এই অসভ্য বর্বর দেশে জন্ম নিয়ে আমি মোটেও গর্বিত না। 'তাহার মাঝে আছে দেশ এক, সকল দেশের সেরা'- এই লাইনটাকে আমি সজ্ঞানে বর্জন করলাম।

আচ্ছা আপনাকে একটা সহজ প্রশ্ন করি। ভেবে চিন্তে উত্তর দেন।

ধরুন আপনার পরিচিত একজন মানুষ করোনা সাস্পেক্টেড, তার মধ্যে করোনার সব সিম্পটম তীব্রভাবেই আছে। ঈদের দিনই করোনা হাসপাতালে ভর্তি, সার্বক্ষণিক অক্সিজেন দিতে হচ্ছে, স্যাচুরেশন ৯০% এর নিচে। 

খবরটা আপনাকে নিশ্চয়ই তীব্রভাবে ধাক্কা দেবে। সন্দেহ নেই আপনি চরমভাবে উদ্বেগের মধ্যেই থাকবেন। কিন্তু এর সাথে সাথে যদি শুনেন সাস্পেক্টেড পরিচিতজনের পরিবারকে গ্রামবাসী একঘরে করে রেখেছে, এলাকার মাতবর ফোন দিয়ে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ঘর থাইকা তোরা কেউ বাইরবি না। তাইলে কিন্তুক খবর করে দিমু। তোরা গেটের ভেতর থাক। তোদের কারণে আর কারোর ক্ষতি হইলে ক্ষতিপূরণ তোরাই দিবি...

মিঃ হাইজিন: জীবাণুমুক্ত হাতের প্রতিশ্রুতি  

এখন বলেন কোন খবরটা আপনাকে নাড়া দেবে বেশি? করোনার ভয়, নাকি জাগ্রত এলাকাবাসীর ভয়? মৃত্যুকে বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হবে, নাকি এলাকাবাসীর এই আচরণকে?

আমার কাছে দ্বিতীয়টাকেই মনে হয়েছে। এই দুঃখজনক ঘটনাটা ঘটেছে আমার খুব প্রিয়জন সায়েম আহমেদের পরিবারের সাথে। এই পরিবারটি আমার অতি পরিচিত এবং প্রিয়। যিনি রোগী, সেই নজরুল আংকেলের রুমে অনেক রাত থাকা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে এই পরিবারটি আমার সুখ- দুঃখের অনেক কিছুর অংশ। (দুতলা এই বাড়ির নাম 'মাতৃছায়া'। এই বাড়ি এতটাই প্রিয়, এর নাম আমি আমার প্রথম বইয়ে দিয়েছি।)

নজরুল আংকেল করোনা সাস্পেক্ট, এটা শোনার পর থেকেই অস্থির লাগছিল। একান্নবর্তী এই বাসায় অনেকগুলো মানুষ থাকে, সবাই ছিল ঝুঁকির মধ্যে। তার মধ্যে এই বিপদ এসেছে ঈদের আগের দিন। একটা পরিবারের ঈদ শেষ, এটাও পীড়া দিচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। তারমধ্যে শুনলাম জাগ্রত এলাকাবাসীর এই হুংকারের খবর। আচ্ছা, এই যে পুরো একটা এলাকা একটা পরিবারের সাথে এমন অমানবিক আচরণ করল, কারোর বিবেকে একটুও বাঁধল না?

ঈদের আগের রাতে একজন মানুষ নিয়ে একটা পরিবার জমে মানুষে টানাটানি করছে, ভীত হয়ে পড়েছে এই বাসার সবাই। এমন সময় কই সহমর্মিতার হাত বাড়াবে, তা না; নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো বাজারে, নিষিদ্ধ করা হলো মসজিদে। আরে বাবা, তারা তো এমনিতেই ভীত, তারা ভয়ের চোটেই বাসা থেকে বের হতো না। তার মধ্যে এই হুমকি জরুরি ছিল?

আপনি জাগ্রত সচেতন নাগরিক, প্রশাসনকে ফোন করুন। প্রশাসন এসে বাসা লক ডাউন করবে। লক ডাউন করবার একটা মানবিক পন্থা আছে। 'তোরা ঘর থেইকা বাইর হবি না। বাইর হইলে খবর আছে।'- এটা নিশ্চয়ই পীড়িতের প্রতি ন্যায্য আচরণ হতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা, কাউকে নিষিদ্ধ করার অধিকার কে কাকে দিয়েছে?

লক ডাউন থাকলেও কিছু ব্যাপার বাকি থাকে। একটা বাসায় যে মানুষগুলো আটকা পড়ে আছে, তাদের খাবার দাবার জোগাড় করতে হয়। যে রোগী হাসপাতালে পড়ে আছে, তার জন্য কাউকে না কাউকে বাইরে বের হতেই হবে। এই যে এক বাক্যে পুরো পরিবারকে গেটের ভেতর আটকে দেয়া হলো, এই ভাবনাগুলো কারোর মাথাতেই আসল না কেন? মসজিদে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটা আলাদা করে হাইলাইটস করা হয়েছে, মসজিদের শিক্ষা কি এমনটাই? পীড়িতের প্রতি নির্মম আচরণ, সহানুভূতি ছাড়াই খাদ্যবিহীন ঘরে আটকে রাখা?

এই ঘটনা কেবল সায়েমদের সাথে ঘটেছে ব্যাপারটা তা না। আমরা এমন খবর অনেক পেয়েছি। নরসিংদীতে ২০০ মানুষ মিলে প্রবাসীর বাড়ি ভাংচুরের ভিডিও, নারায়ণগঞ্জ এ স্বাস্থ্যকর্মীর বাড়ি আক্রমণ, ঢাকায় ডাক্তারদের লিফট ব্যবহার করতে না দেয়া, ঢাকা ফেরত স্বাস্থ্য কর্মীকে তাল পাতার খোপে নির্বাসন....অনেক অনেক উদাহরণ দেখা গেছে।

রোগীরা অসুখ গোপন করে, হাসপাতাল ছেড়ে পালায়, এমনকি হাসপাতালের ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করে, আর আপনি এককভাবে তাদেরকেই গালি দেন- এটা ঠিক না। এই মানুষগুলোকে এর আগেই হতবিহ্বল করে দেয়া হয়।

শুরুতেই বলেছিলাম জাতির অসুখের কথা। হ্যাঁ, অনেক আরোগ্য অযোগ্য অসুখ চোখের সামনে দিয়ে একে একে বের হচ্ছে। এই যে সমাজ, এই যে মানুষ, এই যে রাজা আর রাজনীতি, এই যে ধর্মের অপব্যবহার...এসব রোগ আর নিষ্ঠুরতা আগে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যেত। এক করোনা একের  ভেতর অনেক কিছুই দেখিয়ে দিচ্ছে। বুঝিয়ে দিচ্ছি আপনি যখন বাটে পড়বেন, এই সমাজ আপনাকে কী কঠিন আর অশ্লীলভাবে আপনার সাথে আচরণ করবে।

এই দেশ নিয়ে আশা আগেও ছিল না, এখন আরো কমে গেল। কোথাও আলো নেই। বিচ্ছিন্নভাবে যে আলো দেখা যায় মাঝে মাঝে, এই আলোর জোর জোনাকির চেয়েও কম শক্তির। গোরস্থানের ভেতরে কিছু কিছু জোনাকির আলো দেখতে ভালো লাগে, খানিকটা কাব্যিকতার সৃষ্টি করে কিন্তু তাতে একটুও অন্ধকার কমে না। (বিশেষ সংযুক্তিঃ ১৫ হাজার টাকায় সৎ ইঞ্জিনিয়ার খুন)

যাই হোক, যে করোনার ভয়ে এতকিছু, আজকে রিপোর্টে দেখা গেল নজরুল আংকেল করোনা নেগেটিভ। সুন্দর-স্পষ্ট লেখায় কর্তৃপক্ষ বলেছে, উনার শরীরে করোনার অস্তিত্ব নেই।

এই যে অতি উৎসাহী জাগ্রত জনতা, যারা দুই দিন আগেও রাতভর এলাকায় মেলা করেছে; তারা এই পরিবারটার প্রতি এই যে অমানবিক আচরণ করল, এদেরকে বাড়তি যে পীড়া দিল, যে দুঃখ আর অভিমানের জন্ম দিল,এর বিচার হওয়া উচিত না? এদের কি ক্ষমা চাওয়া উচিত না এমন আচরণের জন্য? 

এই অসভ্য বর্বর দেশে জন্ম নিয়ে আমি মোটেও গর্বিত না। 'তাহার মাঝে আছে দেশ এক, সকল দেশের সেরা'- এই লাইনটাকে আমি সজ্ঞানে বর্জন করলাম। এই দেশ কোনো অর্থে, কোনো মাপকাঠিতে, কোনো বিবেচনায় সকল দেশের সেরা দূরে থাক, কোনোভাবেই সভ্য হতেই পারে না।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা