৭০ লাখ টাকা! মানুষটা তার সারা জীবনের সঞ্চয়ের এই অর্থ ব্যয় করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে। শুধু তাই নয়, সাভারে একটি প্লট ছিল, সেটিও বিক্রি করে পুরো টাকাই দিয়ে দিয়েছেন তাঁর স্বপ্নের ইমারত নির্মাণে...

মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন মোহাম্মদ শফি। বর্তমানে যারা এই বিভাগটির শিক্ষক, তারা প্রায় সকলেই অধ্যাপক শফির সরাসরি ছাত্র। কিন্তু, শিক্ষকদের বসার জায়গা নেই। খালি জায়গার অভাব। অধ্যাপক শফির জীবন ইতিহাস দীর্ঘ। সেই ইতিহাসের গল্পে আপনি চমকাবেন নিশ্চিত। গল্পে ফিরব একটু পরে। তার আগে বলি, সারাজীবন ত্যাগ করে যাওয়া, নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেয়া সাদামাটা জীবনের অধিকারী এই শিক্ষক শেষ বেলায় এসেও অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

বিভাগে তার নামে বরাদ্দ ছিল একটা কক্ষ। এখানে তিনিই বসতেন। কিন্তু, বয়স হয়েছে। এখন আর নিয়মিত বিভাগে আসতে পারেন না। ২০০৫ সালে অবসর নিয়েছেন। তবুও, এখন তিনি অনারারি শিক্ষক। কিন্তু যখনই আসেন খেয়াল করেন, তার প্রিয় বিভাগটির বর্তমান শিক্ষকরা বসার জায়গা পাচ্ছেন না। অধ্যাপক শফির খারাপ লাগে। তিনি তাই, নিজের কক্ষটা ছেড়ে দেন। যা কিছু ছিল তার, সবই এভাবে বিলিয়ে গেছেন সারাজীবন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগটিরই যাত্রা শুরু হয়েছিল অধ্যাপক শফির হাত ধরে। ১৯৯৮ সালের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নামে কোনো বিভাগ ছিল না। তিনি উদ্যোগ নেন। কিন্তু, বিভাগ হলেও বিভাগটির নিজস্ব কোনো ভবন নেই, ক্লাসরুম নেই। ক্লাস নিতে হয় অন্য বিভাগের ক্লাসে বসে। দুইবছর বাদে বিভাগের নামে বরাদ্দ আসে ৫০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা হয়েছিল, মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের জন্য একতলা ভবন হবে। কিন্তু দূরদর্শী মানুষ অধ্যাপক শফি ভাবলেন শিক্ষার্থীদের কথা, ভবিষ্যতের কথা।

তিনি ইঞ্জিনিয়ারদের বললেন, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী বাড়বে। তখন জায়গা কোথায় মিলবে। এই ভবনটির জন্য একতলার ফাউন্ডেশন না দিয়ে পাঁচ তলার ফাউন্ডেশন যেন দেয়া হয়। অধ্যাপক শফির কথামতো, সেইসময় পাঁচতলার ফাউন্ডেশন দেয়া হয়েছিল। আর ভবন করা হয়েছিল একতলার। পরে ফান্ড পাওয়া গেলে, বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ বাজেট দিলে ভবনটাকে পাঁচ তলা করা হবে। কিন্তু, সময় কেটে গেল, শিক্ষার্থীও বাড়লো, ভবন আটকে রইলো সেই একতলাতেই। পনেরো বছর ধরে ভবনের কাজ আর একটুও আগায়নি।

অধ্যাপক শফি, বিভাগটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি যখন দেখলেন, জায়গার অভাবে ছাত্রছাত্রীদের কষ্ট হচ্ছে, তারা গবেষণার কাজ করতে পারছে না, শিক্ষকরাও বসার জায়গা পাচ্ছে না, তার খুব খারাপ লাগলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কতৃপক্ষের বাজেটের আশায় আর বসে থাকলে কষ্ট কোথায় গিয়ে ঠেকে বলা মুশকিল। তাই তিনি নিজেই আবার উদ্যোগী হলেন। নিজের জমানো টাকা থেকে ৪০ লাখ টাকা দিলেন।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস তখন। বেতনের টাকা থেকে জমানো আর অন্যান্য সঞ্চয়ের অংশ থেকে ৪০ লাখ টাকা তুলে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে। সেই টাকায় ভবনের দুই তলা, তিন তলার কাজ ধরা হলো। এই টাকা দেবার সময় উপাচার্য বরাবর লিখেছিলেন,

"আমার জীবনের কর্মস্থল মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগকে আমি খুবই ভালোবাসি বিধায় আমার কর্মজীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে ৪০ লাখ টাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের নিজস্ব ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অনুদান হিসেবে প্রদান করলাম। আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে বিধায় আমি যদি আমার জীবদ্দশায় সম্পূর্ণভাবে নির্মিত ভবন দেখে যেতে পারি তাহলে মৃত্যুর পর আমার আত্মা শান্তি পাবে।" 

তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যার। তিনিও বেশ বিস্মিত হয়েছিলেন অধ্যাপক শফির এই মহানুভবতায়। আরেফিন সিদ্দিক স্যার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেই নিজস্ব সঞ্চয় থেকে এত বড় অঙ্কের অনুদান বিরল দৃষ্টান্ত। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অধ্যাপক শফি ৪০ লাখ টাকা দেয়ার পরও কাজ মাঝপথে আটকে যায়। তারচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো, আবারো ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন অধ্যাপক শফি স্যারই! এবার তিনি দান করেন ৩০ লাখ টাকা। সাভারে তার একটা জমির প্লট ছিল। সেই জমি বিক্রি করে পেয়েছিলেন টাকাটা। পুরো টাকাই ২০১৬ সালে ৫ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্টারের হাতে তুলে দেন এই সাদাসিধে মানুষটা। 

নিজের জীবনের সঞ্চয় এভাবে অকাতরে, কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়া, নিঃস্বার্থভাবে কে দেবে? এতবড় আত্মার মানুষ এই যুগে বিরল। অধ্যাপক শফি সেই বিরল মানুষ, আমাদের বাতিঘর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এমন একজন শিক্ষক আছেন, এটা যে কতটা গর্বের বলার মতো নয়। তিনি এই কাজ করেছেন কাদের জন্যে? অবশ্যই তার প্রাণপ্রিয় ছাত্রছাত্রীদের জন্যে, তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তারা যেন একটু আরাম করে ক্লাস করতে পারে, একটু শান্তিমতো গবেষণার কাজ করতে পারে সেজন্যেই।

অথচ, আজকাল শুনি শিক্ষকরা ছাত্রদের সাথে বিরুপ আচরণ করছেন, পছন্দের ছাত্রকে বাড়তি নাম্বার দিয়ে আরেকজনকে টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো শিক্ষক মেতে আছেন লাল নীল দলাদলি নিয়ে। এই অস্থির সময়ে স্বস্তি আসে, যখন দেখি এখনো এমন একজন শিক্ষক আছেন যিনি তার দীর্ঘ জীবনে কখনো রাজনীতিতে ডুবে যাননি। যিনি নিজের সঞ্চয় দিয়ে ছাত্রদের ঠিকানা গড়ে দিয়ে গেছেন। যিনি অবসর নেয়ার পরও ছাত্রদের গবেষণা কাজে সাহায্য করে যাচ্ছেন! এমনকি ছাত্ররা পড়ালেখায় উজ্জীবিত করতে তিনি নিজের অর্থে বৃত্তি চালু করেছেন।

২০১০ সালে "আমেনা লতিফ ট্রাস্ট ফান্ড" গঠন করেন। এই ফান্ড থেকে প্রতিবছর মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের তিনজন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হয়। ২০০১ সালে নিজের জন্মস্থান সান্তাহারের বিপি স্কুলে বাবার নামে চালু করেন "আবদুল লতিফ ছাত্র বৃত্তি কল্যাণ ফান্ড"। একই বছর পাশের কলসা আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউশনে মায়ের নামে চালু হয় "আমেনা খাতুন ছাত্রী বৃত্তি কল্যাণ ফান্ড"। এসবের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীদের সাহায্য করে যাচ্ছেন। একজন শিক্ষক আর কতটা উদার হতে পারেন! 

মহানুভবতার এই শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন তার পিতা আবদুল লতিফের কাছ থেকে। বগুড়ার সান্তাহার এলাকার দরিদ্র মানুষের কষ্ট দেখে বেদনা অনুভব করতেন তিনি। এলাকায় কোনো অনুষ্ঠান হলে মেহমানদের আপ্যায়ন করার মতো সংহতি ছিল না দরিদ্র মানুষগুলোর। একদিন আবদুল লতিফ ১০০টা করে প্লেট, গ্লাস, ডেকচি আর চামচ কিনে বাড়ি ফিরলেন। তিনি বললেন, "প্লেট-ডেকচির অভাবে এলাকায় কেউ তো ভালোভাবে কোনো অনুষ্ঠানও করতে পারে না। এখন সবাই এগুলো ব্যবহার করতে পারবে।"

এই ঘটনা ভীষণভাবে দাগ কেটে যায় আবদুল লতিফের চতুর্থ সন্তান মোহাম্মদ শফির মনে। হয়ত তখনই মানুষটা মনে মনে ঠিক করে ফেলেন, বাবার আদর্শটাকেই লালন করবেন আজীবন। এখন তার বয়স আশি ছুঁই ছুঁই। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। অবশ্য শিক্ষকতার জীবন শুরু হয় তারও একযুগ আগে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের বায়োলজি বিভাগে পড়িয়ে৷ নানান চড়াই উতরাই পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি নিজেও এই বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ১৯৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি বিভাগ খোলার সিদ্দান্ত হয়। বর্তমানে মৎস্যবিজ্ঞান নামক এই বিভাগটির জন্মলগ্ন থেকেই সাথে ছিলেন অধ্যাপক শফি। যা কিছু আজ এখানে, সবটাই নিজের হাতে সাজিয়ে গেছেন তিনি। 

তিনি বলেন, "মানুষের জীবন দুই ধরনের। এক. আদর্শ জীবন। দুই. সুখী জীবন। সুখী জীবনে কেবল বর্তমানকে নিয়েই বেঁচে থাকা। আর আদর্শ জীবনে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের অস্তিত্ব।"

শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ের উত্তরদিকে গেলে চোখে পড়ে আদর্শের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা অধ্যাপক শফির স্বপ্নের লাল ইমারতটি। তিনি যেন স্বপ্নের একটি বীজ বপন করে রাখলেন, যে স্বপ্ন ছুঁয়ে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের দুয়ার খুলে যাবে। শিক্ষার্থীদের মুখর পদচারনায়, তাদের সাফল্যে বেঁচে থাকবেন অধ্যাপক শফি, যুগ থেকে যুগান্তরে। এই ভবন দেখে, শফি স্যারের মহানুভবতার গল্প জেনে সবাই বলাবলি করবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তো এমনও হয়। সবাই গর্ব করবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শফি স্যারের মতো একজন ছিলেন আমাদের বাতিঘর হয়ে, আমাদের বটবৃক্ষ হয়ে, আমাদের স্বপ্নের ফাউন্ডেশন হয়ে...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা