করোনাভাইরাস দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমন গুজব ছড়িয়ে পরার পর- 'এটি খুব শীঘ্রই দুর্বল হবে না' বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা! সাথে এটাও জানা যাচ্ছে কীভাবে নীরবে শক্তিশালী হচ্ছে করোনা...

গত কয়েকদিন ধরে নিউজফিডে ঘুরেফিরে একটা খবর শেয়ার হতে দেখছি খুব। করোনাভাইরাস নাকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর ওমনি সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সেটা শেয়ার দেয়ার জন্য। এই খবরের পেছনের ঘটনা হচ্ছে- সম্প্রতি ইতালির মিলানে সান রাফায়েল হাসপাতালের প্রধান আলবার্তো জাংরিলোর দাবী করেছিলেন, করোনাভাইরাস তার শক্তি হারিয়েছে। ক্লিনিক্যালি এ ভাইরাস আর এখন ইতালিতে নেই।    

তার এই মন্তব্যের সত্যতা নেই বলে পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনাভাইরাস খুব শিগগির দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছে না– রীতিমত এমন হুঁশিয়ারিই দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জ্বর, কাশি, স্বাদ গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়া– করোনাভাইরাস সংক্রমনের পর সাধারণত এসব উপসর্গই মানবদেহে দেখা দেয়। কিন্তু এমন সংক্রমিত ব্যক্তিবর্গের খোঁজও পাওয়া গেছে যাদের দেহে কোন উপসর্গই দেখা দেয়নি।

নিজেরাই করোনাভাইরাস বহন করেছেন অথচ সেটা কোনভাবেই টের পাননি। এবং সবচেয়ে আতঙ্কের ব্যাপার- ইতিমধ্যেই অনেকেই নীরবে অন্যদের সংক্রমিত করেছেন, করে চলেছেন। কী পরিমাণ মানুষের মধ্যে এরকম ‘উপসর্গবিহীন’ সংক্রমণ ঘটেছে, এবং এই ‘নীরব বিস্তারকারীরাই’ ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী কিনা, সেটা জানাও এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।  

মিঃ হাইজিন জীবাণুমুক্ত হাতের প্রতিশ্রুতি

গত জানুয়ারি থেকেই নীরবে সংক্রমণ ঘটছে ভাইরাসটির। ঐ মাসের ১৯ তারিখ সিঙ্গাপুরের দ্য লাইফ চার্চ এ্যান্ড মিশন নামের গির্জাটিতে রোববার সকালের প্রার্থনায় যারা জড়ো হয়েছিলেন, তারা কেউ ভাবতেই পারেননি যে এখান থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে। সেদিন সেই প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন এক চীনা দম্পতি।

সেসময় চীনে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা অনেকেই জানতেন কিন্তু সবারই ধারণা ছিলো করোনাভাইরাসে কেউ সংক্রমিত হলে তা বোঝা যাবে তার ঘনঘন কাশি দেখে। ঐ দম্পতিটির দু’জনেরই বয়স ৫৬, দুজনের কারোরই কোন কাশি ছিলো না, অন্য কোন উপসর্গ বা স্বাস্থ্য সমস্যাও ছিলো না। ফলে গির্জা কর্তৃপক্ষের কারোরই তাদের নিয়ে অন্য কিছু ভাবানাতেও আসেনি।

সমস্যা হলো, তারা সেদিন সকালেই সিঙ্গাপুর আসেন চীনের উহান শহর থেকে– যা তখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রার্থনা শেষ হবার সাথে সাথেই তারা চার্চ থেকে চলে গিয়েছিলেন। এরপর তিন দিন যেতে না যেতেই ঘটনা খারাপ দিকে মোড় নিতে শুরু করলো। জানুয়ারির ২২ তারিখে প্রথমে সেই মহিলাটি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আর দুই দিন পর অসুস্থ হলেন তার স্বামী।

পরে এক সপ্তাহের মধ্যে সিঙ্গাপুরের তিনজন স্থানীয় লোক অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কোথা থেকে কীভাবে তারা সংক্রমিত হলেন– কেউ বুঝতে পারছিলো না। এভাবেই সিঙ্গাপুরে করেনাভাইরাস বিস্তারের সূচনা। ‍যাদের দেহে রোগের কোন লক্ষণ নেই, তারা কী করে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে?

কোভিড-১৯ সম্পর্কে তখন তাদের যেটুকু জানা ছিলো, সেই জ্ঞান দিয়ে তারা বুঝতেই পারছিলেন না যে কী করে লোকের মধ্যে রোগটা ছড়াচ্ছে। রোগ সংক্রমণ বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি তদন্ত করে রীতিমত বোকা বনে গেলেন।  কে কখন কবে কোথায় ছিলেন তার একটা মানচিত্র তৈরি করলেন। এটাকেই বলে কনট্যাক্ট ট্রেসিং- যার মাধ্যমে কীভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে তা জানা যায় এবং রোগ বিস্তার ঠেকানো যায়।

বলা হয়ে থাকে সিঙ্গাপুরের তদন্তকারীরা এ কাজে বিশেষ দক্ষ। কয়েকদিনের মধ্যে তার সেই গির্জার ১৯১ জন লোকের সাথে কথা বললেন, এবং বের করলেন যে তাদের মধ্যে ১৪২ জন সেই রোববারের প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন। এটাও বেরিয়ে এলো তার মধ্যে যে দু‌’জন সংক্রমিত হয়েছিলেন– তারা সেই চীনা দম্পতির সাথে একই প্রার্থনায় ছিলেন।

‍এ থেকে একটা ধারণা পাওয়া গেলো কীভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছিলো। কিন্তু যে প্রশ্নের জবাব  পাওয়া গেলো না সেটা হলো- তৃতীয় সংক্রমিত ব্যক্তিটি ছিলেন সিঙ্গাপুরের এক বছর বয়স্ক মহিলা যিনি সেই প্রার্থনায় উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু ওই গির্জাতেই সেদিন অন্য একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাহলে কীভাবে সংক্রমিত হলেন?

সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে তদন্তকারীরা গির্জার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। তা থেকেই বেরিয়ে এলো এক অপ্রত্যাশিত তথ্য। চীনা দম্পতি গির্জা থেকে চলে যাবার পর তারা যে চেয়ারে বসেছিলেন, কয়েক ঘন্টা পর সেই চেয়ারেই এসে বসেছিলেন আক্রান্ত মহিলাটি।

বোঝা গেলো, চীনা দম্পতিটির হয়তো নিজেদের কোন অসুস্থতা বা উপসর্গ ছিলো না– কিন্তু তা সত্বেও তারা না জেনেই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে অন্যদের সংক্রমিত করেছেন। হয়তো তাদের মাধ্যমেই সেখানে ভাইরাসটি ছড়িয়ে ছিলো। এই ঘটনাটা জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

খুব সাধারণভাবে বলা হচ্ছিলো করোনাভাইরাস ঠেকাতে হলে নিজের বা অন্যদের কোন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে কিনা তার দিকে নজর রাখতে হবে। কিন্তু এই ঘটনায় জানা গেলো, কোন উপসর্গ না থাকলেও নীরবে এবং অদৃশ্যভাবে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। একে বলে প্রি-সিম্পটম্যাটিক ট্রান্সমিশন। যখন কারো দেহে কোভিড-১৯ সংক্রমণের লক্ষণসমূহ দেখা দেবার আগেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে শুরু করে।

কেউ যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন তবে ভাইরাসটা শরীরে ঢোকার পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত সময়টায় কোন লক্ষণ দেখা না দিলেও, আক্রান্ত ব্যক্তি ‌অত্যন্ত সংক্রামক‌ বা হয়তো সবচাইতে বেশি সংক্রামক হতে পারেন। এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ– কারণ তাহলে আপনার দেহে উপসর্গ দেখা দেবার সাথে সাথে আপনার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আপনি সতর্ক করে দিতে পারেন যে তাদের এখন ঘরে আইসোলেশনে থাকতে হবে।

সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি দেবার সময় নাক-মুখ দিয়ে যে ড্রপলেটস্ বা অতি ক্ষুদ্র পানির কণা বেরিয়ে আসে তার মধ্যেই থাকে ভাইরাস। কিন্তু যার কাশির উপসর্গ দেখা দেয়নি সে কীভাবে ভাইরাস ছড়াবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কথা বলার সময় বা শ্বাস-প্রশ্বানের মাধ্যমেও ড্রপলেটস্ বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ এ সময়টা শ্বাসনালীর ওপরের অংশেই ভাইরাসগুলো অবস্থান করে এবং প্রতিবার নি:শ্বাস ফেলার সময়ই এগুলো বেরিয়ে আসতে পারে।

কাজেই কাছাকাছি কেউ থাকলে, বিশেষত একই ঘরের ভেতরে, খুব সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। সংক্রমণের আরেকটা বড় উপায় হলো স্পর্শ। কারো হাতে ভাইরাস লেগে থাকলে তিনি যদি আরেকজনের হাত ধরেন, বা দরজার হাতল, টেবিল-চেয়ার বা অন্য কিছু স্পর্শ করেন– তার মাধ্যমেও এটা ছড়াতে পারে।

এই উপসর্গবিহীন সংক্রমণ সংক্রমণের সঠিক ব্যাখাও দিতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ মেরি ম্যালন নামে এক আইরিশ মহিলা। এটা গর শ্তাব্দীর ঘটনা, মেরি ম্যালন নিউ ইয়র্ক শহরের একাধিক বাড়িতে রাঁধুনী হিসেবে কাজ করতেন। তিনি টাইফয়েডের জীবাণু বহন করছিলেন, কিন্তু তার নিজের দেহে কোন লক্ষণ ছিল না।

ফলে এই মেরি ম্যালন নিউইয়র্কের বাড়িতে বাড়িতে টাইফয়েড সংক্রমণ ছড়াচ্ছিলেন– যাতে তিন জন লোকের মৃত্যু হয়েছিলো। ব্যাপারটা নিশ্চিত হবার পর নিউইয়র্কের কর্তৃপক্ষ ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ২৩ বছর আটক করে রেখেছিলো।

ব্রিটেনের কেম্ব্রিজের এ্যাডেনব্রুক হাসপাতালের একজন নার্স এ্যামেলিয়া পাওয়েল এমনই একজন যিনি করোনাভাইরাসের এ্যাসিম্পটম্যাটিক, অর্থাৎ তার দেহে ভাইরাস উপস্থিত থাকলেও এর কোন লক্ষণ ছিলো না। তিনি কতদিন ধরে কোভিড পজিটিভ তাও তিনি জানতেন না। 

একেবারেই ঘটনাচক্রে হাসপাতালের স্টাফদের এক জরিপে অংশ নেবার কারণে তার করোনাভাইরাস টেস্ট করাতে হয়। পরীক্ষায় করোনাভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়ার পর তাকে কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে আইসোলেশনে থাকতে হয়। ঐ জরিপে ধরা পড়ে যে প্রতি এক হাজার লোকের মধ্যে প্রায় ৩ শতাংশ লোকের দেহে করোনাভাইরাস থাকলেও তার কোন উপসর্গ দেখা যায় না।

ডায়মন্ড প্রিন্সেস নামে যে প্রমোদতরী করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে জাপান উপকূলে আটকে রাখা হয়েছিলো, তার ৭০০ যাত্রীর মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই ছিলেন এ্যাসিম্পটম্যাটিক।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ সংক্রান্ত ২১টি গবেষণা প্রকল্পের উপাত্ত পরীক্ষা করে দেখেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক, তার নাম কার্ল হেনেগ্যান। তার মতে, উপসর্গবিহীন কোভিড-১৯ ভাইরাস বহনকারীর অনুপাত ৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করার মতো নির্ভরযোগ্য পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত এখনো নেই।   

চীনের একটি জরিপে দেখা গেছে, উপসর্গবিহীনদের সংখ্যা আসলে উপসর্গ দেখা গেছে এমন কোভিড রোগীদের চেয়ে বেশি। উপসর্গবিহীন কোভড বহনকারীরা হচ্ছেন এই মহামারির 'ডার্ক ম্যাটার', এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। 

এই ডার্ক ম্যাটারই মহামারি জিইয়ে রেখেছে। এ ধরণের উপসর্গবিহীন সংক্রমণের ঝুঁকি এক গভীর প্রভাব ফেলছে। এখন, যখন বিভিন্ন দেশে একে একে লকডাউনজনিত বিধিনিষেধ শিথিল করা হচ্ছে, তখন এই অদৃশ্য ঝুঁকির মোকাবিলা করা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বলা হয়ে থাকে Prevention is better than cure- যেহেতু করোনাভাইরাসের CURE এখনো আমাদের কাছে নেই, সেহেতু আপাতত এটাকে PREVENT করেই বাঁচতে হবে আমাদের। যতটুকু সম্ভব সকল ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা থেকে শুরু করে মাস্ক ব্যবহার করা, নিজেকে এবং চারপাশ জীবানুমুক্ত রাখা– এগুলোই হতে পারে সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা।

হয়তো এগুলোতে ভাইরাস বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হবে না। কিন্তু আমরা ভাইরাসটাকে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি, তাই এর প্রতিশেধক তৈরি না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধ করে যাওয়াটাই জরুরি।  

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতাঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা এবং বিবিসির আর্টিকেল অবলম্বনে 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা