তৃতীয় আরব দেশ হিসেবে ইজরাইলের সঙ্গে সব রকমের সম্পর্ক স্থাপন করছে আরব আমিরাত, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বইছে দমকা হাওয়া। কিন্ত এই বন্ধুত্বের কারণ কি? ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই বা এত আগ্রহ কেন দুই দেশকে মিলিয়ে দেয়ায়? কাকে ঠেকানোর জন্য এত আয়োজন?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে যে বড় রকমের একটা দমকা হাওয়া বইছে, সেটা অনেকেই আন্দাজ করতে পারছেন না, বা পারলেও খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না হয়তো। তৃতীয় আরব রাষ্ট্র হিসেবে ইজরাইলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এখন থেকে আরব আমিরাতের সঙ্গে ইজরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু হবে, এবং সব রকমের বিনিময়প্রথাও শুরু হবে দুই দেশের মধ্যে। 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দুই দেশের মধ্যে ঘটকালি করে সম্পর্কটা গড়ে দিয়েছেন, তিনি নিজে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উপস্থিত ছিলেন ঘোষণা দেয়ার সময়। ট্রাম্প, ইসরায়েলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আবুধাবীর ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ আল নাহিয়ান এক যুক্ত বিবৃতিতে জানিয়েছেন- "এই ঐতিহাসিক অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির অগ্রযাত্রায় সাহায্য করবে।" 

এই ঘটনাটা যে মধ্যপ্রাচ্যের, তথা মুসলিম বিশ্বের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের জীবনী পড়লেই বোঝা যাবে। নিজের দেশে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন সাদাত, কিন্ত একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। আরব-ইজরাইল যুদ্ধের অতীতকে পেছনে ফেলে ইজরাইলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে চেয়েছিলেন। গোটা আরব বিশ্ব ক্ষেপে উঠেছিল তার ওপর, নিজের দেশ মিশরেও তার বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। পরে তো এক সেনা অভ্যুত্থানে প্রাণ দিয়েই নিজের সিদ্ধান্তের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে সাদাতকে। 

সাদাতের মিশরের পর মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শুধু জর্ডানই ইজরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, তবে সেখানে অনেক যদি-কিন্ত-তবে ছিল। মোদ্দাকথায়, ১৯৯৪ সালে শান্তিচুক্তির নামে স্থাপিত জর্ডান-ইজরাইলের সেই সম্পর্কটা ছিল সীমিত আকারে বন্ধুত্ব স্থাপনের মতোই। তবে আমিরাত যেটা করতে যাচ্ছে, সেটা এখন পর্যন্ত আর কোন মুসলিম দেশ করেনি। সামনের দিনগুলোতে ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরা বিনিয়োগ, পর্যটন, সরাসরি ফ্লাইট, নিরাপত্তা, টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি সহ নানা বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার জন্য বৈঠকে বসবেন। এতটা আন্তরিকতা তো আমিরাতের সঙ্গে অনেক মুসলিম দেশেরও নেই! 

কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে যাচ্ছে আমিরাত-ইজরাইলের মধ্যে

প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎ করে কেন ইজরাইল আরব আমিরাতের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে এত উঠেপড়ে লাগলো? আমেরিকাই বা এখানে তৃতীয় পক্ষ হয়ে দুই দেশের হাত মিলিয়ে দিচ্ছে কেন? তাদের স্বার্থটা কি? সত্যি করে বলতে গেলে, ইজরাইলের সঙ্গে আমিরাতের এই বন্ধুত্বে সবচেয়ে বেশি লাভবান যদি কেউ হয়, সেটা হবে আমেরিকাই। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমেরিকার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সেখানে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতেই ইজরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্ধুত্ব পাতিয়ে দেয়ার কাজটা উপযাচক হয়ে করছে তারা। নইলে এই অঞ্চলটা যে আমেরিকার হাতছাড়া হয়ে যাবে একরকম! 

শুধু আমেরিকাই নয়, ইরানকে ঠেকানোর জন্য খোদ সৌদি আরবও ইজরাইলের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক রেখেছে, কাগজে কলমে এই সম্পর্কের অস্তিত্ব নেই, তবে ব্যাপারটা ওপেন সিক্রেট; সবাই জানে সবকিছু, শুধু উচ্চারণ করে না। কিছুদিন আগেই ইসরায়েলের চিফ অফ স্টাফ জেনারেল গাদি আইজেনকট এক সাক্ষাৎকারে মুখ ফস্কে বলে ফেলেছেন, ইরানকে মোকাবেলায় তার দেশ সৌদি আরবের সাথে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্যেও প্রস্তুত রয়েছে। ইজরাইলের সামরিক বাহিনীর এক শীর্ষ কর্তা এবছরের শুরুর দিকে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, সেই বৈঠকে সালমান নাকি তাকে বলেছেন- "আপনারা তো আর আমাদের শত্রু নন।"

বিবিসির কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা জনাথন মার্কাস তার কলামে লিখেছেন, তলে তলে এই দুটো দেশের মধ্যে কি হচ্ছে প্রায়ই তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এধরনের বার্তা তো আর দুর্ঘটনাবশত দেওয়া হয় না। এসব বার্তা দেওয়া হয় খুবই সতর্কভাবে। এসবের লক্ষ্য থাকে ইরানকে সতর্ক করা। এবং ইসরায়েলের সাথে গড়ে উঠা সম্পর্কের ব্যাপারে সৌদি আরবের লোকজনকে অবহিত করা। একা সৌদি আরব ইরানকে আটকাতে পারছিল না, তাই শিয়াপ্রধান দেশটিকে আরেকটু কোণঠাসা করার তাগিদেই এখন আরব আমিরাতকেও নিজেদের ডেরায় ভিড়িয়েছে আমেরিকা-ইজরাইল জোট। 

ইজরাইল ও আমিরাতকে মিলিয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

নিউইয়র্ক টাইমসের বিখ্যাত কলামিস্ট টমাস এল ফ্রিডম্যান অনেকদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুসরণ করছেন, এই ব্যাপারে তার মতো বিশেষজ্ঞ গোটা দুনিয়ায় খুব বেশি নেই। আমিরাত-ইজরাইলের বন্ধুত্বের এই ঘটনাটাকে ফ্রিডম্যান উল্লেখ করেছেন 'দানবীয় এক ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্প' হিসেবে। তিনি এটিকে বলছেন আনোয়ার সাদাতের জেরুসালেমে যাওয়া বা হোয়াইট হাউসের লনে ইতজাক রাবিনের সঙ্গে ইয়াসির আরাফাতের করমর্দনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে! 

এই ঘটনাকে আমেরিকা-ইজরাইল-আমিরাত কতটা গুরুত্ব দিয়েছে, সেটা ঘোষণার আকস্মিকতা দেখলেও বোঝা যায়। গোটা বিশ্ব এখনও করোনা পরিস্থিতি নিজে জেরবার, এরইমধ্যে আচমকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন ব্যাপারটা। সবার কাছেই এটা বিস্ময় হয়ে এসেছে, কারণ পুরো আলোচনাটি চলছিল বেশ গোপনে। এতটাই গোপনে যে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত নাকি এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। ফিলিস্তিনিরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপকে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে দেখছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের মতে, আরব আমিরাত বন্ধুত্বের নামে ফিলিস্তিন এবং মুসলিম বিশ্বের পিঠে ছুরি মেরেছে! 

আরব আমিরাত কেন হঠাৎ ইজরাইলের বন্ধু হবার প্রস্তাবে রাজী হলো? এই প্রশ্নের নানামুখী উত্তর আছে। প্রথমত, আরব আমিরাত বরাবরই উদারপন্থার চর্চা করেছে, বাকী আরব দেশগুলোর মতো কট্টর বা রক্ষণশীল শাসনব্যবস্থা অথবা পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটেনি। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার সম্ভবত ইজরাইলের বড় বড় বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনাটা। সেকারণেই আরব বিশ্বের প্রতিনিধি হয়েও তারা ইজরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তবে আইওয়াশ হিসেবে তারা বলছে, এই বন্ধুত্বের বিনিময়ে নাকি ইজরাইল পশ্চিম তীরে নতুন বসতি নির্মাণ বন্ধ রাখবে। এদিকে ইজরাইল বলেছে, বসতি নির্মাণ আপাতত স্থগিত আছে, বন্ধ নয়। 

আরব আমিরাত আমাদের পিঠে ছুরি মেরেছে- বলছে ফিলিস্তিন

গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে ইজরাইল হচ্ছে একরকম বিষফোঁড়ার নাম। যুগের পর যুগ ধরে তারা ফিলিস্তিনের মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদের পরাধীন করে রেখেছে, মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। কোন আরব দেশের সঙ্গেই ইজরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কাজেই আরব আমিরাতের সঙ্গে ইজরাইলের এই সম্পর্কস্থাপন প্রক্রিয়াটা বিস্ময় হয়ে এসেছে মুসলিম বিশ্বের কাছে। কিন্ত কূটনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে যে কিছু নেই, শত্রুর শত্রু বন্ধু- ইরানকে ঠেকানোর জন্য এই নীতিতে হেঁটে যেন সেটাই প্রমাণ করে দিলো সংযুক্ত আরব আমিরাত! 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা