বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিক থেকে ক্লিনটন, বুশ এমনকি ওবামার চেয়েও ওপরে থাকবেন ট্রাম্প। কারন এই তিনজনের যে কারো চেয়ে ট্রাম্পের কলারে নিরীহ মানুষের রক্তের দাগ কমই লেগেছে। ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা নতুন করে কাউকে আক্রমণ করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে...

হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউজের টিকেট নিশ্চিত করলেন, তখন অনেকেই আঁতকে উঠেছিলেন আগামী বছরগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতি কোনদিকে গড়াবে এই ভেবে। মাথাগরম স্বভাবের এই লোক বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হতে যাচ্ছেন, কি করতে কি করে বসবেন, সেটা নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তবে মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের চার বছরের রাজত্ব নিয়ে যেসব শঙ্কা ছিল, সেসবের বেশিরভাগই অমূলক বলে প্রমাণিত হয়েছে। অন্তত গ্লোবাল কনটেক্সটে যদি চিন্তা করেন, ট্রাম্পকে তার আগের তিন পূর্বসূরির তুলনায় যথেষ্ট শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে আখ্যা দিতে বাধ্য হবে যে কেউই। 

নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচন। জরিপ বলছে, ডেমোক্র‍্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা প্রবল। দুটি প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেটের সবগুলোতেই হেরেছেন ট্রাম্প। প্রথম বিতর্কে তার আগ্রাসী ভূমিকা সমালোচনাও কুড়িয়েছিল। চার বছর আগে যে হুজুগ নিয়ে ট্রাম্পকে নির্বাচিত করেছিলেন আমেরিকান ভোটাররা, সেই হুজুগ কেটে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। ট্রাম্প নিজেও কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন, করোনার মহামারি না এলে তিনি সহজেই আরেকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন। শেষ সময়টায় 'বিশ্ব শান্তির পায়রা' প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলনামা থেকে একটু ঘুরে আসি চলুন, একটা মজার জিনিস দেখাব আপনাদের। 

দুটি প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেটেই হেরেছেন ট্রাম্প

ট্রাম্পকে শান্তির পায়রা বললে অনেকেই চোখ কপালে তুলবেন। কিন্ত তার পূর্বসূরিদের দিকে তাকান। বিল ক্লিনটন, জর্জ ডাব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা- এদের প্রত্যেকেই যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আফগানিস্তান এবং ইরাক যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল বুশের হাতে, নিহত হয়েছিল হাজার হাজার নিরীহ মানুষ। দেশ দুটো ধ্বংস হয়ে গেছে মোটামুটি, উঠে দাঁড়াতে কয় বছর লাগবে কেউ জানেনা। লিবিয়া আর সিরিয়াতে আগ্রাসন চালিয়েছিলেন ওবামা, সেখানেও রক্ত ঝরেছে, ঝরে গেছে হাজারো নিরপরাধ প্রাণ। সীমান্তে ইসরায়েলের আগ্রাসনে নিহত হয়েছে শত শত ফিলিস্তিনি, আমেরিকা উল্টো ইসরায়েলের কাঁধে হাত রেখেছে এই সময়ে।

সবাই ভেবেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে আমেরিকার এই আগ্রাসী আচরণ বুঝি আরও বাড়বে, আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইবে বিশ্ব মোড়লরা। সেটা তারা করেছে, করার চেষ্টা চালাচ্ছে এখনও। কিন্ত বুশ বা ওবামার মতো অস্ত্রের ঝনঝনানির পথে হাঁটেনি ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প কাজ করেছেন কৌশলে। কোথাও হয়তো সোজা আঙুলে কাজ সেরেছেন, কোথাও আঙুল বাঁকা করেছেন। কোথাও বুঝিয়ে-সুজিয়ে কাজ আদায় করেছেন, কোথাও ধমক দিয়েছেন, আবার কোথাও হয়তো কাউকে ব্ল্যাকমেল করে সুবিধা হাসিল করে নিয়েছেন। 

একটা উদাহরণ দেই। সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সালমানের নির্দেশে তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে হত্যা করা হয়েছিল। খাশোগি ছিলেন প্রিন্স সালমানের কড়া সমালোচক, তিনি আবার আমেরিকার নাগরিকও। এই ঘটনাটার রাশ শুরু থেকেই নিজের হাতে রেখেছে ট্রাম্প প্রশাসন। হত্যাকান্ডের কড়া নিন্দা যেমন জানিয়েছেন ট্রাম্প, তেমনই সালমানের পিঠও বাঁচিয়েছেন, তথ্য-প্রমাণ সামনে আসতে দেননি। প্রিন্স সালমান এখন ট্রাম্পের হাতের পুতুল, ট্রাম্পের ইশারায় আরব আমিরাত আর বাহরাইনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক উন্নয়নে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।

যুদ্ধবাজ জন বোল্টনকে হোয়াইট হাউজ থেকে তাড়িয়েছেন ট্রাম্প

ট্রাম্পকে শান্তির পায়রা ডাকার বড় কারন গত চার বছরে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যুদ্ধবাজ নীতি থেকে সরে আসা। ট্রাম্প নিজের শাসনামলে নতুন করে কোন দেশে আক্রমণ করেননি, বরং ইরাক এবং সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। আফগানিস্তানের সরকারের সঙ্গে তালিবানরা আলোচনায় বসেছে, মধ্যস্ততা করছে মার্কিন প্রতিনিধিরা- যেটা বছর দুয়েক আগেও অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল। যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে তার পদ থেকে বহিস্কার করেছেন ট্রাম্প, এই লোক নাকি শুধু যুদ্ধের জন্য উস্কানি দিতেন তাকে! ২০১৯ সালে একদিন আচমকা টুইট করে ট্রাম্প জানিয়েছেন, 'সকালে আমি তাকে (বোল্টন) বলেছি, হোয়াইট হাউজে তার আর আসার দরকার নেই!'

তবে ট্রাম্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপটা এসেছে সম্ভবত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে। মনে করে দেখুন, চার-পাঁচ বছর আগেও কিছুদিন পরপরই ইসরায়েলি সেনারা বসতি স্থাপনের নামে ফিলিস্তিনীদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিতো, তারা প্রতিবাদ করতে এলে নির্বিচারে চালানো হতো গুলি। গত চার বছরে এরকম ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে, অন্তত বড় আকারে কোন সংঘর্ষ হয়নি ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে। 

অস্ত্রের জোরের পরিবর্তে ট্রাম্প চেষ্টা করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছ থেকে ইসরায়েলের জন্য স্বীকৃতি আদায় করে নিতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন স্বীকৃতি দিয়েও দিয়েছে ইসরায়েলকে, কুয়েতও দেয়ার পথে আছে। এই দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক চালু হয়েছে। কাগজে কলমে বলা হয়েছে, আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে সেটা ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের সম্পর্কোন্নয়নেই কাজ করবে। বাস্তবতা যাই হোক, আমেরিকার প্রধান মিত্র ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে, তুরস্ক এবং ইরানকে ঠেকানোর জন্য আমিরাত বা বাহরাইনও ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে- এই গোটা ব্যাপারটা ট্রাম্পের মস্তিস্কপ্রসূত, এটার ক্রেডিট তিনিই পাবেন। 

ইসরায়েল, আমিরাত ও বাহরাইনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ট্রাম্প

ট্রাম্প কি উত্তেজনা ছড়াননি তার শাসনামলে? অবশ্যই ছড়িয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার চাপান-উতোর তো কৌতুকের খোরাক জুটিয়েছিল। আচমকা ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানীকে হত্যা করে যুদ্ধের দামামা প্রায় বাজিয়েই দিয়েছিলেন, চার বছরের মেয়াদকালে সেটাই ছিল ট্রাম্পের সবচেয়ে হঠকারী সিদ্ধান্ত। এই দুটোকে বাদ দিলে ট্রাম্পকে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবেই মনে হবে যে কারো কাছে, ক্লিনটন, বুশ বা ওবামার চেয়েও যিনি শান্তিপ্রিয়।

বন্দুকের নল তাক করার পরিবর্তে ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধে নেমেছেন, চীনা কোম্পানীগুলোকে অবরোধ দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড ওয়ার ঘোষণা করেছেন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে আমেরিকা, কাশ্মিরের মুসলমানদের জন্যেও বিবৃতি দিয়েছে, চীনের উইঘুর মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের কড়া বিরোধিতা করেছে। নিজ দেশের করোনা মোকাবেলায় তিনি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, ওবামার করা স্বাস্থ্য নীতি বাতিল করে মধ্যবিত্ত আমেরিকানদের বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছেন। কিন্ত যদি বিশ্বনেতা হিসেবে ট্রাম্পকে মূল্যায়ন করতে হয়, তাহলে আমার চোখে তিনি ক্লিনটন, বুশ এমনকি ওবামার চেয়েও ওপরে থাকবেন। কারন এই তিনজনের যে কারো চেয়ে ট্রাম্পের কলারে নিরীহ মানুষের রক্তের দাগ কমই লেগেছে...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা