চিকিৎসকের পরিবারের ১৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এলাকাবাসী তাদের বাড়ির সামনে এসে বিক্ষোভ করছে, দাবী একটাই, এদের এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে!

শেষ বিচার বলে কিছু যদি থেকে থাকে, তাহলে সেখানে পৃথিবীর সব দেশের মানুষের হিসেব নেয়া হবে একভাবে, বাঙালীর হিসেব নেয়া হবে আলাদা করে। কারণ জাতি হিসেবে আমরা এত বেশি অসভ্য, বর্বর আর অমানবিক যে, স্বাভাবিক দাঁড়িপাল্লায় আমাদের মন্দ কাজগুলোর পরিমাণ মেপে বের করা সম্ভব না। করোনার ক্রান্তিকালে আমাদের মধ্যেও একদল নিজেদের মুখোশ উন্মোচন করে নিকৃষ্ট চেহারাটা দেখিয়ে দিচ্ছে বারবার। 

সেটারই এক নতুন গল্প লেখা হলো নারায়ণগঞ্জে। সেখানে সিভিল সার্জন অফিসে কর্মরত এক চিকিৎসকের পরিবারের সদস্যদের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর তাদের এলাকাছাড়া করার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় লোকজন। অথচ সেই চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়েই শরীরে ভাইরাস বয়ে এনেছেন, তার পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হয়েছেন তাতে। অথচ পরিণামে মিলেছে হুমকি, ঘৃণা। মানুষের প্রতি মানুষের বিন্দুমাত্র মমত্ববোধ আর সহমর্মিতা থাকলে এমন আচরণ কারো করার কথা নয়। 

নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার শিল্পী আক্তার। ফতুল্লায় একই এলাকায় তার নিজের এবং তার বাবার বাসা। খুব কাছাকাছি হওয়ায় নিয়মিত যাওয়া আসা ছিল সেখানে। সপ্তাহ দু'য়েক আগে তার ভাইয়ের দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। শিল্পী সন্দেহ করছেন, তার ভাই প্রতিদিন দুপুরে বাসা থেকে তার জন্যে খাবার নিয়ে হাসপাতালে যেতো, হাসপাতাল থেকেই কোনভাবে তার মধ্যে ভাইরাসটা ছড়িয়েছে। 

আক্রান্ত হবার পর থেকে তার ভাইকে ঘরে রেখেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল এবং তার বাবার বাড়ি সে সময় থেকেই লকডাউন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন শিল্পী আক্তার। গত বৃহস্পতিবার দুই পরিবারের সবার করোনা পরীক্ষা করা হয়, তাতে মোট ১৭ জনের পজিটিভ রেজাল্ট আসে।শিল্পী আক্তার জানান, এই খবরে তিনি প্রাথমিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েন। কিন্তু তার চেয়েও অবাক হন পরদিন তার পরিবারের প্রতি এলাকাবাসীর আচরণে। শিল্পী বলছিলেন- 

"মঙ্গলবার সকালে হাসপাতাল থেকে গাড়ি আসে পরিবারের আরো কয়েকজনের নমুনা নিতে। তখন প্রায় এক-দেড়শো' মানুষ হাসপাতালের গাড়ি আটকে রাখে। তারা দাবি করে, করোনাভাইরাস আক্রান্ত এই পরিবারকে এই এলাকায় থাকতে দেয়া হবে না। পুরো পরিবারকে এলাকা থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।"

প্রতীকি ছবি

মজার ব্যাপার হচ্ছে, শিল্পী আক্তারের পরিবার ফতুল্লার এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা, এমন নয় যে কয়েক বছর আগে এসে ভাড়া বাসায় থাকছেন। তবুও এলাকার মানুষের এমন আচরণ সইতে হচ্ছে তাদের। হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন রক্তের নমুনা সংগ্রহ করতে এসেছেন, তখন হাসপাতালের গাড়ি প্রায় মিনিট দশেক আটকে মঙ্গলবার সকালে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় লোকজন। শিল্পী আক্তার বলছিলেন, "আমাদের পরিবার নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা। আমরা ভাবতেই পারিনি এখানে আমাদের সাথে এই ব্যবহার করবে কেউ।"

অবস্থা এমনই দিকে যাচ্ছিল যে, সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। সন্ধ্যায় যখন থানা থেকে পরিবারটির খবর নিতে পুলিশ এসেছে, তখনও লোকজন জড়ো হয়ে বিক্ষোভের চেষ্টা করেছে। পুলিশ পরে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিক্ষোভকারীদের বাড়িতে পাঠিয়েছে। 

এই মানুষগুলোর আচরণ পুরোপুরি মধ্যযুগীয় বর্বরদের মতো। এদের ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছে, করোনা বুঝি কোন পাপের ফসল, ক্ষমার অযোগ্য কোন অপরাধ করায় এই পরিবারটির সদস্যরা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন! অথচ ঢাকার পরে নারায়ণগঞ্জেই করোনার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশের মধ্যে এখানেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে। সাবধানে না থাকলে করোনা যে কারো হতে পারে, আর চিকিৎসকদের ঝুঁকি তো সবচেয়ে বেশি, যথাযথ প্রোটেকশন ছাড়াই তারা সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ একজন চিকিৎসকের পরিবারের সদস্যরা সেই করোনায় আক্রান্ত হওয়াতেই এই অমানুষেরা দলবেঁধে তাদের তাড়াতে চাইছেন এলাকা থেকে! 

করোনার এই ক্রান্তিকালে মন ভালো করে দেয়া অজস্র গল্পের জন্ম হয়েছে, তার বিপরীতে এমন অমানবিক আর হৃদয়ভাঙা অনেক গল্পও জমা পড়েছে ঝুলিতে। করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে মাকে গভীর রাতে জঙ্গলে ফেলে গেছে সন্তানেরা, মৃত বাবার লাশ ফেলে শুধু ডেথ সার্টিফিকেট নিয়েই পালিয়েছে ছেলে, কিংবা করোনার আক্রান্ত রোগীদের দেয়ায় ডাক্তার ভাড়াটিয়াকে বাসা ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে বাড়িওয়ালা- এরকম ঘটনা আমরাই ঘটিয়েছি। জানিনা, যাদের আমরা দিনরাত গালাগাল করি, সেই ভারত-পাকিস্তানেও এমন কিছু ঘটেছে কিনা। নিকৃষ্ট নজির স্থাপনের দিক থেকে তো আমরা সবাইকেই ছাপিয়ে যাই বরাবর...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা