অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, এই বয়কটের ডাক লম্বা সময় ধরে চলবে না, এতে ফ্রান্সের অর্থনীতিরও খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। আপনিও কি তাই মনে করেন?

ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মহানবীর কার্টুন প্রদর্শন নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে দেশটি, মুসলিম বিশ্বের বেশ কিছু দেশের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে প্রতিবাদ করা হয়েছে এই কর্মকাণ্ডের। বয়কট ফ্রান্স হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হচ্ছে টুইটার এবং ফেসবুকে, ফরাসী কোম্পানীগুলোর পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকার আহবান জানানো হচ্ছে মুসলিম কমিউনিটির একাংশের পক্ষ থেকে। বেশ কয়েকটা দেশে কিছু সুপারশপ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে ফরাসী পণ্য। কেউ আবার বলছেন এসব বয়কট অভিযানে খুব একটা লাভ হবে না। তবে এই বয়কটের ডাক যে ফ্রান্সকে খানিকটা হলেও ধাক্কা দিয়েছে, সেটার প্রমাণ দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বয়ান। 

কার্টুন প্রত্যাহার করে ম্যাক্রো তার মুসলমানদের নিয়ে করা বক্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাইলে ফরাসী পণ্য বর্জনের ডাকটাকে ম্যাক্রো অবৈধ হিসেবেই দাবী করছেন। ম্যাক্রো জানিয়েছেন, ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ফ্রান্স তার 'ধর্মনিরপেক্ষ' অবস্থান থেকে সরে আসবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে- "বয়কটের এই ডাক ভিত্তিহীন এবং অবিলম্বে বাতিল করা উচিত। সেই সাথে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে উগ্র সংখ্যালঘুদের পরিচালিত সব হামলাও বন্ধ করা উচিত।" অর্থাৎ যারা ফরাসী পণ্য বয়কটের আন্দোলন করছে, তাদের উগ্রবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করছে দেশটি। 

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিকেরাই এই মিছিলে নাম লিখিয়েছেন। জর্ডান, কাতার ও কুয়েতের অনেক দোকানের তাক থেকে সরিয়ে নেয়া হয় ফরাসি পণ্য। ফ্রান্সে তৈরি হওয়া চুল এবং সৌন্দর্য পণ্য ডিসপ্লে-তে রাখা হয়নি। কুয়েতে প্রধান একটি রিটেইল ইউনিয়ন ফরাসি পণ্য বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির বেসরকারী ইউনিয়ন অব কনজ্যুমার কো-অপারেটিভ সোসাইটি বলেছে- ইসলামের নবীকে 'বার বার অসম্মান' করার কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দোকান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে ফরাসী পণ্য

এর বাইরে বিভিন্ন আরব দেশ যেমন সৌদি আরবে অনলাইনে এ ধরণের বয়কটের আহ্বান জানানো হচ্ছে। আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ সৌদি আরবে ফরাসি সুপারমার্কেট চেইন শপ 'ক্যাফৌউ' বয়কট করা নিয়ে হ্যাশট্যাগ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ট্রেন্ডিং ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে ইতিমধ্যেই। তবে এখানে বয়কটের ডাকটা অনলাইনেই সীমাবদ্ধ আছে এখনও। এদিকে, লিবিয়া, গাজা এবং উত্তর সিরিয়ার তুরস্ক সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ছোট ছোট বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রনায়কদের তরফ থেকেও প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে, কয়েকটা তো বিতর্কও উস্কে দিয়েছে। এই তালিকায় সবার আগে আছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সরাসরিই ম্যাক্রোকে 'পাগল' হিসেবে অভিহিত করে এরদোয়ান বলেছেন- "ইসলাম এবং মুসলিমদের নিয়ে ম্যাক্রোর মতো ব্যক্তিদের কী সমস্যা?" পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তার বক্তব্য হচ্ছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট কিছু না বুঝেই তার 'ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী' বক্তব্যের মাধ্যমে পুরো বিশ্বের মুসলমানদের অপমান করেছেন। 

পাকিস্তানে পোড়ানো হচ্ছে ফ্রান্সের পতাকা

এরদোয়ানের বক্তব্য নিয়ে ইতিমাধ্যেই তীব্র আলোচনা এবং সমালোচনাও শুরু হয়ে গেছে। এরদোয়ান তার বক্তব্যে ম্যাক্রোকে মানসিক রোগের ডাক্তার দেখাতে বলেছেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার দরকার আছে বলেও দাবী করেছিলেন এরদোয়ান। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য কূটনৈতিক শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে অভিমত দিয়েছেন অনেকেই। ফ্রান্স তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে, ফ্রান্সে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূতকেও তলব করা হয়েছে। তার কাছে এরদোয়ানের বক্তব্যের কৈফিয়ত চাওয়া হবে। ফ্রান্স এবং তুরস্ক দুটোই ন্যাটোর জোটভুক্ত দেশ হলেও, ভূ-রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই টানাপোড়ন ছিল।

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোর বক্তব্য এবং কার্টুন নিয়ে তার অবস্থানের সমালোচনা করেছে ইরানও। ইরানের বিদেশমন্ত্রী জারিফ বলেছেন, মহানবী হযরত মোহাম্মদ(সাঃ)-এর কার্টুনকে সমর্থন করে ম্যাক্রো চরমপন্থীদের উৎসাহিত করছেন। জারিফের দাবী, কয়েকজন চরমপন্থী একটা অন্যায় কাজ করেছে, তার জন্য বিশ্বের ১৯০ কোটি মুসলিমকে অপমান করা হচ্ছে, তাদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত হানা হচ্ছে। এর ফলে চরমপন্থীরাই উৎসাহিত হবে, এই ঘৃণার চর্চা থামানোর উপযুক্ত সময় এখনই। 

মুসলিম বিশ্বের চোখে ম্যাক্রো এখন খলনায়ক

ম্যাক্রোর বক্তব্যের নিন্দা জানালেও, ফরাসী পণ্য বয়কটের ডাক দেয়া হয়নি শিয়া অধ্যুষিত এই দেশটিতে। ইরানের ধর্মীয় নেতারাও এই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত জানাননি। তবে ইরানের পার্লামেন্টে আলোচনা হয়েছে বিষয়টি নিয়ে। পার্লামেন্টের স্পিকার বলেছেন, মহানবীর সঙ্গে অযথা ও অর্থহীন শত্রুতা করছে ফ্রান্স। ইউরোপের এই দেশটি তার মুসলমান নাগরিকদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান। 

অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, এই বয়কটের ডাক খুব বেশিদিন ধরে চলবে না। আগামী কয়েকদিনে ফরাসী পারফিউম, লেদার প্রোডাক্ট এবং সৌন্দর্য্য উপকরণগুলোর বিক্রি সাময়িকভাবে খানিকটা ধাক্কা খেতে পারে। আবার যারা বয়কটের ডাক দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে অনেকেই ফরাসী পণ্য কেনার ডাকও দিতে পারে। যাই ঘটুক না কেন, সেটার মেয়াদকাল যে দীর্ঘ হবে না- এটা নিশ্চিত। কাজেই বয়কটের এই ধাক্কা ফরাসী অর্থনীতিকে খুব একটা দুর্বল করতে পারবে না। তবে এটা যে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের একটা মাধ্যম, সেটা সবাই একবাক্যে মেনে নিচ্ছেন। কলমের বদলা হিসেবে হাতে ছুরি তুলে নেয়ার চাইতে কারো কর্মকাণ্ড পছন্দ না হলে তাকে বয়কট করাটা অনেক ভালো সমাধান- এতে কোন সন্দেহ নেই। 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা