ডেক্সামেথাসোন ঔষধটি শুধুমাত্র কৃত্রিম অক্সিজেন সাপোর্টে পাচ্ছে অথবা ভেন্টিলেশনে আছে এমন করোনা আক্রান্ত ক্রিটিকাল রোগীদের জন্য প্রয়োজন। তাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী। না জেনে শুনে হুট করে ডেক্সামিথাসোন প্রয়োগে রোগীর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। জেনে রাখুন- ডেক্সামিথাসন একটা স্টেরয়েড, কোনো ভিটামিন না যে ইচ্ছামত নেয়া যাবে।

এই চলমান পরিস্থিতিতে, পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য কী হতে পারে? অবশ্যই করোনামুক্তি- নিঃসন্দেহে করোনার মেডিসিন! কিছুদিন পরপর সেই একই কথা ঘুরেফিরে আসে আমাদের কাছে। অবশেষে নাকি মিলেছে ‘করোনার ঔষধ’, আর আমরাও ভাবি সকল জল্পনা কল্পনার বুঝি শেষ হলো তবে। এই ধরণী আবারও সুস্থ হয়ে উঠবে। 

বিবিসির একটা রিপোর্ট প্রকাশ হবার সাথে সাথেই শুরু হয়েছে তোলপাড়। সেখানে বলা হয়েছে 'ডেক্সামেথাসোন' নামে সস্তা ও সহজলভ্য একটা ঔষধ নাকি করোনাভাইরাসে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জীবন রক্ষা করতে সাহায্য করবে। এর আগে 'রেমডেসিভির' নামক ঔষধ নিয়ে ঠিক এমনই তোলপাড় হয়েছিলো।

এবার ডেক্সামেথাসোনের শ্রোতে গা ভাসানোর আগে আসুন বোঝার চেষ্টা করি, কী এই ঔষধ এবং কীভাবে এর মাধ্যমে করোনার চিকিৎসা হতে পারে। বিবিসির রিপোর্টে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডেক্সামেথাসোন নামক এই মেডিসিন বেশ কার্যকরী। 

এই মেডিসিন ব্যবহার করলে ভেন্টিলেটারে থাকা রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি এক তৃতীয়াংশ কমানো যাবে। আর যাদের অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার এক পঞ্চমাংশ কমানো যাবে। বিশ্বে এই ঔষধ নিয়ে সর্ববৃহৎ যে ট্রায়াল চলছিলো তার অংশ হিসাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিলো যে এই ওষুধ করোনাভাইরাসের চিকিৎসায়ও কাজ করবে কিনা।

মিঃ হাইজিন জীবাণুমুক্ত হাতের প্রতিশ্রুতি

গবেষকরা অনুমান করছেন ব্রিটেনে যখন করোনা মহামারি শুরু হয়েছে তার প্রথম থেকেই যদি এই ওষুধ ব্যবহার করা সম্ভব হতো তাহলে পাঁচ হাজার পর্যন্ত জীবন বাঁচানো যেত। কারণ ভেন্টিলেশনে থাকা করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য কার্যকরী এবং সহজলোভ্য।  বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় এই ওষুধ বিশালভাবে কাজে লাগতে পারে। এবং যেসব দেশ রোগীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে এটা তাদের জন্য আসলেই বেশ আশা জাগানিয়া খবর। 

উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের জন্যই ডেক্সামেথাসোন সাহায্য করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঔষধ সাধারণত কিছু রোগের ক্ষেত্রে প্রদাহ কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে তখন সেই প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় সাইটোকিন স্টর্ম যেটা প্রাণঘাতী হতে পারে। এই সাইটোকিন স্টর্ম শরীরের ভেতর ইমিউন ব্যবস্থায় এমন একটা ঝড়, যেখানে প্রতিরোধী কোষগুলো বাইরের সংক্রমণ ধ্বংস করার বদলে শরীরের সুস্থ কোষগুলোও ধ্বংস করতে শুরু করে। যার ফলে বিভিন্ন অঙ্গ অকেজো হয়ে যেতে শুরু করে।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টায় মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে তখন শরীরের ভেতর যে ক্ষতিগুলো হয়, এই ওষুধ ডেক্সামেথাসোন সেই ক্ষতি ‘কিছুটা প্রশমন’ করতে পারবে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। 

'ডেক্সামেথাসোন' ​​​​​​নিয়ে করা কিছু টুইট 

ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক তাদের তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই হাজার হাসপাতাল রোগীর ওপর পরীক্ষা চালায়। তাদের ডেক্সামেথাসোন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এদের সঙ্গে তুলনা করা হয় চার হাজারের বেশি রোগীর যাদের চিকিৎসায় এই ঔষধ ব্যবহার করা হয়নি।

দেখা গেছে যেসব রোগী ভেন্টিলেটারে ছিলেন তাদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি এই ওষুধ নেবার ফলে ৪০% থেকে কমে ২৮% এ দাঁড়ায়। আর যাদের অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি ২৫% থেকে কমে আসে ২০%। আর যেসব রোগীকে ‘অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা’ করা হচ্ছে তাদের প্রতি ২০ থেকে ২৫ জনের মধ্যে একজনের জীবন বাঁচানোর সুযোগ তৈরি হয়ে এই মেডিসিনের সাহায্যে।

না জেনে, না বুঝে, 'ডেক্সামেথাসোন' ব্যবহার করবেন না 

তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়ে এটাও জানিয়েছেন, কেউ যেন এই ঔষধ বাজার থেকে কিনে ঘরে মজুত করে না রাখেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেন এই মেডিসিন ব্যবহার না করেন। যাদের করোনাভাইরাসের হালকা উপসর্গ দেখা দেবে, অর্থাৎ যাদের শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে চিকিৎসকের সাহায্যের প্রয়োজন হবে না, তাদের ক্ষেত্রে ডেক্সামেথাসোন কাজ করবে না।

চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য ওষুধ নিয়ে ট্রায়াল চালানো হচ্ছিলো। যেসব ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা চালানো হচ্ছিল তার মধ্যে ছিলো হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। ঐ ঔষধের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে বাতিল করে দেয়া হয়, কারণ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় হার্টের সমস্যা এবং প্রাণনাশের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। 

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঔষধ হচ্ছে রেমডেসিভির, যেটি অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। করোনা থেকে সেরে ওঠার সময়কাল কিছুটা তরান্বিত করতে পারে বলে গবেষনায় নিশ্চিত হবার পর, করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় রেমডেসিভির এর ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সেটাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী।   

ডেক্সামেথাসোন ঔষধটি শুধুমাত্র কৃত্রিম অক্সিজেন সাপোর্টে পাচ্ছে অথবা ভেন্টিলেশনে আছে এমন করোনা আক্রান্ত ক্রিটিকাল রোগীদের জন্য কার্যকর। এবং অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া কোনভাবেই এটা ব্যবহার যাবে না। না জেনে শুনে হুট করে ডেক্সামিথাসন প্রয়োগে রোগীর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। জেনে রাখুন- ডেক্সামিথাসন একটা 'স্টেরয়েড', কোনো ভিটামিন না যে ইচ্ছামত নেয়া যাবে।     

এই ডেক্সামিথাসোনের নিউজটা ভাইরাল হবার পর যে আশংকটা করেছিলাম সেটাই সত্যি হয়ে গেছে। বিবিসির খবর প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথেই নাকি বাজার থেকে ডেক্সামিথাসোন স্টক আউট। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। চিলে কান নিয়েছে শুনলে আমরা 'কান আছে কি নেই' সেটা বিবেচনা না করেই চিলের পেছনে দৌড়াতে থাকি। বরাবরের মতোই এই দৌড়ে আমরাই প্রথম, আমরাই সেরা। পরিশেষে এই সৃষ্টির সেরা জীবদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় পরামর্শ- না জেনে, না বুঝে, 'ডেক্সামেথাসোন' ব্যবহার করবেন না! 

তথ্যসূত্র- বিবিসি, ন্যাচার ডট কম

আরও পড়ুন- করোনার নিয়ে সুসংবাদ: চলুন এবার আশাবাদী হই!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা