করোনাক্রান্ত দেশগুলো যখন নিজেদের লকডাউন করে রাখছে, আমরা তখন করোনাফেস্টিভাল পালন করছি। যুদ্ধের ডাক দিলেও ঘর থেকে বের হবেন না কেউ, অথচ ঘরে থাকার কথা বললেই বাইরে যাবার জন্য যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেবেন এরা। কোনোভাবেই এই জাতিকে বোঝানে সম্ভব না- মরলে মরো, তবে ছড়িয়ো না।  

কোভিড-১৯ নামের করোনাভাইরাস মহামারিতে যখন গোটা  বিশ্ব স্থম্ভিত, তখন আমরা ব্যাপারটা নিয়ে মজা করেই যাচ্ছি। এমনকি করোনা নিয়ে ঝগড়া করতে গিয়ে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে একজন। ভাইরাস আমাদেরকে মারার আগে, আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে মেরে ফেলছি। করোনাক্রান্ত দেশগুলো যখন নিজেদের লক ডাউন করে রাখছে, আমরা যেন করোনাফেস্টিভাল পালন করছি। কেউবা করোনা রোগী দেখতে ভীড় জমাচ্ছে।

আমরা সমুদ্র দেখতে যাচ্ছি, মনের আনন্দে দেশজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি- এমন ভাব যেন মায়ের পেট থেকেই করোনার ভ্যাক্সিন নিয়ে এসেছেন একেকজন।  যুদ্ধের ডাক দিলেও ঘর থেকে বের হবেন না কেউ, অথচ ঘরে থাকার কথা বললেই বাইরে যাবার জন্য যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেবেন এরা। জনসমাগম- অর্থাৎ যেকোনো রকমের জনসংযোগ বন্ধ করে দেবার ব্যাপারটা যেন বাঙালি মানতেই পারছে না। কোনোভাবেই এই জাতিকে বোঝানে সম্ভব না- মরলে মরো, তবে ছড়িয়ো না।  

বাঙালি এখন যেমন করছে, আমেরিকানরা একশো বছর আগে এমন করেছিলো।  ১৯১৮ সালের কথা, তখন স্প্যানিশ ফ্লুর প্রাদুর্ভাব। পুরো বিশ্বের সংযোগ ব্যবস্থাও এতোটা উন্নত ছিলো না, তবুও সাড়া বিশ্বে ছড়িয়েছিলো সে ভাইরাস। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে ভয়ঙ্কর মহামারি ছিলো সেটা। ৫০ কোটি আক্রান্তের মধ্যে ১০ কোটি মারা গিয়েছিলো সেই স্প্যানিশ ফ্লুতে। এইচ১এন১ স্ট্রেইনের এই ইনফ্রুয়েঞ্জা জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে এ মহামারি ঘটিয়েছিলো। ঠিক এ  ঘরানার বাকী স্ট্রেইনের ফ্লুর প্রাদুর্ভাব চীনেও দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাস চলাকালে। 

আমেরিকা পাত্তাই দেয়নি এ ভাইরাসকে। তারা ভেবেছিলো ইউরোপের ভাইরাসে শুধু ইউরোপিয়ানরাই মরবে। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে একটা প্যারেডের আয়োজন করা হয় ১৯১৮ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর। অথচ তার ঠিক ৯ দিন আগে ১৯শে সেপ্টেম্বর ফিলাডেলফিয়াতে স্প্যনিশ ফ্লু ছড়ানো শুরু করে।

ভাইরাস উপেক্ষা করেই প্যারেডের আয়োজন করা হলো। অংশ নিলো ২ লাখ মানুষ। ফলাফল কী জানেন? ৩ দিনের মাথায় ফিলাডেলফিয়াতে স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হলো ৬৩৫ জন। এ ভাইরাসে আমেরিকার বাকী রাজ্যের তুলনায় ফিলাডেলফিয়ার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো সবচেয়ে বেশি।  ১৯শে সেপ্টেম্বর ভাইরাসের আগমন, ২৮শে সেপ্টেম্বর প্যারেডের আয়োজন, ১ অক্টোবর ৬৩৫ জন আক্রান্ত। তার ছয় সপ্তাহ পর মৃতের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই মহামারিতে আমেরিকার পৌনে সাত লাখ মানুষ মারা গিয়েছিলো। আক্রান্ত হয়েছিলো প্রায় আড়াই কোটি মানুষ।   

বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের ঘোষণা দেয়া হয় ৮ই মার্চ, ২০২০। করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম রোগী মারা যায় ১৮ই মার্চ। আজ ২১শে মার্চ পর্যন্ত- বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩ জন, এর মধ্যে ঝগড়া করে মরেছে ১ জন। এখনো পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ২৪ জন। এটাই আপাতত অফিশিয়াল তথ্য।

জানি এ লেখায় যাদের টনক নড়া দরকার- নড়বে না। না জনগন, না প্রশাসন। কারোই সময় নেই এসব ভেবে দেখার। যে যার মতো নিজের কৃতকর্ম সত্যায়িত করতেই ব্যস্ত। অথচ ১৯১৮ সালের ভাইরাসটাকে যদি আমেরিকা সিরিয়াসলি নিতো, এতোগুলো মানুষ মারা যেত না। ইতিহাস বারবার চোখে আঙুল দিয়েও আমাদের শেখাতে পারবে না। আমাদের কিচ্ছু হবে না- এই এক আজব বিশ্বাসের পিঠের ওপর বসে থাকতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করি আমরা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা