পাঁচ বছর বয়সে মাথায় আঘাত পান। সবাই ধরে নিয়েছিলো, মস্তিষ্কের ক্ষমতা আস্তে আস্তে লোপ পাবে তাঁর। সেখান থেকে যেভাবে কামব্যাক করলেন, রহস্য ঠিক সেখানেই!

ছেলেটির নাম নীলকান্ত ভানু প্রকাশ। ডাকনাম ভানু। এই ছেলেটিকে ডাকা হয় 'বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম মানব ক্যালকুলেটর' হিসেবে। এমনি এমনি তাকে অবশ্য এ খেতাব দেয়া হয়নি। লন্ডনে অনুষ্ঠিত মেন্টাল ক্যালকুলেটর ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অ্যাট মাইন্ড স্পোর্টস অলিম্পিয়াডে ভারতের হয়ে গোল্ড মেডেল জিতেছেন হায়দ্রাবাদের বিশ বছরের এই তরুণ। শুধু তাই না, লিমকা বুক অফ ওয়াল্ড রেকর্ডসের খাতায়ও আছে ভানুর নাম।

খুব ছোটবেলা থেকেই মাথার মধ্যে অঙ্ক কষার কসরত করতেন তিনি। 'গুড উইল হান্টিং' এর ম্যাথ প্রডিজি 'উইল হান্টিং' এর মতন বিরল প্রতিভা তিনি, এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মাথায় চোট পেয়ে দীর্ঘদিন বিছানায়ও থাকতে হয়েছিলো তাকে। সেই অলস সময়টাতেই তিনি ভাবলেন, কিছু একটা করা যাক। মাথাটাকে একটু কাজে লাগানো যাক। তখন থেকেই তিনি মাথার ভেতরে বড় বড় অংক কষার অভ্যেস করে যাচ্ছেন। একইসাথে একাধিক কাজ কিভাবে করা যায়,  খুব দ্রুত কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, সেগুলো নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। ভানুর বাবা-মা বলেছিলো, ভানুর মাথার চোট হয়তো মস্তিষ্কের ক্ষমতাকেই কমিয়ে দেবে। সেই ভয় থেকেই ভানু সবসময়ে মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতো। তখনই সে দ্রুতগতিতে অঙ্ক শেখার অভ্যেস রপ্ত করে নেয়।

স্কুলে থাকাকালীনও প্রত্যেকদিন পড়াশোনা, স্কুল, ক্লাসের পর ছয় সাত ঘন্টা অঙ্ক নিয়ে প্রাকটিস করতেন। চিন্তা করতেন। যে প্রতিযোগিতায় ভানু 'গোল্ড মেডেল' পেয়েছেন, সে প্রতিযোগিতায় আসার আগেও অনেকদিন ধরে নিয়মিতভাবে প্রাকটিস করেছেন তিনি। তবে এই প্রাকটিস তো আসলে ঘাম ঝড়িয়ে প্রাকটিস না, অনেকটাই মাইন্ড গেম। দিনশেষে গিয়ে বাজিমাত করেছেন তাই একজনই; ভানু।

সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের উপন্যাস 'নয়ন রহস্য' আমরা অনেকেই পড়েছি। সেখানে নয়ন নামের একটি ছেলে ছিলো, সে সংখ্যা দেখতে পেতো। ভানুও যেন অনেকটা সেরকমই। তার চোখের সামনে নাকি সবসময়েই সংখ্যা ভাসে। ধরা যাক, সে রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে কারো সাথে আড্ডা দিচ্ছে। সেই আড্ডা মারতে মারতেও সে রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া প্রত্যেকটা ট্যাক্সি বা গাড়ির লাইসেন্স প্লেট মনে রাখতে পারবে। কয়টা গাড়ি বা কয়টি ট্যাক্সি গেলো, সেগুলোও মনে রাখতে পারবে। অথচ সে কিন্তু আড্ডাও মারছে সেইসাথে। এরকমই অদ্ভুত তার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা।

চোখের সামনে সারাক্ষণই সংখ্যা দেখেন ভানু! 

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের অঙ্ক নিয়ে পাগলামি মানায় না। তারা স্বাভাবিক পড়াশোনা করে চাকরীর পেছনে ছুটবে, একটি চাকরী বাগিয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপদ করবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু ভানুর যাপিত পাগলামি অঙ্ক নিয়েই। পরিবারও মেনে নিয়েছে এই পাগলামি। ভানু তাই নিজের মত করেই এগোচ্ছে অঙ্ক নিয়ে। স্নাতকও শেষের দিকে তাঁর। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট স্টিফেন কলেজে গণিতে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষের পথেই নীলকণ্ঠের।

অনেকেই ভাবেন, মাথায় বড় বড় অঙ্ক করার কী দরকার, ক্যালকুলেটরে করলেই তো হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভানুর উত্তরটাও বেশ সুন্দর-

উসাইন বোল্টের এত জোড়ে দৌড়ানোর কী দরকার ছিলো? রাস্তায় তো গাড়ি, ট্রেন, বাস আছেই। তাও সে দৌড়ায়, কারণ এটা দক্ষতা। আমি যেটা করি, সেটাও আমার দক্ষতা।

এরকমই সোজাসাপটা উত্তর ভানুর।

অঙ্ক নিয়ে ভানুর চারটি বিশ্বরেকর্ড আছে। এছাড়াও পুরস্কার তো আছে অগুনতিই। ভানুর জীবনের একটাই লক্ষ্য, মানুষের মধ্যে যে গনিত-ভীতি, সেটিকে দূর করা। এজন্যে ভিশন ম্যাথ ল্যাব তৈরির কথাও ভাবছেন তিনি, যার ফলে লাখো শিক্ষার্থী উপকৃত হবে।  অঙ্ক নিয়ে মানুষের ভয়ডরও কমবে। ভানু চান, প্রত্যেকে যেন গনিতকে ভালোবাসে। এ জন্যেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন তার মত করে। তিনি এ লক্ষ্যেই কাজ করে যেতে চান আমৃত্যু।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা