের মধ্যে মিশিয়ে দিলেন এই বিষ। স্বামীকে খেতেও দিলেন। স্বামী খেতে যাবে স্যুপ, হুট করে কী হলো স্ত্রীর, টান মেরে সরিয়ে দিলেন বিষমাখানো স্যুপ। জানালেন, ঐ স্যুপে নিজেই বিষ মাখিয়েছেন তিনি। আরো চাপাচাপির পর স্বীকার করলেন গিউলিয়ার কথাও। গিউলিয়ার গোমড় ফাঁস হয়ে গেলো। 

কিন্তু তাও গিউলিয়াকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি তখন। গিউলিয়া ছিলেন বেশ জনপ্রিয় এবং সুন্দরী। প্রভাবশালী অনেকেই ছিলেন গিউলিয়ার শুভাকাঙ্ক্ষী। পুলিশের ঝামেলা এড়িয়ে তিনি আশ্রয় নেন এক চার্চে। কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয় না। গুজব ওঠে, স্থানীয় সব এলাকার পানিতে বিষ মিশিয়েছেন গিউলিয়া। এই গুজবের ফলে আতঙ্ক চরমে ওঠে স্থানীয়দের মধ্যে। চার্চ থেকে গিউলিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। 

পুলিশের জেরার মুখে গিউলিয়া স্বীকার করলেন, প্রায় ছয়শো মানুষকে এভাবে মেরেছেন তিনি। যদিও সংখ্যাটা আরো বেশি হতে পারে। এবং গিউলিয়ার মেয়ে ও তার তিন পরিচারিকা এই কাজের সাথে যুক্ত। পরে  গিউলিয়া, তার মেয়ে ও বাকি সহযোগিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

গিউলিয়া মারা গেলেও তার বানানো 'একুয়া তোফানা' নিয়ে মাতামাতি হয়েছে এরপরেও অনেকদিন। অনেকেই একুয়া তোফানা বানানোর চেষ্টা করেছেন। সফল হননি। কারণ গিউলিয়ার এই সিক্রেট রেসিপি কোথাও নথিবদ্ধ করা হয়নি। গিউলিয়া ছাড়া এই বিষ বানাতে পারতেন না আর কেউই। এছাড়া বিশ্বখ্যাত মিউজিশিয়ান মোৎজার্টও তাঁর মৃত্যুশয্যায় দাবী করেছিলেন, তাকে একুয়া তোফানা খাওয়ানো হয়েছে ষড়যন্ত্র করে। এরকম দাবী করেছিলেন আরো অনেকেই।

ইতিহাসের কুখ্যাত মহিলা সিরিয়াল কিলারের তালিকা করলে গিউলিয়ার নাম সে তালিকার প্রথম দিকেই আসবে। হয়তো মানুষ মারার ব্যবসাই তিনি করেছেন। কিন্তু অন্যদিক থেকে ভাবলে, কিছু নারীকে তিনি যাবজ্জীবন যন্ত্রণা থেকেও বাঁচিয়েছেন। অল্প কষ্টে কেউ নিজের স্বামীকে হত্যা করতে নিশ্চয়ই চায় না!  সেদিক থেকে ভাবলে, গিউলিয়ার দোষটা খানিকটা লঘু হয়েও যায় বই কী। 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা