মহানবী (সা) কে কার্টুনে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে, এমন অভিযোগে দুই বন্দুকধারী গুলি করে হত্যা করেছিল বারোজনকে, এরমধ্যে ছিলেন শার্লি এব্দো পত্রিকার সম্পাদক ও আটজন কার্টুনিস্ট। পশ্চিমা বিশ্বে আজকের ইসলামোফোবিয়ার একটা বড় কারণ শার্লি এব্দোর সেই হামলা...

৭ই জানুয়ারী ২০১৫, ভয়াবহ এক হামলায় কেঁপে উঠেছিল প্যারিস। ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন শার্লি এব্দোর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গীরা, ভয়াবহ সেই হামলায় নিহত হয়েছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক, প্রধান কার্টুনিস্ট, আটজন কার্টুনিস্ট সহ মোট বারোজন কর্মকর্তা। এর আগের এক দশকে এতটা ভয়াবহ হামলা প্রত্যক্ষ করেনি ফ্রান্সের মানুষ। আচমকাই যেন রোমান্টিক নগরী, ভালোবাসার শহর প্যারিস রূপ নিয়েছিল আতঙ্কের এক নগরে। হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত শরিফ কাউচি (৩২) ও সাইদ কাউচি (৩৪) দুইদিন পরে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলে এক অভিযানে নিহত হয়েছিল, এরা দুজন সম্পর্কে ছিল আপন ভাই। 

দীর্ঘ তদন্ত শেষে কয়েকদিন আগেই সেই হামলার বিচারকাজ শুরু হয়েছে। শার্লি এব্দোর সদর দপ্তরে সেই হামলাটা ছিল কাউচি ভাইদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ধর্মের নামে মানুষ খুনের রাস্তা বেছে নিয়েছিল তারা। ধারণা করা হয়, এই দুজনকে পেছন থেকে সাহায্য করেছিল জঙ্গী গোষ্ঠী আল কায়েদা। পত্রিকা অফিসে গুলি চালানোর পর পালিয়ে যাওয়ার আগে বারান্দা থেকে চিৎকার করে বন্দুকধারী দুজন বলেছিল, মহানবীকে অপমান করার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যেই তারা এই হামলা চালিয়েছে। 

মহানবীকে অপমান? হ্যাঁ, শার্লি এব্দোর কার্যালয়ে নৃশংস এই হামলার পরে এই দুটো শব্দই বারবার আলোচনায় এসেছে। শার্লি এব্দো হচ্ছে মূলত ব্যাঙ্গধর্মী একটা ম্যাগাজিন। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নানা অসঙ্গতি নিয়ে তারা কার্টুন আকারে ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশ করে থাকে। ফ্রান্সে এই ম্যাগাজিনটি দারুণ জনপ্রিয়। তাদের স্যাটায়ার থেকে ফ্রান্স বা আমেরিকার প্রেসিডেন্টও বাদ যান না। আর যেহেতু সেখানে বাকস্বাধীনতার চমৎকার একটা চর্চা আছে, কাজেই কার্টুন আঁকার কারণে কাউকে জেলেও যেতে হয় না। 

হামলাকারী দুই ভাই, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া ছবি

২০১১ সালে শার্লি এব্দোতে মহানবী (সা) কে নিয়ে ব্যাঙ্গধর্মী কয়েকটা কার্টুন ছাপা হয়েছিল। এগুলো অবশ্য শার্লি এব্দোর কার্টুনিস্টরা আঁকেননি, ২০০৫ সালে কার্টুনগুলো ছাপা হয়েছিল ডেনমার্কের একটা পত্রিকায়। শার্লি এব্দো সেগুলোকেই রিপাবলিশ করেছিল। তখন মৌলবাদী কয়েকটা গোষ্ঠী হুমকি দিয়েছিল তাদের অফিসে ফোন করে। তবে শার্লি এব্দোর কর্তৃপক্ষ বা প্যারিসের পুলিশ সেই হুমকিটাকে খুব একটা সিরিয়াসলি নেয়নি। মৌলবাদীরা কিন্ত ঠিকই হামলা চালিয়েছিল, শার্লি এব্দোর কয়েকটা কার্যালয়ে তখন হামলা চালানো হয়। যদিও কেউ নিহত হননি সেসব হামলায়। 

শার্লি এব্দোর সেই কার্টুন নিয়ে তখন তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে চারদিকে। কেউ বলেছে ধর্ম নিয়ে এভাবে ব্যাঙ্গ করাটা উচিত নয়। বেশিরভাগ মানুষ আবার শার্লি এব্দোর পাশে দাঁড়িয়েছে, তারা বলেছে, সমালোচনা করার অধিকার, কথা বলার অধিকার সবার আছে, কারণ তারা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আরেকটা যুক্তি ছিল, শার্লি এব্দো শুধু মুসলমানদের নবীকেই ব্যাঙ্গ করছে- ব্যাপারটা তো এমন নয়। ক্যাথলিক খ্রিস্টান, ইহুদি- কেউই তাদের ব্যাঙ্গ থেকে রেহাই পায়নি। তারা মহানবীকে নিয়ে যেমন কার্টুন বানিয়েছে, তেমনই যীশু খ্রিস্টকে নিয়েও বানিয়েছে। শার্লি এব্দোর সম্পাদক তখন বলেছিলেন, "আমরা ফ্রান্সে থাকি, সৌদি আরবে না। এখানে ফরাসী আইন চলে, শরীয়া আইন নয়।" 

শার্লি এব্দোর সদর দপ্তরের বাইরে আঁকা নিহতদের ক্যারিকেচার

২০১৫ সালে শার্লি এব্দোর প্রধান কার্যালয়ে হামলা হলো, সাময়িকীর সম্পাদক স্টেফানি শার্বনিয়ার যিনি শার্ব নামে বেশি পরিচিত ছিলেন, তিনি এবং আরও চারজন কার্টুনিস্ট নিহত সেই হামলায়। সম্পাদকের দেহরক্ষী এবং একজন পুলিশ অফিসারও হামলায় নিহত হন। ঘটনার দুইদিন পরে পুলিশের হাতে নিহত হয় হামলাকারী দুই ভাই। তবে এরই মাঝে কাউচি ভাইদের পরিচিত একজন প্যারিসেরই একটা শপিং মলে হামলা করে, এটাও তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল। সেই হামলায় চারজন নিহত হয়। সেই হামলাকারীর নাম ছিল আহমেদী কুলিবালি। 

গোটা প্যারিস স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল এই হামলার ঘটনায়। মেধাবী কার্টুনিস্টদের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি ফ্রান্সের মানুষ। ইউরোপ বা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় আজ যে ইসলামোফোবিয়া দেখা যায়, দাঁড়ি-টুপি দেখলেই অনেকে মুসলমানদের জঙ্গি ভাবে- এসবের পেছনে শার্লি এব্দোর সেই হামলার বড় একটা ভূমিকা আছে। ফ্রান্সের মানুষজন বেশ শান্তিপ্রিয়, তারা সবসময় ভেবেছে যুক্তির বিপরীতে পাল্টা যুক্তি আসবে, কেউ কাউকে ব্যাঙ্গ করলে সেটা নিয়ে আলোচনা হবে, সমালোচনা হবে। কিন্ত একটা কার্টুনকে কেন্দ্র করে যে কেউ হাতে বন্দুক তুলে নিতে পারে, বারোজন মানুষকে খুন করে ফেলতে পারে- এরকম কিছু প্যারিস কখনও দেখেনি, দেখবে বলে কল্পনাও করেনি। 

আলাদা দুটি হামলায় মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে তারা বন্দুকধারীদের অস্ত্র এবং অন্যান্য সহযোগিতা করেছে। হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এবং আইনজীবী মিলিয়ে প্রায় ২০০ ব্যক্তি এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন। এই মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়া উপলক্ষ্যে শার্লি এব্দো বিতর্কিত সেই কার্টুনগুলো আবার প্রকাশ করছে তাদের প্রিন্ট এবং অনলাইন ভার্সনে। গত কয়েক বছরে অনেকেই তাদের অনুরোধ করেছিলেন সেগুলো রিপাবলিশের জন্য। তবে শার্লি এব্দো জানিয়েছে, তারা একটা বিশেষ দিনের অপেক্ষায় ছিলেন, যেহেতু বিচারের কাজ শুরু হচ্ছে, এই দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতে গত পরশু এই কার্টুনগুলো পুনরায় প্রকাশ করা হয়েছে। 

সেই ন্যাক্কারজনক হামলার পরে দুনিয়াজুড়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ঝড়

শার্লি এব্দোর এই সিদ্ধান্তের পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন করে এই কার্টুনগুলো প্রকাশ করা কতটা যুক্তিযুক্ত? কারও মতে নতুন করে বিতর্ক উস্কে না দিলেই ভালো হতো। আবার কেউ বলছেন, কার্টুন যদি কারো খারাপ লাগে, সেটা নিয়ে সমালোচনার দ্বার তো খোলা থাকছেই। বিষয়টা এত বেশি আলোচিত হয়ে উঠেছে যে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর দিকেও এই বিষয়ে প্রশ্ন ছুটে গেছে। ম্যাক্রো সরাসরি মন্তব্য না করে বলেছেন- "এমন কিছু করা উচিত নয়, যা অন্যের ভাবাবেগে আঘাত দেবে। কিন্তু শার্লি এব্দোর কার্টুন নিয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না। গণতান্ত্রিক দেশে সকলের মত প্রকাশের অধিকার আছে। গণতন্ত্রকে সম্মান করাই সব চেয়ে বড় বিষয়।"

একই অভিমত ফ্রান্সের বেশিরভাগ মানুষের। তাদের কথা হচ্ছে, পত্রিকাটির মত প্রকাশের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই। কিন্তু নতুন করে বিতর্কিত কার্টুনটি প্রকাশ করলে যে আবারও উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, এমনকি আবারও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে- সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই শার্লি এব্দোর প্রধান কয়েকজন কর্মকর্তা ও কার্টুনিস্টকে পুলিশের তরফ থেকে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে বলে খবর প্রকাশ করেছে কয়েকটি গণমাধ্যম। 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা