বাস্তবতা ভুলে যাওয়া, দাম্ভিক, নীতিহীন জাতির ওপর যে অভিশাপ যুগে যুগে নেমে এসেছে তার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি। যদি করোনা মাফ করেও, দুর্ভিক্ষ করবে কিনা কে জানে। সেটাও যদি করেও, আসছে পঙ্গপাল, আসছে ভূমিকম্প।

করোনায় যখন বিশ্বে কাঁপছে, বাংলাদেশে তখন...

১। স্কুল-কলেজ বন্ধ দেয়ার পরদিনই দেশের সব কটা পর্যটন কেন্দ্রে ছিল উপচে পড়া ভীড়। একদম ঈদের ছুটিতে যেমন থাকে তেমন। ঘোষণার সাথে সাথে ঢাকার আশেপাশের সব রিসোর্ট বুকড হয়ে গেছে। অথচ স্কুল-কলেজ বন্ধ করে শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির করে দেবার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মানুষ ঘরে বসে থাকবে। মেইনটেইন করবে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স।

২। প্রবাসীদের অনেকেই এসেছেন মৃত্যুপুরি থেকে। দেখেছেন কীভাবে অবরুদ্ধ হয়েছে একেকটা উন্নত দেশ। বাতাসের মতো কীভাবে ছড়াচ্ছে অসুখ। অথচ দেশে এসে তারা কেউ হোম কোয়ারেন্টাইন মানছেন না। বউ-প্রেমিকাকে বাইকে বসিয়ে শহর ঘুরছেন, গরু পালছেন, বন্ধুর সাথে আড্ডা দিতে উঠছেন পাবলিক ভার্সিটির হলে। এক ফ্রান্স প্রবাসী তো ইতিহাস করে ফেলেছেন। হোম কোয়ারেন্টাইন এর সময়ে বিপুল উৎসব মুখর পরিবেশে করে ফেলেছেন বিয়ে। যারা বিদেশ ঘুরল, মৃত্যুকে পার করে এলো...তারাই নিজের পরিবার ও জাতিকে বিপদে ফেলতে ভাবছে না।

৩। ওয়াজ মাহফিল থেকে এক শ্রেণীর বক্তা এখনো পর্যন্ত করোনাকে বিধর্মী ও কাফেরদের ওপর গজব থিওরি বলেই চলেছেন। ইচ্ছেমতো তথ্য বিকৃতি ও বিভ্রান্তিকর ওয়াজ করেই চলেছেন তারা। এক শ্রেনীর আলেম একই কাজ করছেন ফেসবুকেও। কেউ কেউ রীতিমতো অস্বীকার করছেন করোনার উপস্থিতি। আসছে স্বপ্ন তত্ত্ব, আসছে কোড। হ্যাঁ, সময়োপযোগী বক্তব্য দিচ্ছেন কেউ কেউ; কিন্তু এমন আলেমের কথা আম জনতা পর্যন্ত যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের ছেলে মেয়েদের প্রথম শিক্ষক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব আলেম উলামারা। তাদের দায়িত্বশীল আচরণ এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের অনেক বড়ো পাথেয় হতে পারত। আজকে তো রীতিমতো ইতিহাস হয়ে গেল৷ প্রায় লক্ষাধিক জনসমাগম ঘটিয়ে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে লক্ষিপুরে। অথচ আরব বিশ্বসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশ মসজিদ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে করোনা সতর্কতার জন্য।

৪। সাম্প্রতিককালে করোনা একমাত্র সাম্যবাদী দুর্যোগ যেটা আমির-ফকিরকে এক কাতারে টেনে আনছে। অনেক দেশের রাষ্ট্র প্রধান সহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবীদরা আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়। আম জনতার চেয়ে দেশের মন্ত্রীবর্গের এসব জানার কথা ছিল বেশি। জানেন হয়তো তারা। তারপরও মুখে লাগাম আসেনি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য- 

"করোনা বড়ো কিছু না। সর্দি জ্বরের মতো সামান্য অসুখ"

"যে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম শেখ হাসিনা, সে দেশের মানুষের করোনার ভয় নেই"

"বিএনপি দেশের মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে ভীতি ছড়াচ্ছে"

"উন্নত বিশ্বের চেয়ে আমাদের প্রস্তুতি ভালো"

১৭০০ কিট আর ২৪৫ টা আইসিইউ নিয়ে উন্নত বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ!

তালি হবে, তালি হবে, তালি হবে।

৫। মুজিব বর্ষে সাত টন আতসবাজি আনা হল ভারত থেকে। বিশ্ব যখন স্তব্ধ, আমরা তখন আতশবাজি ফুটালাম। সেটা দেখার জন্য কয়েক হাজার মানুষ ঢাকার রাস্তা দখল করল। কোথায় জানি আতশবাজির আগুনে পুড়ে গেল একটা মার্কেট। কে জানে, ইতিহাস একদিন হয়তো ঘেন্না ভরে বলবে; সারা বিশ্ব যখন পুড়ছিল... বিশ্বের বিস্ময় একটা জাতি তখন আতিশবাজি করছিল।

৬। এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি বিপদে আছেন ডাক্তাররা। বিপদের ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়ার কথাও ডাক্তারদেরই। সেই ডাক্তারদের মধ্যে একজন কয়েক দিন আগে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, এদেশে করোনা আসবে না। তিনি বৈজ্ঞানিক ব্যাখা পর্যন্ত দিয়েছিলেন। সেই ডাক্তার এখনো ভুল স্বীকার করে কিছু বলেননি। একজন এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর একই রকম ভুল তত্ত্ব দিয়ে পোস্ট করেছিলেন ফেসবুকে৷ তার ভুল ধরিয়ে দেবার পর তিনি রেগে মেগে বলছেন, ভাইরাসকে তিনি ভয় পান না। ভাইরাসের জনক আল্লাহকে ভয় পান৷ করোনা নিয়ে তার কোনো টেনশন নাই। দুজন না, আছেন আরো বহু ডাক্তার। সারা বিশ্বের ডাক্তারদের ত্যাগ এবং এদেশের ডাক্তারদের ওপর আসন্ন বিপদকে তারাই আমলে নিচ্ছেন না।

৭। করোনার প্রথম কেস কনফার্ম হবার পরেই মাস্কের দাম চলে গেছে আকাশে। গায়েব হয়ে গেছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। ব্যবসায়ী ও পয়সাওয়ালা উভয় পক্ষ শুরু করেছেন স্টক। একেকটা বিপদ মানেই ব্যবসা, ব্যবসা হবে। পয়সা আসবে৷ আহা!

সাতটা পয়েন্ট বললাম। বিচ্ছিন্নভাবে আরো অনেক পয়েন্ট নিয়ে বলা যাবে। এই দুইটা জিনিস খেলে করোনা থাকবে, ক তে এই রো তে সেই, থানকুনি পাতা, জাফর ইকবাল ও খালেদা জিয়া নিয়ে ট্রল, করোনা নিয়ে হাজারটা মেম....বাদ দিই। কাজের কথায় আসি। উপরের সব পয়েন্ট ভুলে যান। মনে করুন আমাদের দেশের সকল মানুষ শুদ্ধ হয়ে গেছে। সবাই মানে সবাই।

বিশ্বের মধ্যে আমাদের দেশের সরকার আচমকা সবচেয়ে সেরা হয়ে গেল। তারা যা যা করা উচিত তার একশ ভাগ করল। আমাদের দেশের জনগণ সবাই সচেতন হয়ে গেল৷ ব্যবসায়ীরা বলল, আমরা আগামী তিন মাস বিনা লাভে ব্যবসা করব। তাতে আমাদের করোনা মোকাবেলায় প্রস্তুতি কতটা হবে জানেন? ১০%। বেড়ে ১৫% হতে পারে, আবার কমে ৫% ও হতে পারে৷

করোনায় জনসমাগম নিষিদ্ধ হবার কথা, অথচ চলছে ওয়াজ-মাহফিল!

আপনি উন্নত বিশ্বকে দেখুন। তাদের অর্থনীতি, সরকার, সুবিধা, নৈতিকতার পরও আক্ষরিক অর্থে অসহায় হয়ে পড়েছে তারা। স্বাস্থ্য বিভাগ থমকে পড়ছে। টাকা দিয়েও নতুন ভ্যান্টিলাইজার পাওয়া যাচ্ছে না। আইসিইউ পাচ্ছে না অধিকাংশ মানুষ। আমেরিকার মতো পরাশক্তি...দুনিয়া যারা শাসন করে তার প্রেসিডেন্ট বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশ্বে মারা গেছে ৮০০০ মানুষ। আমেরিকায় মাত্র ১০০। ১০০ জন মারা যাওয়া দেশের প্রেসিডেন্ট, যিনি অলিখিতভাবে বিশ্ব প্রেসিডেন্টও...তিনি যদি বলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাই তবে পরিস্থিতি কোথায় আছে ভাবতে পারেন?

আমাদের দেশ গরীব। অনুন্নত। প্রতি কিলোতে মানুষ বাস করে ১৫০০ জন। ১৮ কোটি মানুষের দেশে সরকারি আইসিইউ আছে ২৪৫। সাড়ে ৭ লাখ মানুষের জন্য একটা। পাবেন সিট? বিশ্বের একেকটা দেশে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ১৭০০ কিট দিয়ে সেই হিসেবে একদিনও চলে না। বাকি দিন কী হবে? আমাদের দেশের বাস্তবতায় আমরা প্রতিদিন দুর্যোগের মধ্যে কাটাই। ঢাকা বিশ্বের টপ টু বাস অযোগ্য শহরের একটা। পরিবেশ সূচকের সকল মানে আমরা যুদ্ধকালীন কিছু দেশের চেয়েও নিচে আছি।

আমাদের দেশের একটা বিশাল শ্রেণীর মানুষ দিনে আনে, দিনে খায়। উন্নত বিশ্বের মতো দেশের সব মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না। পেটের দায়ে বের হওয়া মানুষ থেকেই ছড়িয়ে পড়বে ভাইরাস। এমন একটা গজব কী অবস্থার সৃষ্টি করবে অনুমান করা যায় না?

আচ্ছা এক বারের জন্য ভুলে গেলাম সব। ধরে নিলাম করোনায় আমাদের দেশের কেউ মরবে না। এটা বিধর্মীদের ওপর গজব, এটা সত্য। আমাদের দেশে কিছুই হবে না। তাতে আমরা নিরাপদ? না। তখনো আমরা মরব। তখন করোনায় মরব না, মরব দুর্ভিক্ষে। কিছুদিন আগে ভারত পেয়াজ বন্ধ করায় কেজি চলে গিয়েছিল ২০০ তে। ভুলে গেছ গোল্ড ফিশ বাঙালি? ভারতের দুইটা রাজ্যের বন্যায় আমাদের কড়াই থেকে পেয়াজ হারিয়ে গিয়েছিল। এবার পুড়ছে সারা বিশ্ব।

এই যে কান্ট্রি লক, কান্ট্রি লক বলি...এর মানে কী? মানে হচ্ছে ধীরে ধীরে বিদেশ থেকে পণ্য আসা যাওয়া বন্ধ হবে। চীন-ভারত-ইউরোপ আমদানির সবচেয়ে বড়ো বাজার। চীন থেকে পণ্য আসা কমে গেছে। বেড়ে গেছে প্রতিটা চাইনিজ পণের দাম। পেয়াজের মতো করে ভারতও তার সমস্ত রপ্তানী পণ্য বন্ধ করে দিতে পারে। তার দেশের মানুষ ১৫০ কোটি। এদেরকে তো আগে বাঁচাতে হবে, নাকি?

একই প্রক্রিয়ায় চাল আসা বন্ধ হবে, ডাল আসা বন্ধ হবে, আলু আসা বন্ধ হবে। এমন বন্ধ হবে মেডিকেল একিউপমেন্ট আসাও। সব কটা দেশ এখন ভীষণ স্বার্থপরের মতো আচরণ শুরু করবে। তাদের নাগরিকের মূল্য আগে, জীবন আগে। তারাই সামাল দিতে পারছে না, আমাদের দেবে কী? সুতরাং ঔষধের দাম বাড়বে। বাড়বে সার্জিক্যাল সব সামগ্রীর দাম। করোনা ছাড়াও আমাদের নিত্য দিনের যে সব অসুখ বিসুখ, তাতেই বিনা চিকিৎসায় মারা যাব আমরা।

তাতেও শেষ না। বিশ্বের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে এই কয়েকদিনে। স্টক মার্কেট ১৯৮৭ সালের পর সবচেয়ে বড় দরপতন দেখেছে। এর মূল্য দিতে হবে আমাদের দেশের মতো গরীব দেশগুলোকে। করোনার চলে যাবার পর সব কটা দেশ তাদের রিকনস্ট্রাকশন শুরু করবে। বেকার হয়ে যাওয়া নিজেদের লোকদের কাজ দিতে গিয়ে আমাদের দেশের লোকজনকে পত্রপাঠ বিদেয় করবে না, তার নিশ্চয়তা কী?

উপরের সাতটা পয়েন্ট আবার রিভিউ করুন। একটা জিনিস পরিস্কার, এদেশের মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় না। না, বীর বলে ভয় পাচ্ছে না এমন কিছু না। এরা মৃত্যুকে ভুলেই গেছে। অহংকার, দাম্ভিকতা এমন পর্যায়ে চলে গেছে, নিজেদের নিয়ে গেছে অমর পর্যায়ে। মানব সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাস বলে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। না ব্যক্তিকে, না জাতিকে। বিশ্ব অসভ্য অবস্থায় চলে এসেছে। বিশ্বের সাপেক্ষে কয়েক শত গুণ বেশি অসভ্য হয়েছি আমরা। খোদার গজব হোক আর প্রকৃতির প্রতিশোধ হোক, আমাদের ওপর চলে আসার সময় বোধহয় হয়ে গেল।

বাস্তবতা ভুলে যাওয়া, দাম্ভিক, নীতিহীন জাতির ওপর যে অভিশাপ যুগে যুগে নেমে এসেছে তার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি। যদি করোনা মাফ করেও, দুভিক্ষ করবে কিনা কে জানে। সেটাও যদি করেও, আসছে পঙ্গপাল, আসছে ভূমিকম্প। এই যে এত অহংকার, এত নীতিহীনতা, এত দাম্ভিকতা, গজব সামনে দেখেও ভয় না পাওয়া... খোদা বা প্রকৃতি আমাদের ছাড়বে কেন?

করোনা নিয়ে আশা করছি এটাই আমার শেষ পোস্ট। সময় নিয়ে, মগজ গরম করে জাতিকে জ্ঞান দিয়ে কোনো লাভ নেই। তারচেয়ে নিজের পরিবার ও বন্ধু-স্বজনদের সময় দেব। গতকালকে থেকে ক্লোজ মানুষদের খোঁজ নেয়া শুরু করেছি। বিপদ থাকা অব্দি এটা চলমান থাকবে। সাবধান যা করার, নিজের প্রিয়জনদেরই করি। যারা করোনাকে সত্যিই বিপদ ভাবছেন, তারাও এটাই করুন। পাবলিককে সচেতন করতে গিয়ে লাভ নেই। এদেশের ৭০% মানুষ আসন্ন মহামারীতে মারা যাওয়া ডিজার্ভ করে।

নিজের কাছের মানুষদের সময় দিন। প্রার্থনা করুন দেশের ভালো ও বিবেচক মানুষগুলো যেন এই বিপদ থেকে রক্ষা পায়। বিশ্ব যেন এই শিক্ষা নিয়ে দাঁড়াতে পারে সভ্যভাবে। পোস্টটায় কাউকে ট্রল করলাম না, গালি দিলাম না। কারো প্রতি ক্ষোভ বা দুঃখও নেই৷ জাতি হিসেবে কোনো গজব না আসুক। ব্যক্তি হিসেবে যার যা প্রাপ্য, সে যেন তাই পায় এই কামনা থাকল।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা