ভারসোভা, মুম্বাই। বহুতল একটা ভবনের বারান্দায় গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে অনিন্দ্যসুন্দরী এক তরুণী। আরব সাগরের লোনা বাতাসে তার অবাধ্য চুল উড়ছে, তরুণীর মুখে কেমন যেন একটা বিষাদের ছাপ। যশ, খ্যাতি, অর্থ সবই আছে তার, শুধু মনে সুখ নেই, শান্তি নেই। সেই অধরা সুখের খোঁজেই কিনা কে জানে, বছর উনিশের সেই তরুণীকে কিছুক্ষণ পর পড়ে থাকতে দেখা গেল তুলসী বিল্ডিঙের সেই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সামনে।

রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর, পাঁচতলার বারান্দা থেকে যে জায়গাটায় সে পড়েছে, সেখানে জমাট বেঁধে কালচে হয়ে আছে রক্ত। ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় মধ্যরাত, বাতাসে মৃত্যুর অশুভ একটা গন্ধ! প্রতিবেশীরা অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিলেন, লাল-নীল আলো জ্বালিয়ে সাইরেণ বাজিয়ে হাজির হলো সেটা। স্ট্রেচারে করে তরুণীর শরীরটা তোলা হলো সেখানে; গন্তব্য কুপার হসপিটাল। 

ডাক্তারদের বেশী কষ্ট করতে হলো না। পালস পাওয়া যাচ্ছিল না একদম, খানিক পরেই তরুণীকে মৃত ঘোষনা করে দিলেন তারা। হাসপাতালের সামনে তখন সাংবাদিকদের ভীড়। প্রবীণ এক ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, "এত ভীড় কেন, কে মরেছে?" তরুণ বয়স্ক একজন আড়চোখে তাকালেন সেই ডাক্তারের দিকে। নিজের হাতে পালসরেট চেক করে মৃত বলে ঘোষণা করলো, অথচ রোগীনীকে চেনে না ভদ্রলোক! ''একটু আগে যে সুইসাইড কেসটা এলো, উনিই। দিব্য ভারতী, ফিল্মের হিরোইন ছিলেন!" 

দিব্য ভারতী

উনিশ বছর বয়সে কী করা যায়? কতটা জয় করা যায়? সেটার উত্তর দিব্য ভারতী দিতে পারতেন। মাত্র ষোল বছর বয়সে সিনেমা জগতে এসেছিলেন, কৈশোরের লাজুক আভা তখনও শরীর ছেড়ে পালায়নি তার। বছর তিনেক মোটে সিনেমাজগতে বিচরণ করেছেন, তেলেগু ইন্ডাস্ট্রী জয় করে এসেছিলেন বলিউডে- বলা বাহুল্য, জয়রথ থামেনি এখানেও।

বাঘা বাঘা নায়িকাদের টেক্কা দিয়ে নিজের অপরূপ সৌন্দর্য্য আর অভিনয়ের দারুণ প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন বোম্বের এই তরুণী। সেইসঙ্গে প্রযোজক-পরিচালকদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন আস্থার আরেক নাম। সেই দিব্য ভারতী মাত্র উনিশ বছর বয়সে চিরবিদায় না নিলে ভারতের চলচ্চিত্র জগতে নায়িকাদের অবস্থানটাই হয়তো অন্যরকম হতো। স্বাধীনচেতা এই নারীর নাম হয়তো উচ্চারিত হতো মাধুরী-ঐশ্বরিয়া-কাজলদের আগে! 

তাকে আবিষ্কার করেছিলেন তেলেগু পরিচালক নান্দু তলানী। ভারতী তখন সবে ক্লাস নাইনের ছাত্রী। কিন্ত নান্দুর সঙ্গে সেই কাজটা করা হয়নি। গোবিন্দের বিপরীতে 'রাধা কা সংগ্রাম' সিনেমাতেও কাস্ট হয়েছিলেন তিনি, কিন্ত পরে সেখান থেকে বাদ দেয়া হয় তাকে, তার জায়গায় আসেন জুহি চাওলা। সেই রোলের জন্যে মাসব্যাপী অভিনয় আর নাচের কোর্সের দরকার ছিল, কিন্ত স্কুল শিক্ষার্থী ভারতী তখন শিডিউল ম্যানেজ করতে পারেননি।

ডজ্ঞুবতি ভেঙ্কটেশের বিপরীতে 'বব্বিলি রাজা' সিনেমা দিয়ে সিলভার স্ক্রীনে তার অভিষেক, বক্স অফিসে তুমুল আলোড়ন তুললো এই সিনেমা। ১৯৯০ এর গ্রীষ্মে মুক্তি পাওয়া বব্বিলি রাজা এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় তেলেগু সিনেমাগুলোর একটি। 'নিলা পেন্নে' নামের তামিল একটা সিনেমা করেছিলেন, সেটা ছিল ফ্লপ। এরপরেই সফলতার গল্প লেখা শুরু করেছিলেন সতেরো বছরের সেই তরুণী।

চিরঞ্জীবি আর মোহন বাবুর বিপরীতে পরপর হিট, পরের বছর নন্দমূর্তি বালাকৃষ্ণার সঙ্গেও হিট সিনেমা উপহার দিয়ে সমস্ত আলো নিজের দিকে টেনে নিলেন এই গুণী অভিনেত্রী। বোম্বের মেয়ে হয়ে নিজের শহরে রাজত্ব করবেন না, তা কী করে হয়! সানি দেওলের বিপরীতে 'বিশ্বোত্তমা' সিনেমা দিয়ে বলিউড অভিষেক হয়ে গেল তার। মোটামুটি ব্যবসা করা সেই সিনেমার 'সাত সামান্দার' গানটা তো অলটাইম ক্লাসিকের খেতাব পেয়ে গেছে অনেক আগেই।

পরের সপ্তাহেই বলিউডে দ্বিতীয় সিনেমা 'দিল কা ক্যায়া কসুর' রিলিজ পেল। বক্স অফিসে সাফল্য না পেলেও, নবাগতা ওই তরুণীর অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন সমালোচকেরা। ১৯৯২ সালের ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের টপ টেন বেস্ট অ্যাকট্রেস পারফরম্যান্সে জায়গা পেয়েছিল তার সেই অভিনয়। 

মাস দুয়েক পর এলো ডেভিড ধাওয়ানের 'শোলা অর শবনম', তার বিপরীতে নায়ক গোবিন্দ। গোবিন্দের ক্যারিয়ারে তখন ভাটার টান, সেই শুকনো বালুকাবেলায় জোয়ারের ঢল নিয়ে এলো এই সিনেমা। ডেভিড ধাওয়ানকে বলিউডে একটা অবস্থান তৈরী করে দিল 'শোলা অর শবনম', আর দিকে দিকে নাম ছড়িয়ে পড়লো দিব্য ভারতীর। জাতীয় হার্টথ্রব তিনি তখন, কোটি তরুণের স্বপ্নের নায়িকা! 

এরপর এলো দিওয়ানা। এই সিনেমাটাকে লোকে শাহরুখের অভিষেক ফিল্ম হিসেবেই চেনে। অনেকেই জানেন না যে, দিওয়ানাত্ব অভিনয়ের জন্যে ফিল্মফেয়ারে সেরা নবাগতা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছিলেন দিব্য ভারতী। একই বছরে মাস তিনেকের ব্যবধানে দুইবার সমালোচকদের প্রশংসায় সিক্ত হওয়াটা বিশেষ কিছুই, দিল কা ক্যায়া কসুরের পর দিওয়ানা দিয়ে সেটা অর্জন করে নিয়েছিলেন তিনি। 

দিওয়ানা সিনেমায় শাহরুখের সাথে

সফলতার নতুন নতুন গল্প লিখছিলেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। আঠারো বছর বয়সেই তিনি তখন ভারতীয় তরুণীদের রোল মডেল! শোলা অর শবনম সিনেমায় অভিনয় করার সময় গোবিন্দের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল নির্মাতা সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার সঙ্গে। প্রেমে পড়েছিলেন দুজন দুজনের, হুট করেই বিয়ে করে বসেন পরিচয়ের অল্প ক'দিনের মাথায়! সেই সিদ্ধান্তটা যে ভুল ছিল, সেটা বুঝতে বেশীদিন লাগেনি ভারতীর। দাম্পত্য জীবনে মোটেও সুখী ছিলেন না দুজনে। এক ছাদের নীচে বাস করাও বন্ধ করে দেন একটা সময়ের পরে।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের এই ধাক্কাটা সামলাতে পারেননি অল্প বয়েসী এই তরুণী। রূপালী পর্দার আড়ালে থাকা কুৎসিত জগতটায় মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল হয়তো। মদে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন, সেসবের প্রভাব পড়ছিল অভিনয়েও। সাজিদের জন্যে ঘর ছেড়েছিলেন তিনি, ত্যাগ করেছিলেন ধর্মও। নিজের নাম বদলে রেখেছিলেন সানা নাদিয়াদওয়ালা। 

১৯৯৩ সালের ৫ইই এপ্রিল যাবতীয় শোক-দুঃখকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে দেন তিনি। পুলিশ তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করেছিল শুরুতে, কিন্ত পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখির কারণে কেস রিওপেন করা হয়, পুনঃতদন্তে নামে গোয়েন্দারা। হত্যা না আত্মহত্যা? কোনটা ঘটেছিল দিব্য ভারতীর সঙ্গে? জানা যায়নি আজও।

পরদিন চেন্নাইতে একটা সিনেমার শুটিঙে অংশ নেয়ার কথা ছিল তার, সেদিন মুম্বাইতে তার থাকার কথাই ছিল না। কিন্ত কেন থেকে গিয়েছিলেন তিনি? কেন ফ্লাইট পিছিয়ে দিয়েছিলেন তিনি? মৃত্যুর টানে? যে অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাট থেকে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলা হয়, সেটি তার নামে ভাড়া নেয়া হয়নি, হয়েছিল সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার নামে। দুজনের সম্পর্কে তখন শীতলতা, দিব্য নিজের আর ভাইয়ের জন্যে চার রুমের ফ্ল্যাট নিয়েছেন মুম্বাইতে, তবুও কেন সেই রাতে নাদিয়াদওয়ালার নামে ভাড়া নেয়া ফ্ল্যাটে থাকতে গেলেন তিনি?

সেই সময়ে সাজিদ নাদিদওয়ালার সাথে দিব্য ভারতী

এসব প্রশ্নের জবাব পায়নি কেউ। শেষমেষ ১৯৯৮ সালে মুম্বাই পুলিশ আরও একবার এটাকে আত্মহত্যা বলে রিপোর্ট দেয়। 'রং' আর 'শতরঞ্জ' সিনেমা দুটি মুক্তি পেয়েছিল ভারতী মারা যাবার অল্প ক'দিন পরে। শেষবারের মতো প্রিয় নায়িকাকে দেখতে সিনেমা হলে ভীড় জমিয়েছিল ভক্তরা। অনেক সিনেমার কাজই অসমাপ্ত রেখে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

তেলেগু ফিল্ম 'ঠোলি মুদ্ধু' তে তার জায়গায় নেয়া হয়েছিল রম্ভাকে, তিনি দেখতে খানিকটা ভারতীর মতোই ছিলেন। 'লাডলা' সিনেমায় তার পরিবর্তে আসেন শ্রীদেবী। মোহরা, কর্তব্য, বিজয়পথ, আন্দোলন সহ আরও বেশকিছু সিনেমায় অভিনয় করার কথা ছিল তার, চুক্তিও করেছিলেন। কিন্ত সেগুলো আর করা হয়নি ভারতীর। সবকিছুর মায়া ছাড়িয়ে যে অনেক আগেই অন্য একটা জগতে চলে গেছেন তিনি! 

বিউটি উইথ ব্রেইনের দেখা খুব একটা পাওয়া যায় না। বলিউডে তো এমনটা একেবারেই বিরল। সেই বিরল প্রজাতীর একজন ছিলেন দিব্য ভারতী। সাফল্যের সংজ্ঞা যিনি নিজের হাতে লিখতে শুরু করেছিলেন, উনিশ বছর বয়সেই যে তরুণী হয়ে উঠেছিলেন ভারতের চলচ্চিত্র জগতের ভবিষ্যত- তিনি অকালে চলে না গেলে বলিউডের ইতিহাসের বড় একটা অনুচ্ছেদ তার নামেই লেখা হতো হয়তো।

 তথ্যসূত্র- After 26 Years, Divya Bharti’s Death Still Remains a Mystery


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা