নিয়তির লিখনের কাছে হেরে ফাহিম মারা গেছেন তিনদিন আগে। ক্লাস এইটে পড়ার সময় বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়া ছেলেটা তার সর্বস্ব বাজী রেখে লড়েছে পুরোটা জীবন ধরে, হুইলচেয়ারে ভর দিয়েই যে কিনা নিজেকে পরিণত করেছিল বাংলাদেশের প্রথম সারির ফ্রিল্যান্সার হিসেবে...

আইএমডিবি'র এক নাম্বার সিনেমা 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' দেখেননি, এমন মানুষ গোটা দুনিয়াতে খুব কমই আছে। এই সিনেমার অনেকগুলো প্রিয় লাইনের মধ্যে একটা লাইন খুব বেশি প্রিয়- 

Remember, Red, hope is a good thing, maybe the best of things, and no good thing ever dies.

আমাদের যাপিত সব কর্মকাণ্ড মূলত এই একটি শব্দকে ঘিরেই। হোপ। আশা৷ একেকটা দিন যতই আমাদের মুঠোর বাইরে থাকুক, তাও ভাবি, হয়তো একদিন... কিছু একটা হবে। এই 'কিছু একটা'র স্বপ্ন দেখা, এটাই তো আশা। যেরকম আশা দেখেছিলো মাগুড়ার ফাহিমুল করিম। যে আশা বাস্তবায়নও করেছিলো সে।

ফাহিম খুব অল্পবয়স থেকেই একটা রোগে আক্রান্ত। রোগটির নাম- ডুচেনেমাসকিউলার ডিসথ্রফি। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে খুব অল্পবয়সেই শরীরের পেশিগুলো শুকিয়ে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলো ফাহিমের। এর আগে অবশ্য ভালোই যাচ্ছিলো। শীতের বিকেলে ক্রিকেট, বর্ষার দুপুরে ফুটবল খেলা চলছিলো। পড়াশোনা এগোচ্ছিলো৷ অষ্টম শ্রেনির বার্ষিক পরীক্ষা দেয়ার আগে আগেই পাওয়া গেলো দেহের মধ্যে এ রোগের স্থায়ীভাবে গেড়ে বসার ইংগিত। আস্তে আস্তে শয্যাশায়ী হলো ফাহিম। পড়াশোনাও সে সাথে হয়ে গেলো বন্ধ।

এরপর চাইলে হয়তো ফাহিম 'পরনির্ভরশীল' হয়ে লতায়-পাতায় অন্যের সাথে জড়িয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতো। হয়তো সেটাই স্বাভাবিক হতো। কিন্তু হয়নি। ফাহিম চাইলো, এভাবে হয়তো শ্বাসপ্রশ্বাস টিকে যাবে। কিন্তু, বেঁচে থাকা যাবে না৷ ফাহিম তাই স্বাবলম্বী হতে চাইলো। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইলো।  কিন্তু কী করে সেটা সম্ভব, তা ভেবে পাচ্ছিলো না সে। এরমধ্যেই একদিন ফেসবুকের একটা গ্রুপ থেকে ফাহিমুল প্রথমে খবর পায় অনলাইনে আয় করার ব্যাপারে৷ সেটা নিয়ে পরবর্তীতে সে আরেকটু পড়াশোনা করলেন। গ্রুপ মেম্বারদের সাথে কথা বলে, সে সাথে অল্পবিস্তর পড়াশোনা করে গ্রাফিক্স ডিজাইন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিয়ে নিলো সে। এটার মাধ্যমেই অনলাইনে কাজ করার ইচ্ছে তার। তাই কাজটি শিখে নেয়া। 

পরবর্তীতে নিজের জমানো কিছু টাকা, মায়ের কিছু টাকা, ব্যাঙ্কের ঋণ আর স্থানীয় কিছু মানুষের সহায়তায় ফাহিম একটা ল্যাপটপ কিনে নেয়৷ ল্যাপটপ পাওয়ার পর সে ফটোশপ শিখে বিজনেস কার্ড ও ব্যানার বানানোর কাজটাও শিখে নেয়। এরপর ফ্রিল্যান্সিং সাইট 'ফাইভার' এর খবর পায় ফাহিম। ফাইভারে গিগ খোলার অল্পসময়ের মধ্যেই কাজের অফার পায় সে। সেই কাজ খুব দ্রুতসময়ে শেষ করে বায়ারের কাছ থেকে সর্বপ্রথম উপার্জন করে ১৫ ডলার। এরপর থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। ফাহিম আস্তে আস্তে হয়ে ওঠে ফাইভারের লেভেল ওয়ান সেলার। প্রচুর কাজ আসতো। সেগুলো করতে করতে নাওয়াখাওয়ার দিকে সময় থাকতো না৷ এ সময়টিতে বাসার সবাই প্রচুর সাপোর্ট দিতো ছেলেকে। এভাবে কাজ করতে করতে ফাইভারের লেভেল টু সেলারও হয়ে যায় ফাহিম। এরপর কাজ করা শুরু করে আরেক ফ্রিল্যান্সিং সাইট 'আপওয়ার্ক' এ। মাঝখান দিয়ে বাবার চাকরী চলে যায় হুট করে। ফাহিম তখন হয়ে যান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফাহিম কাজ করেও যাচ্ছিলো পাগলের মতন। প্রায় পাঁচশোরও বেশি প্রজেক্টে কাজ করেছিলো সে, তাও মাত্র দুই বছরের মধ্যে! আপওয়ার্কে ফাহিমের রেট প্রত্যেক ঘন্টায় হয়েছিলো ৬৭০ টাকা!

ফাহিম নিজের শ্রমেই হয়েছিলেন স্বাবলম্বী!  

ফাহিমের অবশ্য ফ্রিল্যান্সিং এ সারাজীবন থাকার ইচ্ছে ছিলো না। সে টাকাপয়দা জমিয়ে ব্যবসা করবে কোনোকিছুর, এটাই ইচ্ছে তার। তাছাড়া চিকিৎসার জন্যে বিদেশেও যাবার ইচ্ছে তার। পরিবারের জন্যেও করে যাবেন অনেককিছু, সেগুলোর জন্যেই মরিয়া হয়ে কাজ করছিলো সে। জাতীয় দৈনিক 'প্রথম আলো' ফিচারও করেছিলো মাগুড়ার এই লড়াকু ছেলেটিকে নিয়ে। 'স্টিফেন হকিং' কে অনুপ্রেরণা মেনেই এগিয়ে যাচ্ছিলো ছেলেটি। এই তো গত মাসেই 'বেসিস আউটসোর্সিং এ্যাওয়ার্ড ২০২০' পেয়েছিলো ফাহিম। তাছাড়া বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের জন্যেও কাজ করে যাচ্ছিলো সে।

ফাহিম মারা গিয়েছে গত দুইদিন আগে। সব লড়াই, আশা, হতাশা, অক্ষমতা, সক্ষমতা... সব শব্দকে ছাপিয়ে একটা শব্দই ফুটে উঠেছে সর্বগ্রাসী হয়ে। মৃত্যু। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফাহিম জারি রেখেছিলো তার লড়াই৷ পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে না, ফাহিম হয়তো চলে গিয়েছে ঠোঁটের কোনে তৃপ্তির এক হাসি নিয়ে। হয়তো এটাই চেয়েছিলো ফাহিম। হয়তো এটাই জীবনের সাফল্য। নিজে স্বাবলম্বী হয়ে, বাকিদের জন্যে অনুপ্রেরণা হয়ে, পরিবারের বোঝা না হয়ে যে জীবন কাটালো সে, ফাহিমকে নিয়ে কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই।

ওপারে ফাহিম ভালো থাকুক শান্তিতে, এটাই প্রার্থনা।

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ প্রথম আলো

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা