‘ইভ্যালিতে হচ্ছেটা কী?’- বর্তমানে চায়ের কাপ থেকে শুরু করে কীবোর্ডে তুফান উঠানো এক টপিক; একদিকে এই গুণগান তো আরেকদিকে অভিযোগের ডালি, একপাশে আর্গুমেন্ট তো আরেকপাশে ক্ষুরধার কাউন্টার! আসলেই তো, হচ্ছেটা কী?

হালের সেনসেশন ইকমার্স কোম্পানি ইভ্যালির বিজনেস স্ট্রাটেজি নিয়ে আমরা কাঁটাছেড়া আর ইন-ডেপথ এনালাইসিস করছিলাম এই মিনি কেইস স্টাডিতে। এর আগের পর্বে আমরা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার করে দেখেছিলাম কিভাবে ভ্যালু+ইনোভেশনের মাধ্যমে ইভ্যালি কাস্টমার একুইজিশন করছে। যেটাকে আমরা পার্শিয়ালি (একসিডেন্টাল) Blue Ocean Strategy এর সাথে ম্যাপ করতে চেষ্টা করেছিলাম।

আজকের পর্বে আমরা খুব ইন্টারেস্টিং কিছু স্ট্রাটেজিক বিজনেস এংগেল থেকে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো:

১। ইভ্যালির কারেন্ট বিজনেস মডেল সাস্টেইনেবল কিনা এবং

২। এত হিউজ পরিমাণ ডিসকাউন্ট ইভ্যালি কিভাবে দিচ্ছে?

এখানে আমরা খুবই পাওয়ারফুল, ইফেক্টিভ এবং প্র্যাক্টিকাল কিছু স্ট্রাটেজির আলোকে এগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো, যা কিনা সাধারণত দেশের নামকরা বিজনেস স্কুলগুলোতেও আলোচনা করা হয় না।

বিজনেস স্ট্রাটেজি যেহেতু একই সাথে আর্ট এবং সাইন্স - একজনের পয়েন্ট অফ ভিউ, এনালাইসিস, এক্সপ্ল্যানেশন আরেকজনের থেকে আলাদা হতে পারে। কিন্তু আপনি যেন লার্নিং এর পাশাপাশি স্ট্রটেজিগুলোর মূল কনসেপ্ট কাজে লাগিয়ে নিজের বিজনেসের গ্রোথ মাল্টিপ্লাই করতে পারেন সেটা এই মিনি কেইস স্টাডি লেখার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

The Irrefutable Law of Business Growth

একটি সাস্টেইনেবল বিজনেস মডেল দাঁড় করাতে চাইলে সেটা শুধুমাত্র শর্ট টার্মের জন্য নয়, বরং লং টার্মে সাকসেসফুল এবং কমার্শিয়ালি প্রফিটাবল হতে হবে। বিশ্বের ওয়ান অফ দ্য হাইয়েস্ট পেইড বিজনেস কনসালটেন্ট, মার্কেটিং লিজেন্ড এবং আমার অন্যতম পছন্দের বিজনেস স্ট্রাটেজিস্ট Jay Abraham এর মতে, “একটা বিজনেস গ্রো করানোর জন্য শুধুমাত্র তিনটি উপায় রয়েছে।”

  1. Increase the number of clients

  2. Increase the average transaction value

  3. Increase the frequency of repurchase

আমরা আজকে এই বিজনেস ল'তে ইভ্যালিকে কেইস হিসেবে ধরে দেখার চেষ্টা করবো লং রানে তাদের কারেন্ট বিজনেস মডেল সাসটেইনেবল এবং প্রফিটেবল কিনা। যদি না হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে কোথায় কোথায় স্ট্রাটেজিক চেঞ্জ আনা যেতে পারে, সেটাও এই আলোচনাতে উঠে আসবে।

ইভ্যালি

বাংলাদেশের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে এক বিস্ময়ের নাম ইভ্যালি

1. Increase the number of clients

বিশ্ববিখ্যাত প্রিমিয়াম ডিজিটাল মার্কেটিং ট্রেইনিং প্রোভাইডার 'DigitalMarketer' এর সিইও Ryan Deiss এর মুখে আমি অনেকবার এই কথাটি শুনেছি, “He who can spend the most money to acquire a new customer… wins.” নতুন কাস্টোমার একুইজিশন করার জন্য তাই কোম্পানিগুলো অনেক অনেক খরচ করে থাকে।

এখানে মূল কনসেপ্টটা খুব সিম্পল - প্রথমে একজন নন কাস্টমারকে একটা irresistible offer দেবার মাধ্যমে কাস্টমারে রূপান্তরিত করতে হবে। তারপর তাকে প্রোডাক্ট বা সার্ভিস ব্যবহারে এমনভাবে অভ্যস্ত করতে হবে যেন পরবর্তীতে ডিসকাউন্ট ছাড়াও ব্যবহার করতে থাকে। এটাকে আমরা মাস্ট হ্যাভ প্রোডাক্ট/সার্ভিস বলি।

(এখানে ফুল প্রসেসটা আরেকটু জটিল এবং অবশ্যই স্ট্রাটেজির কোরে একটা অপটিমাইজড সেলস ফানেল থাকবে। তবে সেই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজির ব্যাখ্যায় আজকে যাব না...এটা আরেকদিনের জন্য তোলা থাক)।

বাংলাদেশে প্রথম দিকে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো এভাবে হিউজ ডিসকাউন্টের মাধ্যমে কাস্টমার তৈরি করেছে। আমি নিজেও এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে কুপন ছাড়াও সবসময় বাইক ইউজ করতাম। (যদিও বছরখানেক আগে মিনি এক্সিডেন্টের শিকার হবার পর অপরিচিত কারো বাইকের পিছনে ওঠা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছি)।

অপরপক্ষে স্বল্প সময়ে অনেক নতুন কাস্টমার আনতে গিয়ে এবং হিউজ বিজনেস গ্রোথ দেখাতে গিয়ে ইভ্যালি ডিসকাউন্টে যে প্রোডাক্ট অফার করছে, তা কোনভাবেই 'মাস্ট হ্যাভ' নয়। অথচ প্রতিটা কাস্টমারের জন্য অবিশ্বাস্য অঙ্কের 'Customer Acquisition Cost (CAC)' লাগছে। ফলে ইভ্যালির কারেন্ট বিজনেস মডেলে প্রথম বিজনেস ল'টা আপাতত সাকসেসফুলি ফিলাপ হলেও পরবর্তী দুইটিতে মেইনটেইন করাটা ডিফিকাল্ট হয়ে যাচ্ছে।

2. Increase the average transaction value

যে কোন সাকসেসফুল ইকমার্স সাইটে গেলেই আপনি দেখতে পাবেন তারা কাস্টমারের Average Transaction Value এবং Customer Lifetime Value (LTV) বাড়ানোর জন্য কাস্টোমাইজড সাজেশন, নির্দিষ্ট এমাউন্টের উপর অর্ডার করলে ফ্রি ডেলিভারি, ব্যান্ডেল অফার, আপসেল ইত্যাদি করার চেষ্টা করে।

LTV:CAC রেশিও এজন্য খুবই জরূরী, যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে কাস্টোমারের লাইফ টাইমের ভ্যালুর চেয়েও একুইজিশন কস্ট বেশি হয়ে যাচ্ছে কিনা। ইভ্যালি যেহেতু প্রথমেই কাস্টমার একুয়ার করতে অনেক খরচ করে ফেলছে, সেলস ফানেলের পরের স্টেপে অবশ্যই সেটাকে পুরোপুরি কাভার করে তারপর প্রফিট বের করতে হবে।

কিন্তু এখানে চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে ইভ্যালি নিজের ভ্যালু প্রপোজিশনটাই দাঁড় করিয়েছে ‘হিউজ ডিসকাউন্ট অনলি সাইট’ হিসেবে। সবসময় ডিসকাউন্ট দিতে থাকলে কাস্টমারের লাইফটাইম ভ্যালু থেকে ন্যাচারালি প্রফিট বের করাটা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। সাসটেইনেবল বিজনেস টি-২০ ক্রিকেট ম্যাচ নয় যে হুটহাট কয়টা ছক্কা মেরে জেতা যাবে। এটা অনেকটা টেস্ট ম্যাচের মতো, প্রতিটা সেশন দেখে শুনে বুঝে খেলতে হবে। শুধু ইউনিকর্ণ হতে চাইলেই হবে না, কখনো কখনো ক্যামেল হওয়া শিখতে হবে। 

3. Increase the frequency of repurchase

কাস্টমারের লাইফটাইম ভ্যালু বাড়ানোর জন্য তাকে আরো বেশি বেশি শপিং করাতে হবে। Amazon এখানে একটা গোল্ড মাইন হিট করেছে 119$ সাবস্ক্রিপশন এর Amazon Prime আনার মাধ্যমে। রিসার্চে দেখা গিয়েছে অ্যামাজন প্রাইমে গ্রাহকরা অন্যদের থেকে দ্বিগুণ শপিং করে। এক্ষেত্রে কোম্পানির ফুল সেলস ফানেল, সবগুলো স্ট্র্যাটেজি এমনভাবে এলাইন্ড হতে হবে যেন বিজনেস গ্রোথের তিনটা ল'ই মেইনটেইন হয়। একটা হাইপ তুলে একগাদা টাকা ইনভেস্ট করে ইনিশিয়াল বিজনেস গ্রোথ দেখালে কিন্তু চলবে না।

ইভ্যালির বিজনেস মডেলে এখানে একটা মারাত্মক ভালনেরাবিলিটি থাকতে পারে। পুরো ব্যপারটার মাঝে কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, স্ট্র্যাটেজি, সমন্বয়তা আছে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। দুঃশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এর জন্য কোম্পানি বেশ কিছু ডেসপারেট স্টেপ নিচ্ছে, যা লিগ্যাল এবং এথিক্যাল বাইন্ডারির মধ্যে পড়ে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

উদাহরণ স্বরুপ, ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাকের টাকা 'ইভ্যালি ওয়ালেট'-এ জমা হচ্ছে। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে এর আগে পাঠাও চালু করেছিল 'পাঠাও পে'। কিন্তু আইনগত সিদ্ধতা না থাকায় সেটা অচিরেই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। সুতরাং এখানে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ইভ্যালিও জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ভার্চুয়াল কারেন্সই তৈরি করে বসেছে কিনা, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনবিরুদ্ধ।

লং রানে সাস্টেইনেবল হতে হলে ইভ্যালিকে তাই অবশ্যই মেজর কিছু স্ট্রাটেজিক চেইঞ্জ নিয়ে আসতে হবে যা পুরোপুরি লিগ্যাল, এথিক্যাল এবং কাস্টমারবান্ধব।

এজন্য হুটহাট ফেইসবুকে স্ট্যাটাসে অথবা লাইভে ড্রামাটিক পলিসি তৈরি না করে কমপ্লিটলি সিস্টেমেটিক প্রসেস বিল্ডআপের দিকে ফোকাস করতে হবে। প্রস্তর যুগের পদ্ধতি বাদ দিয়ে কাটিজ এইজ টেকনোলজি ব্যবহার করে অপারেশন্স এফিসিয়েন্সি বাড়াতে হবে। আল্ট্রামডার্ণ ড্রোন ডেলিভারির যুগে গরুর গাড়ির মতো তিন মাস না লাগিয়ে স্বল্পতম সময়ে প্রোডাক্ট ডেলিভারি করার ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করতে হবে।

ইভ্যালি এত ডিসকাউন্ট কীভাবে দিচ্ছে?

কোন ব্যবসায়ীই তার বিজনেসের মূল সিক্রেটটা ফাঁস করবে না, মার্কেটে লিভারেজ ধরে রাখতে ইভ্যালিও তাই এই রহস্যটা গোপনই রাখতে চাইবে। আমার আপনার জন্যে ফিনান্সিয়াল স্টেটমেন্টস এ চোখ না বুলিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অনেকটাই অন্ধের হাতি দেখার মতো। তবুও চলুন আমরা হাতে থাকা তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে কিছু হাইপোথেসিস দাঁড় করানোর চেষ্টা করি, যা পুরোপরি সঠিক না হলেও একটা ওভারঅল পিকচার দেবে।

ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেলের লিংকডইনের স্ট্যাটাস অনুযায়ী ফেব্রুয়ারীতে ইভ্যালির 'Gross Merchandise Value (GMV)' ছিল 20m$ বা ১৭০ কোটি টাকা। ইভ্যালি একটা মার্কেটপ্লেস মডেলে কাজ করে। অর্থাৎ তাদের নিজস্ব কোন প্রোডাক্ট নেই, মার্চেন্টের কাছ থেকে কমিশন লাভ করে। বাংলাদেশে মার্কেটপ্লেসগুলো সাধারণত প্রোডাক্ট ক্যাটাগরি ভেদে ১০-২৫% কমিশন রাখে। বাল্ক বায়িং এবং ইকোনোমিক্সের স্কেলের কারণেও ইভ্যালি মার্চেন্টের সাথে নেগোসিয়েশনে একটা বেটার ডিল নিতে পারে।

লক্ষ্য করে দেখবেন ইভ্যালি অবিশ্বাস্য ধরণের ডিসকাউন্ট কিন্তু সবসময় খুব সিলেক্টেড কিছু আইটেমে দেয়, এবং সেগুলোর স্টকও লিমিটেড থাকে। এর বেশিরভাগই আসলে স্টক ক্লিয়ারেন্স আইটেম, যেগুলো সেলার চায় কোনমতে কেনা দামে ছেড়ে নতুন প্রোডাক্ট তুলতে।

১৭০ কোটি টাকার মধ্যে ইভ্যালির মাথাব্যাথার বিষয় হচ্ছে শুধুমাত্র সেই আইটেমগুলোই যেখানে তাদেরকে আসলেই প্রচুর পরিমান ভর্তুকি দিতে হচ্ছে কাস্টমার একুইজিশন করার জন্য।

মজার ব্যাপারটা হচ্ছে, এর মধ্যেই আবার বড় একটা এমাউন্ট রয়েছে গ্রাহকের ক্যাশব্যাকের টাকা। ডিসকাউন্ট নিয়ে আলোচনার তুফান ছুটাতে গিয়ে এটা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। এই ক্যাশব্যাকের টাকা ব্যবহারের উপর বিভিন্ন শর্ত থাকার কারণে সেখান থেকে ইভ্যালি প্রফিট করতে পারে।

উদাহরণ- ধরুণ মার্চেন্টের একটা প্রোডাক্টের পিছনে খরচ ৬০ টাকা, এবং প্রাইস সেট করা হয়েছে ১০০ টাকা। আপনি এই আইটেমে ২০% ছাড়ে ৮০ টাকাতে পান তাহলে ১০% কমিশন পেলেও ইভ্যালি ১০ টাকা আর মার্চেন্ট ১০ টাকা লাভ করছে। এবার ধরুন আপনি এটা হাই ডিসকাউন্ট ৬০% ক্যাশবাকে ৪০ টাকাতে পাচ্ছেন। এই আইটেমে মার্চেন্ট স্টক ক্লিয়ার করছে তারা লাভ না করে ৬০ টাকাই পেল। সেক্ষেত্রে ইভ্যালির লস ২০ টাকা যা সে ভর্তুকি দিচ্ছে।

এবার আপনি যখন ক্যাশব্যাকের ৬০ টাকা দিয়ে রেগুলার আইটেম (গ্রোসারি, ফ্যাশন আইটেম, বেবি ডায়াপার ইত্যাদি) কিনবেন, সেখানে কিন্তু ইভ্যালি ২০% কমিশন রাখলেও ১২ টাকা তুলে ফেলবে। সুতরাং একশো টাকাতে ২০-১২= ৮ টাকা তাদের লস হচ্ছে। একশো না হয়ে যদি এক লাখ টাকার প্রোডাক্ট হয় তাহলে একুইজিশন কস্ট দাঁড়াচ্ছে ৮০০০ টাকা।

আমরা কাস্টমার একুইজিশন, অন্যান্য মার্কেটিং এক্সপেন্স, অপারেশন্স, এইচআর, ইনফ্রেস্ট্রাকচার ইত্যাদি কনসিডার করে আন্দাজ করতে পারি যে ইভ্যালির ২০২০ সালে ১০০~২০০ কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট প্রয়োজন, যদিও সঠিক সংখ্যাটা শুধুমাত্র কোম্পানির লিডাররাই বলতে পারবে।

ইভ্যালি সিইও

ইভ্যালি সিইও মোহাম্মদ রাসেল

কীভাবে এই হিউজ ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজ করছে?

Ecommerce is a cash hungry business - আমরা গ্লোবালি দেখেছি ইকমার্স কোম্পানিগুলোকে মার্কেটে রাজত্ব বিস্তারের লক্ষ্যে হিউজ ইনভেস্টমেন্ট করতে। Amazon নিজে যাত্রা শুরু করার ১০ বছর পর প্রথম প্রফিটের মুখ দেখেছিল। ইন্ডিয়াতে ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করা ফ্লিপকার্ট ইন্টারনেট ২০১৯ সালেও ১৬২৪ কোটি টাকা লস করেছে।

বাংলাদেশে বেশিরভাগ ইকমার্স কোম্পানিই দেখি ডে ওয়ান থেকে Everything Store ‘Amazon’ হতে চায়! অথচ জেফ বেজোস তার অটোবায়োগ্রাফিতে বিস্তারিত বলেছেন কিভাবে শুধুমাত্র একটা প্রোডাক্ট ক্যাটাগরি (বই) দিয়ে আগে পুরোপুরি অপারেশনাল এফিসিয়েন্সি এবং কাস্টোমার স্যাটিসফেকশন নিশ্চিত করার পরেই তারা ক্যাটাগরি এক্সটেনশন করেছে।

আমি তাই ইকমার্স উদ্যোক্তাদের Zappos এর সিইও Tony Hsieh এর লেখা বই ‘Delivering Happiness’ পড়তে উৎসাহিত করি। কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স যাদের বিজনেসের মূলমন্ত্র। ইভেন শেষ পর্যন্ত Amazon নিজেই Zappos কে কিনে নিয়েছে $1.2 Billion দিয়ে। সবাই এমাজন হতে না চেয়ে কেউ কেউ Zappos হবার চেষ্টা করলে দেশের ইকমার্স ইন্ডাস্ট্রি এতদিনে আরো অনেক ডেভেলপ করতো (সাথে কোম্পানি বিক্রি হবার চান্সও থাকতো)!

বাংলাদেশে ইভ্যালির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দারাজ সম্প্রতি অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটা ঘোষনা দিয়েছে যে ২০২১ সাল পর্যন্ত আলীবাবা ৫০০ কোটি টাকা ইনভেস্ট করবে তাদের লজিস্টিকাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার, উদ্যোক্তা তৈরি প্রকল্প ইত্যাদিতে। ইভ্যালিরও এ মুহূর্তে অবশ্য করনীয় শুধুমাত্র কাস্টমার একুইজিশনে খরচ না করে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট, ফাস্টার ডেলিভারি, বেটার কাস্টোমার এক্সপেরিয়েন্সে তৈরিতেও ইনভেস্টমেন্ট করা।

আসুন দেখি কি কি সম্ভাব্য উপায়ে ইভ্যালি এটা করতে পারে-

প্রথমত, ইভ্যালি হয়তো বড় এমাউন্টের ইনভেস্টমেন্ট রেইজ করেছে বিভিন্ন খাত থেকে, যেমন বিত্তবান ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। Future Startup একটি আর্টিকেলে উল্লেখ করেছিল ইভ্যালির সাথে ইন্টারন্যাশনাল কিছু Venture Capitalist (VC) এবং ইকমার্স প্লেয়ারদের আলোচনা চলছে। রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ‘পাঠাও’ অন্তত 10 million dollar (প্রায় ৮৫ কোটি টাকা) এবং ‘সহজ’ 15 million dollar ফান্ড রেইজ করেছিল। আরেক ইকমার্স Sindabad রেইজ করেছিল 4.15 million dollar। যদিও ইভ্যালির ফান্ড রেইজের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য আমরা পাইনি।

দ্বিতীয়ত, আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে ইভ্যালি ডেলিভারি দিতে এক থেকে তিন মাসও দেরী করে ফেলে। ডিলেইড ডেলিভারির এই শত কোটি টাকার ক্যাশ বিভিন্নভাবে রোল করিয়ে তারা এই মডেলটা রান করিয়ে যাচ্ছে। যদিও এতে মার্কেটে ইভ্যালির প্রচন্ড রকম বাজে ইমেজ তৈরি হয়েছে, এবং এটা একটা অগ্রহণযোগ্য বিজনেস প্র্যাক্টিস। এছাড়া বিভিন্ন আলোচনার কমেন্টে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছে এখানে কোনপ্রকার Ponzi Scheme কিংবা Money Laundering হচ্ছে কিনা।

পঞ্জি স্কিম একটা ফ্রড বিজনেস যেখানে অধিক লাভের আশায় অনেকে ইনভেস্টমেন্ট করে থাকে, এবং নতুন ইনভেস্টরদের কাছে থেকে টাকা নিয়ে পুরাতন ইনভেস্টরদের দেয়া হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কোম্পানি বড় অঙ্কের একটা টাকা একবারে নিয়ে পালিয়ে না যায়, বা সবাই একসাথে অর্থ দাবী না করে, ততক্ষণ এভাবে চলতে থাকে। অন্যদিকে Money Laundering হচ্ছে অবৈধ উপায়ে প্রাপ্ত অর্থ (কালো টাকা) কোন একটা লিগ্যাল প্রসেস বা বিজনেসের মধ্যে ঢুকিয়ে legalize (সাদা) করিয়ে নেয়া।

প্রিয় পাঠক, আমাদের সকল স্ট্রাটেজিক আলোচনার 'pre-requisite' হচ্ছে লিগাল বিজনেস। কেউ যদি ইলিগ্যাল ওয়েতে বিজনেস রান করার চেষ্টা করে, তাহলে সেটা নিয়ে কোনপ্রকার স্ট্রাটেজিক আলোচনা বা এনালাইসিস করা অর্থহীন। আর তাছাড়াও সেটি তখন আমাদের আলোচনার স্কোপের পুরোপুরি বাইরে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে।

যাই হোক, উপরে আমরা কিছু হাইপোথেসিস এবং উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কিভাবে ইভ্যালি এত বিশাল পরিমান খরচ করতে পারছে।

অনেকের ধারণা ইভ্যালি হয়তো ভ্যালুয়েশন বাড়িয়ে কোন গ্লোবাল ইকমার্স জায়ান্ট এর কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করবে। আল্টিমেট গোল যাই হোক, সাস্টেইনেবল বিজনেস মডেল দাঁড় না করাতে পারলে এবং ব্যালেন্স শীট ঠিক মতো মেইনটেইন না করতে পারলে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানো সবসময়ই দুষ্কর।

উপরে আমরা ইতিমধ্যে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করেছি, আশা করবো ইভ্যালি নিজেদের স্বার্থেই বিজনেস মডেল এবং প্র্যাক্টিসে এগুলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে আরো সামনে এগিয়ে যাবে।

Action Time!

দুই পর্বের এই মিনি কেইস স্টাডিতে আমরা ইভ্যালিকে একটা উদাহরণ হিসেবে ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্ট্রাটেজি নিয়ে প্র্যাক্টিকালি আলোচনা করেছি - যেমন Blue Ocean Strategy, জে আব্রাহামের Irrefutable Law of Business Growth ইত্যাদি।

এই কেইস স্টাডি থেকে আপনি সবচেয়ে বেশি উপকৃ্ত হবেন যদি এটাকে সেইভ করে রেখে উল্লেখ্যযোগ্য অংশগুলো বারবার পড়েন, এবং এখান থেকে উপযুক্ত ৩-৫ টা কী স্ট্রাটেজি বেছে নিয়ে আপনার বিজনেসে ইমপ্লিমেন্ট করেন।

আপনার মূল্যবান কমেন্টের অপেক্ষায় থাকলাম। আপনি চাইলে এবং সময় পেলে পরবর্তীতে আবারো কোন একদিন অন্য কোন মিনি কেইস স্টাডি বা বিজনেস স্ট্রাটেজি নিয়ে আলোচনা করবো। সুস্থ থাকুন, ভাল থাকুন।

P.S. You're Just One IDEA Away!

(পেশায় তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কাম বিজনেস কনসালটেন্ট, কাজ করেন মূলত টেক কোম্পানীগুলোর জন্য। বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র‍্যাজুয়েশন করেছেন, তারপর এমবিএ ডিগ্রি নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে। এখন একই প্রতিষ্ঠান থেকে ডক্টর অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিগ্রি নিচ্ছেন। এই তরুণের নাম মার্ক অনুপম মল্লিক, লেখালেখিটা করাটা তাঁর শখ, অবসরে ভালোবাসেন বই পড়তে, অথবা চকলেট বার হাতে নিয়ে নেটফ্লিক্সে ডুব দিতে।

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মেইল করতে পারেন anupom.mollick@ideanconsulting.com এই ঠিকানায়, অথবা ঢুঁ মারতে পারেন তার লিঙ্কডইন প্রোফাইলে)

আরও পড়ুন-


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা