এই গ্রামে নারী পুরুষ একসাথে নদীতে গোসল করে। মেয়েরা বুকে খালি একটা কাপড় পেঁচিয়ে গোসল করে। অথচ এখানে আজ পর্যন্ত কোনো নারী বা শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি...

একটা বিধর্মী, নাপাক, হারাম খাবার খাওয়া, জংলী, অসভ্য সমাজের কয়েকটা ঘটনা তুলে ধরলাম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে:

১. আমার গ্রামে নারী পুরুষ একসাথে নদীতে গোসল করে। মেয়েরা বুকে খালি একটা কাপড় পেঁচিয়ে গোসল করে। এই গ্রামে আজ পর্যন্ত কোনো নারী বা শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে নি।

২. গ্রামে অলংকারী নামে এক মানুষ আছেন। তাকে দিদি বলেই ডাকতাম। পরে একদিন মায়ের কাছ থেকে জানতে পারি উনি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। মা আমাকে স্ট্রিক্টলি মানা করে দিয়েছেন যাতে এই ব্যাপার নিয়ে আমি তাকে জীবনেও টিজ না করি। না, ওনাকে পরিবার বা সমাজ থেকে বিতাড়িত হতে হয়নি। কিংবা রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে কারো কাছে টাকা চাইতে হয়নি। পাহাড়ের শূকর, সাপ, ব্যঙ খাওয়া জংলী সমাজ তাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। দিব্যি মর্যাদা নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন।

৩. আমার সদরের পাশের বাসায় একজন সিঙ্গেল মাদার থাকতেন। তার তখনো বিয়ে হয়নি। তার ব্যক্তিগত ডিসিশন থেকে এবোরশন করাননি। আট দশটা বাচ্চার মতোই আমাদের সাথে বেড়ে ওঠে তার মেয়ে। তার রাঙ্গামাটি শহরে বাসা ভাড়া পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। এলাকার সবার সাথেই তার ভালো সম্পর্ক ছিল। ওখানে তার কখনো খোঁটা শুনতে হয়নি। পরে তিনি একজনকে বিয়ে করেন। সেই বিয়েতে আমি সপরিবারে গিয়েছিলাম।

৪. আমার অনেক খালা, মামা বিয়ে না করে আছেন। কারণ সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। ফ্যামিলি বা সমাজের কোনো প্রেশার ছাড়াই দিব্যি আছেন তারা।

না, আমি বলছি না অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটে না। কারণ তথাকথিত সভ্য সমাজ থেকে তো পুরোপুরি আলাদা হওয়া সম্ভব নয়। তবে আমার গর্ব হয় যে আমি এই অসভ্য সমাজের অংশ।

অসীম চাকমা

লেখকের সংযুক্তি তো অনেকেই বলছেন আমি "হারাম" শব্দটা ব্যবহার করে একটা ধর্মকে ইন্ডিকেট করে অপমান করছি। Actually it's the other way around. আমি যে টারমিনোলজিগুলো ব্যবহার করেছি যেসব দিয়ে আমাদেরকে বিবেচনা করা হয়। ছোটবেলা থেকে ওই শব্দ গুলো গালি হিসেবে শুনতে হয় নাই এমন ট্রাইবাল মানুষ আপনি পাবেন না। হ্যাঁ, স্ট্যাটাসটা ইউটোপিয়ানই মনে হবে।

আমি বলছি না এখানে কোনো অপরাধী নেই, জাজমেন্টাল পিপল নেই। অবশ্যই আছে। মেইনস্ট্রিম প্রভাব থেকে তো পালানো সম্ভব নয়। সারা বিশ্বের সামাজিক অবক্ষয় থেকে তো এই সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়। তবে একজন রেইপ ভিক্টিমকে কখনোই তার পোশাক দ্বারা এখানে জাজ করা হয় না, তার মুখ লুকাতে হয় না, একজন মা ওপেনলি তার শিশুকে ব্রেস্টফিড করতে পারে, স্বামী মারা গেলে মেয়েরা দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে, এজন্য তার কোথাও কটাক্ষ হতে হয় না। হ্যাঁ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।

তা বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে যাওয়া আর প্রধান অভিভাবক হিসেবে পিতা/স্বামীর নাম আগে লেখা পর্যন্তই। মেয়েরা এখানে যথেষ্ট স্বাধীন। গ্রামে নারী পুরুষ একই সাথে সমান ভাবে কাজ করে, জুম চাষ করে। এমন কোনো কাজ নাই যা শুধু পুরুষ করতে পারে, আর নারী করতে পারে না। একটা সমাজ কিরকম উন্নত তার মানদন্ড বিচার করতে হয় সেই সমাজে নারীদের অধিকার কেমন তা বিবেচনা করে।

প্রকৃতপক্ষে হিলট্র‍্যাক্টস বাংলাদেশের সবচেয়ে ডিস্টোপিয়ান জায়গা। এতো বঞ্চনার মধ্যে মানুষগুলোর বাঁচা দায়৷ কি হবে আমাদের এই ইউটোপিয়ান মাইন্ডসেট দিয়ে? নিজের দেশে, নিজের সমাজে পরাধীনের মতো থাকতে হয়। এখানের বাস্তব অবস্থা জানতে হলে আপনাকে স্বচক্ষে এসে দেখতে হবে। খালি দেখলে হবে না, উপলব্ধি করতে হবে। এখানকার ইতিহাস ও পলিটিক্যাল ক্রাইসিস আপনাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। তবে ইতিহাস তো বায়াসড।

ট্রাইবাল পলিটিক্স, সেটেলারদের মাইন্ডসেট, সরকারের আচরণ, কেন মেজরিটির প্রতি হেট্রেড জন্মালো এগুলো বোঝার জন্য আপনার কারেক্ট পলিটিক্যাল নলেজ থাকা খুবই জরুরি। কারণ আমরা যে জিনিস বুঝি না সে জিনিস প্রত্যাখ্যান করার স্বাভাবিক একটা প্রবণতা আমাদের সকলের আছে। তাই আনবায়াসড মাইন্ডসেট নিয়ে আপনাকে জানতে হবে। নাহলে আপনি সমাজের চিত্র, এই পৃথিবীর চিত্র বুঝতে পারবেন না।

লেখক: অসীম চাকমা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা