সারা পৃথিবী থেকে যখন করোনাভাইরাসের প্রাদূর্ভাব শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, তখন আমরা পুরো বিশ্বের বুকে একটি ক্ষতচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হবো। সেটি কি অর্থনীতির চাকা চলমান রাখবে নাকি বন্ধ করে দেবে?

ভাইরাস এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে রেড জোনগুলোতে লকডাউন কঠোর করতে বলছেন এবং গ্রীন জোনগুলোতে লকডাউন শিথিল করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলছেন। যেসব দেশে লকডাউন শিথিল করেছে, সেসব দেশে এরকম পদ্ধতিতেই করা হয়েছে। যদিও তারা এই পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন সংক্রমণ কমে আসার পর্যায়ে, আমাদের মতো সংক্রমণের উর্ধগতির পর্যায়ে না। 

দেশে এখন টেস্টের সংখ্যা বাড়ছে। লকডাউন করা এলাকাগুলোতে এগ্রেসিভ টেস্টিংয়ের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আইসোলেশন এবং কন্ট্যাক্টদের কোয়ারাইন্টাইন করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভাবনা ছিল। ঈদের পরে সব সময়ই অন্তত ১০ দিন জীবনযাত্রা স্থবির থাকে, তার সাথে আরো কয়েকদিন যোগ করে যদি উপরে উল্লেখিত ব্যবস্থাগুলো নেয়া হত, ঢাকার বাইরে যাওয়া মানুষের যদি অন্তত ১৪ দিন রাজধানীতে ফিরে আসা ঠেকিয়ে রাখা যেত, তাহলে হয়ত সংক্রমণের হার কমানো যেত।

অথচ আমরা অবাক হয়ে দেখলাম বিশেষজ্ঞদের মতামতগুলোকে ন্যূনতম বিবেচনায় না নিয়ে ৩১ মে থেকে সারা দেশের সব অফিস, আদালত, দোকানপাট, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ফেসবুক কিংবা গণমাধ্যমে মতামত দেয়ার সুযোগ সীমিত করে দেয়া হয়েছে। তা না হলে বোঝানোর চেষ্টা করতাম, এই সিদ্ধান্তটি কতটা আত্মঘাতী হয়েছে। কফিনে আরেকটি পেরেক মারা হলো আর কি। 

মিঃ হাইজিন: জীবাণুমুক্ত হাতের প্রতিশ্রুতি 

আমার অর্থনীতির চাকা চালু রাখা নিয়ে উদগ্রীব ভাই বন্ধুদের মতো আমি অর্থনীতি বুঝি না, সেটা বোঝা আমার কাজও না। আমি শুধু বুঝি, করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মৃত্যহার কম হলেও প্রচুর মানুষ অসুস্থ হবে। একজন পজিটিভ হলে তাকে আপনি ২১ দিনের ছুটি দিতে বাধ্য। সে হয়ত মারা যাবে না, কিন্তু তার কাছ থেকে সার্ভিসও তো নিতে পারবেন না। তাহলে কীভাবে অর্থনীতির চাকা সচল থাকে?

আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি গার্মেন্টস শিল্প, তারা অসুস্থ হয়ে কারখানায় না আসতে পারলে, একজন পজিটিভ হলে আরো কয়েকজনকে নিয়ে কোয়ারাইন্টাইনে চলে যেতে হলে, কারখানা লকডাউন করতে হলে  অর্থনীতির চাকা কীভাবে সচল হবে? দেশের চলমান বড় বড় প্রজেক্টগুলোতে যে হাজার হাজার চীনা ইঞ্জিনিয়ার কাজ করে, তারা তো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসলে ফিরে আসবে না। কোন দেশই তো করোনার ঝুঁকিতে থাকা জনশক্তি আমদানি করবে না। তাহলে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেলসহ বড় বড় প্রকল্পগুলো শেষ হতে কত দেরি হবে?

আমাদের দেশে করোনাভাইরাসের যে গতি প্রকৃতি, তাতে মনে হচ্ছে, প্যানডেমিক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এনডেমিক হিসেবে এই ভাইরাস আমাদের দেশে আগামী কয়েক বছর ধরে সংক্রমণ ঘটিয়ে যাবে, মানুষ মারা যাবে। সারা পৃথিবী থেকে যখন করোনাভাইরাসের প্রাদূর্ভাব শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, তখন আমরা পুরো বিশ্বের বুকে একটি ক্ষতচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হবো। সেটি কি অর্থনীতির চাকা চলমান রাখবে নাকি বন্ধ করে দিবে, অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা দয়া করে আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা