এ এক অসম যুদ্ধ, যেখানে একজন লড়েছে ৪৭৬ জনের বিপক্ষে, দশ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে একুশ জন! সিনেমা মনে হচ্ছে? ব্যাটেল অফ সারাগারহি'র এই সত্যি ঘটনাটা সিনেমার চেয়েও নাটকীয়!

গেম অব থ্রোন্স এর 'ব্যাটল অব দ্য বাস্টার্ডস' এপিসোডের কথা মনে আছে? হাজারে হাজারে সৈন্য ছুটে আসছে, এদিকে তলোয়ার উচিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছে নেড স্টার্কের 'বাস্টার্ড' পুত্র 'জন স্নো'। একাই শুইয়ে দিয়েছিলেন হাজার সৈনিককে তিনি। টিভি অথবা সিনেমার পর্দাতেই এসব ঘটনা সত্যি হয়। অথবা গল্পের বইতে। বাস্তবে এসব সত্যি হয় না। না, ভুল বললাম। বাস্তবেও হয়। ইতিহাসে এরকম ঘটনারও নজির আছে, যেখানে একুশজন যোদ্ধা মুখোমুখি হয়েছিলেন দশ হাজার সৈন্যের। নড়েচড়ে বসতে পারেন। মূলগল্পে এখনই ঢুকছি। 

সময়টা উনিশ শতকের শেষ দিকে। আর ক'দিন পরেই বিংশ শতাব্দী শুরু হবে। এই সময়টাই হুট করে উত্তাল হয়ে ওঠে। মধ্য এশিয়ার দখল নিয়ে বিরোধে জড়ায় দুই দেশঃ ব্রিটেন ও রাশিয়া। ১৮৩০ সাল থেকেই মোটামুটি বিরোধ ছিলো দুই দেশের। শতাব্দীর শেষ সময়ে এসে সে বিরোধ আরো মারাত্মক আকার ধারণ করে, যে সময়কে ডাকা হয় 'দ্য গ্রেট গেম' নামেও। যুদ্ধ শুরু হয় ব্রিটেন আর রাশিয়ার মধ্যে।  ভৌগোলিকভাবে এই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ 'হটস্পট' হয়ে ওঠে আফগানিস্তান। যুদ্ধের দুই শিবির অর্থাৎ ব্রিটেন ও রাশিয়া, দুপক্ষের জন্যই তাই আফগানিস্তানের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি হয়ে ওঠে। ভারত-আফগানিস্তান সীমান্ত হয়ে ওঠে তাই সংবেদনশীল এক জায়গা। 

ভারত-আফগানিস্তানের এই সীমান্তের কিছু কিছু অংশ ছিলো খুব দুর্বল। ব্রিটিশদের নিরাপত্তাও খুব একটা শক্তপোক্ত ছিলোনা সেসব জায়গাতে। এরকমই এক জায়গার নাম- সারাগারহি। বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের তিরাহ উপত্যকায় ছিল এই ঘাঁটি। লকহার্ট ও গুলিস্তান নামের দু’টি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান দুর্গের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখাই ছিলো যে ঘাঁটির কাজ। 

১৮৯৭ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর সেদিন। পরিষ্কার নীল আকাশ। আশেপাশে কোনো ঝঞ্জাটের চিহ্নমাত্র নেই। সারাগারহি ঘাঁটিতে তখন পাহারা দিচ্ছিলো ২১ জন শিখ সৈনিক। সব ঠিকঠাকই যাচ্ছিলো। হঠাৎ ক্যাপ্টেন হাবিলদার ঈশার সিং ও সিগন্যালম্যান গুরুমুখ সিং দেখলেন, দূরে ধুলো উড়ছে। আর কালো কালো কী যেন আসছে। কাছে আসতেই বোঝা গেলো হাজারে হাজারে ব্রিটিশবিরোধী আফ্রিদি ও ওরাকজাই সৈন্য রনসজ্জায় সমবেত হয়েছে কাছের পাহাড়গুলোতে। বোঝা গেলো- সারাগারহি আক্রমণ করতেই আসছেন তারা। 

সারাগারহির বীরেরা

গুরুমুখ সিং দিশেহারা হয়ে গেলেন। তাদের সব সৈন্যকে এ্যালার্ট করলেন। এরপর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জন হফটনকে টেলিগ্রাফে বার্তা পাঠালেন-

ENEMY APPROACHING THE MAIN GATE… NEED REINFORCEMENT.

হফটন জবাব পাঠালেন, 

UNABLE TO BREAKTHROUGH…HOLD POSITION. 

এদিকে শত্রুরা ঘিরে ফেলেছে ঘাঁটি। হাবিলদার সিং বুঝলেন, সাহায্য পাওয়ার আশা নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর পাঠালেন-

UNDERSTOOD.

কর্নেল হফটনকে দোষ দেয়াও যাবেনা। ব্যাকআপ পাঠানোর জন্যেও কিছু সময় দরকার। তাছাড়া হাজারে হাজারে সৈন্য একটুখানি দুর্গকে দখল করার জন্যে আসবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। কল্পনা করেননি তিনিও। বোঝাই যাচ্ছিলো, শিখদের মৃত্যু আজ স্বয়ং বিধাতাও ঠেকাতে পারবেন না। 

সামনে ১০-১২ হাজার আফগান সেনা (এ সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ আছে। অনেকে বলেন, সেদিন আফগান সৈন্য ছিলো বিশ হাজার। সঠিক সংখ্যা বের করা তাই ঝামেলার খানিকটা। তবে সবচেয়ে কম সংখ্যা যেটা, সেটা দশহাজার। তর্কের খাতিরে সবচেয়ে কমটাই ধরে নেয়া তাই সমীচীন)। তাদের  মুখোমুখি ব্রিটিশ আর্মির ৩৬ তম রেজিমেন্টের (বর্তমান ইন্ডিয়ান আর্মির ৪র্থ ব্যাটেলিয়ন) মাত্র ২১ জন শিখ সৈনিক! এক অসম যুদ্ধের অশনিসংকেত বেজে উঠলো সারাগারহিতে। 

যুদ্ধ শুরু হলো। শিখরা পারতেন পিছুটান দিতে। পালিয়ে যেতে। সুযোগ ছিলো। কিন্তু শিখরা ছোটবেলা থেকেই একগুঁয়ে, সাহসী ও নির্ভীক। নিজেদের সম্মান বাঁচানোর জন্যে তারা জীবন দিতেও পিছপা হয়না সাধারণত। কর্নেল হফটনের সেনা প্রস্তুত করে পাঠাতে কিছু সময় লাগবে, তা বোঝা যাচ্ছিলো। এই একুশজন শিখ যোদ্ধা তাই চেষ্টা করতে লাগলেন, কীভাবে শত্রুদের ব্যস্ত রাখা যায়। সময় নষ্ট করা যায়। 

কিন্তু খুব বেশিক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া গেলোনা। শিখ যোদ্ধাদের রসদও ছিলো কম। আর দশ হাজার সৈন্যের সাথে একুশজন যোদ্ধাকে সিনেমায় পর্দাতে জেতাতে হলেও স্ক্রিপ্ট রাইটারকে একগাদা গালি শুনতে হতো। আর এ তো বাস্তব! কয়েক ঘন্টার মধ্যেই গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেল। মারা গেলেন সিপাহী ভগবান সিং সহ আরো কয়েকজন।

যেহেতু গোলাবারুদ শেষ। শিখ যোদ্ধারা তখন হাতাহাতি যুদ্ধের জন্যে কৌশল করে দুর্গের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়লেন।  হাতাহাতি যুদ্ধও চললো বেশ অনেকক্ষণ। 

যুদ্ধ শেষ হয়ে আসছে। ওদিকে হফটনও তার সৈন্যদের নিয়ে আসছে। মাত্র পাঁচজন শিখ যোদ্ধা রয়েছে বেঁচে। চারজন যুদ্ধ করছে। আর সিগন্যালম্যান গুরুমুখ সিং, হফটনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। যখন তিনি দেখলেন আফগানরা প্রায় দখল করেছে দুর্গ, হফটনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে গুরুমুখ নিজেও নেমে এলেন যুদ্ধে।

গুরুমুখ সিংকে জীবিত পুড়িয়ে মারে আফগানরা। তবে গুরুমুখ ছিলো অদম্য সাহসী। মৃত্যুর আগে সে নিকেশ করে বিশ-পঁচিশজন আফগান সৈন্যকে। মাত্র উনিশ বছর বয়সী এই তরুণ এরপর শত্রুদের হাতে ধরা পড়ে। দুর্গ চলে যায় আফগানদের হাতে। 

পরে জানা গিয়েছিলো, এই একুশজন শিখ যোদ্ধা মৃত্যুর আগে কমপক্ষে ৬০০ জন আফগান সৈন্যকে মেরে যেতে সক্ষম হয়েছিলো। মাত্র একুশজন মানুষ সেদিন ছয়শো জন মানুষকে খতম করেছিলেন! 

যুদ্ধক্ষেত্র


এই ঘটনা নাড়া দিয়েছিলো প্রত্যেককে। সারাগারহিতে নিহত ২১ জন সৈনিককে মরণোত্তর সম্মানসূচক ‘ইন্ডিয়ান অর্ডার অব মেরিট ক্লাস থ্রী’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীর এক ইউনিটের প্রত্যেক সদস্য পুরষ্কৃত হন। এই ঘটনার নয় দিন পরে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অধিবেশন চলাকালীন অধিবেশন থামানো হয়। সবাই দাঁড়িয়ে এই একুশজন বীরদের উদ্দেশ্যে সম্মান প্রদর্শন করেন। রানী ভিক্টোরিয়া ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গর্ব করেন এই সৈন্যদের নিয়ে। বর্তমানে ইন্ডিয়ান আর্মির সবচেয়ে সুসজ্জিত রেজিমেন্ট, শিখ রেজিমেন্ট ১২ সেপ্টেম্বরকে 'সারাগারহি দিবস' হিসেবে পালন করে। তাছাড়াও সারাগারহি, ফিরোজপুর ও অমৃতসরে তিনটি গুরুদুয়ারা নির্মিত হয়েছে শহিদ যোদ্ধাদের স্মরণে। বলিউডে সিনেমাও হয়েছে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে। 'কেসারি' নামের সে সিনেমা হয়তো অনেকে দেখেছেনও। 

অকুতোভয় যোদ্ধাদের নামে স্মৃতিফলক 

এই ঘটনা এইজন্যেই তাৎপর্যপূর্ণ যে, নিশ্চিত পরাজয় জেনেও এই একুশজন যোদ্ধা রণে ভঙ্গ দেন নি৷ কাপুরুষের মত পালিয়ে আসেন নি। বরং বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। মরতে তো হবেই একদিন। তবু পরাক্রমের সাথে মৃত্যুর মধ্যে পুরোটাই গৌরব। একারণেই এই ঘটনার এত বছর পরে এসেও আমরা বিনম্রচিত্তে মনে রাখি তাদের। এদেরককেই হয়তো বলা হয় 'সংশপ্তক'। যারা হারার আগে হারতে চায় না, যারা হারার আগে হারতে জানেও না। 

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা