বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য স্পেনের অস্কার ব্রুজন নিঃসন্দেহে অনেক বড় এক নাম। কিন্তু বসুন্ধরা কিংস যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে তাতে কি অস্কার মানানসই?

অস্কারের দক্ষিণ এশীয় কোচিং ক্যারিয়ার যদি দেখি আমরা, ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ আই লীগে স্পোর্টিং গোয়া-কে যথাক্রমে ৬ষ্ঠ ও ৫ম স্থান এনে দিয়েছিল অস্কার। ২০১৬-১৭ এর আই লীগে মুম্বাই এফসি'র দায়িত্ব নেন লীগের ৪ ম্যাচ বাকি থাকতে। লীগের তলানিতে মুম্বাই সহ ৪টি দল ছিল ২ পয়েন্টের ভেতর। অবনমিত হতো একটি দলই এবং তা হয় মুম্বাই। ২০১৭-১৮ তে দায়িত্ব নেন মালদ্বীপের নিউ রেডিয়েন্ট এর। মালদ্বীপ এর লীগে আজ পর্যন্ত কোন দল কাগজে-কলমে ফেভারিট হয়ে লীগ শুরু করে চ্যাম্পিয়ন না হয়ে মৌসুম শেষ করেনি। সেবার যে উপলক্ষ্য তৈরি করে নিয়েছিল নিউ রেডিয়েন্ট।

বাংলাদেশে বসুন্ধরা কিংস এর উত্থানে প্রিমিয়ার লীগে দলটি কোচ করে নিয়ে আসে এই স্প্যানিশকে। প্রায় পুরো জাতীয় দল সহ তুলে দেয় ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলা কোস্টারিকান ড্যানিয়েল কলিন্ড্রেস কিংবা থাই লীগের অন্যতম সেরা স্কোরার ব্রাজিলের মারকোস ভিনিসিয়াস কিংবা এশিয়ান কোটায় বখতিয়ার দুয়শোবেকোভ এর মত কিছু বিদেশি খেলোয়াড়। এতে করে প্রত্যাশা মাফিক লীগ জিতে নিয়েছিল দলটি, স্বাধীনতা কাপেও হয় চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু সেই মৌসুমের শুরুতে এএফসি কাপের গ্রুপ পর্বের স্থান পাবার লড়াইয়ে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে ঢাকা আবাহনীর কাছে হেরে যায় অস্কারের দল, যারা লড়ছিল প্রাক মৌসুমে বসুন্ধরার বাতিল করে দেয়া দুই বিদেশি মাসিহ সাইঘানি ও কারভেন্স বেলফোর্টকে নিয়ে। সভাপতি ইমরুল হাসানের নেতৃত্বে বসুন্ধরা ম্যানেজমেন্ট এশিয়ান পর্যায়ে খেলতে অত্যন্ত আগ্রহী এবং অস্কার প্রথম সুযোগে দলকে কোয়ালিফাই করাতে ব্যর্থ হয়েছিল। দলটির ম্যানেজমেন্টের এশিয়ান পর্যায়ে খেলা ও ভালো করবার বাসনা কতটা শক্তিশালী তার অন্যতম প্রমাণ আর্জেন্টিনার হারনান বারকোসের মত স্ট্রাইকারকে নিয়ে আসা যা আক্ষরিক অর্থে গত মার্চে মহাদেশীয় ফুটবলে দলটির অভিষেকে টিসি স্পোর্টস এর বিপক্ষে লজ্জার হাত থেকে বাচিয়ে দিয়েছিল অস্কারকে।

ফরমেশন, ট্যাকটিক্স এবং ম্যাচ রিডিং একসাথে তুলে ধরবো। সাথে তার ম্যান ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতাও। অস্কারের প্রিয় ফরমেশন আক্রমণাত্বক ধাঁচের ৪-৩-৩। এছাড়াও ৪-৪-২ তেও খেলাতে দেখা যায় যা তাদের এএফসি কাপের ম্যাচটিতে দেখা গিয়েছিল। যে ফরমেশনই বলুন না কেন, ডিফেন্ডিং এর সময় স্বাভাবিকভাবেই ৪-৫-১ শেপে চলে যেতে দেখা যায় দলকে। আবার আক্রমণে সুযোগ বুঝে হয়ে যেতে পারে ৩-৪-৩ কিংবা গোলের খুব প্রয়োজন হয়ে পড়লে ৪-২-৪ যা লীগে তাদের প্রথম হোম ম্যাচে উত্তর বারিধারার বিপক্ষে দেখা গিয়েছিল।

ফরমেশন যা উল্লেখ করলাম সেটা কোন দল একই ম্যাচে স্বাভাবিকভাবেই অদল বদল করে খেলে। এটা নির্ভর করে আপনি রক্ষণ না আক্রমণ করছেন এবং যাই করুন না কেন তাতে কতটুকু জোর দিতে চাইছেন আবার প্রতিপক্ষের ওপরও তা নির্ভরশীল। কিন্তু হাতে ট্যাকটিক্স এর উপযোগী ফুটবলার না থাকলে আবার প্রতিপক্ষ অনুযায়ী কিংবা চলমান ম্যাচের কোন নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী ফরমেশনে অবশ্যই পরিবর্তন আনা উচিত।

অস্কার প্রায় সব সময়ই ফ্ল্যাট ফরমেশনে খেলিয়ে থাকে দলকে। তার ট্যাকটিক্সে যে কোন একজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বিল্ড আপের সময় বল নিয়ে উপরে উঠে এসে মিডফিল্ডে সরবরাহ করে। এক্ষেত্রে হাই লাইন ডিফেন্স ধরে রাখতে পছন্দ করে সে। পাস হয় দ্রুত ওয়ান টাচে। ওভারল্যাপ করে ওঠে আসে ফুল ব্যাক। লীগ জিতে নিলেও দলটির খেলা ২০১২-১৩ মৌসুমে মারুফুল হকের শেখ রাসেল কিংবা ২০১৩-১৪ তে জোসেফ আফুসির শেখ জামালের মত মনমত হয়নি। সত্যি বলতে দলটির খেলায় ঘাটতি ছিল মূলত মিডফিল্ডে। ইমন তার পছন্দমত নিচ থেকে জায়গা নিয়ে বিল্ড আপের সুযোগ পেয়েছে কম। দলকে বেশ কয়েকটি ম্যাচে বের করে নিয়ে আসছিল ডান দিক থেকে খেলা মারকোস-মতিন জুটি কিংবা বাম দিক থেকে কলিন্ড্রেস যার সাথে বেশ ভালো বোঝাপড়া গড়ে নিয়েছিল ইব্রাহিম। ওদিকে প্রতিপক্ষকে মাঝখানে বিরক্ত করবার কাজটা খুব ভালোভাবে করে যাচ্ছিল জনি।

এবারের বাতিল হওয়া মৌসুমে কি দেখা গেল? মারকোস ভিনিসিয়াস ফিরে গেল থাইল্যান্ডে। লীগের আগে মতিন ইনজুরিতে পড়লো। ডান পাশ পুরোই ধ্বসে গেল। খেলা প্রায় পুরোপুরি ঢলে পড়লো কলিন্ড্রেস যে দিকে খেলছে সে দিকে। এখানে ম্যান ম্যানেজমেন্টের বিষয়টা এসে পড়ছে। ইনজুরির কারণে ইমন, জনি, রবিউল ছিল না মিডফিল্ডে। দলটির স্কোয়াডের গভীরতা তা তখনও সামাল দেবার মত ছিল। কিন্তু বখতিয়ার, ডেলমন্তে ও নাজারভকে একাদশে নির্দিষ্ট ভূমিকা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল অস্কার। তাদেরকে সেন্টার ব্যাক, ফুল ব্যাক, সেন্টার মিডফিল্ড সহ উপরের পজিশনেও খেলিয়েছে যখন যেভাবে তার মনে হয়ে হয়েছে। অনুশীলনে খেলোয়াড়দের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা পজিশনে চেখে দেখবার খ্যাতি আছে অস্কারের। কিন্তু শেখ কামাল কাপ, ফেডারেশন কাপ শেষ হয়ে লীগ শুরু হয়ে গেলেও তার প্রি-সিজন মোড তখনও যায়নি।

লেবাননের জালাল কদু দেশটির ফুটবলে অন্যতম সেরা তরুণ প্রতিভা। গতবার এএফসি কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া আল আহেদের হয়ে হ্যাট্রিকসহ ৫ গোল করেছিল সে। বসুন্ধরায় আসবার পর অস্কার নিজে বললো লীগের সেরা নাম্বার নাইন হবে জালাল। পরে আমরা দেখলাম জালালকে কাজে লাগাতে অস্কারের ব্যর্থতায় খেলোয়াড়টিকে ছেড়েই দিল বসুন্ধরা। যদিও ৭ ম্যাচে ৫ গোল করেছিল সে, কিন্তু সব মিলিয়ে তার ইমপ্যাক্ট ভালো ছিল না। সুফিল ২০১৭ এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ এর সেপ্টেম্বর এর ভেতর যে কোন পর্যায়ের খেলা মিলিয়ে ১০টি আন্তর্জাতিক গোল পেয়েছিল। মাঝে অনেকটা সময় স্কোরিং ফরোয়ার্ড রোল না পেলেও গত বছরের ডিসেম্বরে এসএ গেমসে সেই দায়িত্ব পেয়েই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাচা-মরার লড়াইয়ে গোল করে জিতিয়েছিল দলকে। সেই সুফিলকেও এবারে লীগে ভালোভাবে ব্যবহার করবার সুযোগ ছিল বিশেষত কলিন্ড্রেসের ওপর থেকে গোল করবার চাপ সরিয়ে নিয়ে আরও নিচে নেমে খেলা তৈরিতে সুযোগ করে দেবার। কিরগিজ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বখতিয়ারকে অস্কার প্রায়ই উপরে খেলিয়ে সফল হয়েছিল এবং সুযোগ তৈরি হয়েছিল যে মিডফিল্ডের খেলোয়াড় সঙ্কটে তার ডিফেন্সিভ ওয়ার্ক রেট ও এগ্রেসন কাজে লাগানোর। কারণ কিরগিজিস্তানের হয়ে তার খেলা যারাই দেখেছেন তারা জানেন যে বখতিয়ার মাঝমাঠে রীতিমত এক যোদ্ধা এবং আপাত নিরীহ চেহারার আড়ালে খুব শারীরিক খেলা খেলতে পারে।

জালাল কদু

কিন্তু সমস্যা হয়ে দাড়ায় অস্কারের ফরমেশন ও ট্যাকটিক্যাল ফ্লেক্সিবিলিটির অভাব। ৪-২-৩-১ বা ৪-১-৪-১ ফরমেশন তার অভিধানেই নেই যেন। বিল্ড আপ ফুটবলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে বখতিয়ার কখনই উপযোগী নয়, এটা একটা ব্যাপার। ওদিকে মূলত ডিফেন্ডার ডেলমন্তেও মানিয়ে নিতে পারেনি ওই পজিশনে। স্পেনের ২য় টায়ারে খেলা ডেলমন্তেকে নিতান্তই গড়পড়তা মনে হচ্ছিল যেখানে কিনা স্পেনের ৪র্থ টায়ারের ফুটবলাররা রীতিমত সুপারম্যানের মত খেলে চলেছে ভারত কিংবা ফিলিপাইনে। বখতিয়ার বা ডেলমন্তে মাঝমাঠে বল হারালে সহসাই তা ডিফেন্সের ওপর প্রচন্ড চাপ তৈরি করেছে। সেই একই ফ্ল্যাট ফরমেশনে খেলে বার বার ঠকে গেলেও অস্কার নির্বোধের মত একইভাবেই খেলিয়ে যেতে থাকলো। কিন্তু তাদের ডিফেন্স ও এটাকিং মিডফিল্ডারদের মাঝে রেখে ট্রু ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলালে দলটির ডিফেন্স এভাবে বার বার ভেঙ্গে পড়তো না। ডিফেন্ডাররা সহজেই তাদের কাছে বল পাস দিয়ে নিজেদের পজিশন ধরে রাখবার দিকে মনোযোগ দিতে পারতো এবং আক্রমণ সামলাতে তাদের সহায়তা পেত। ডিফেন্সের এরকম দুর্দশার আর এক কারণ ছিল সেন্ট্রাল ডিফেন্সে জুটি তৈরিতে অস্কারের ব্যর্থতা। এরকম হাই লাইন ডিফেন্সে আপনার জোড়া সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার অবশ্যই হতে হবে নিয়মিত। সেখানে তপুর সাথে দেখা গিয়েছে ইয়াসিন, ডেলমন্তে, তারিক ও নাজারভকে। তপু মোটামুটি কাজ চালিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ২০১৮-১৯ মৌসুমে নাসিরউদ্দিন যে সার্ভিস দিয়েছিল অস্কারকে সেভাবে পারেনি। ইয়াসিন পরিষ্কারভাবেই ফ্লপ করেছে এরকম হাই লাইন ডিফেন্সে বল প্লেয়িং ডিফেন্ডার হিসেবে। ২০১৪ সালের আইএফএ শিল্ড কিংবা লীগে জোসেফ আফুসির অধীনে পাসিং ফুটবলে ইয়াসিন কিভাবে মানিয়ে নিয়েছিল তাহলে?

কারণ মামুনুল তখন খেলছিল ডিপ লায়িং প্লেমেকার হিসেবে এবং সে অনেক নিচে নেমে জায়গা নিয়ে বল পেয়ে খেলাটা তৈরি করতো এঙ্করিং রোলে। এতে করে ডিফেন্সকে এতটা চাপ নিতে হয়নি। অস্কারের অধীনে আমরা দেখেছি মিডফিল্ডে বল নেবার প্রয়োজনীয় মুভমেন্টের অভাবে ভালোভাবে বল ছাড়তে না পেরে ইয়াসিনসহ পুরো ডিফেন্স হতাশ হয়ে মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। এভাবে পরিস্থিতি যেরকমই হোক সে তার হাই লাইন ডিফেন্সে ক্রিস্প পাসিং ফুটবল খেলাবেই। এএফসি কাপে টিসি স্পোর্টসের বিপক্ষে প্রথমার্ধে একটি আক্রমণের সময় তপু বল নিয়ে প্রায় মাঝলাইনে চলে আসলেও কাউকে না পেয়ে শেষে হারনান বারকোসকে লং বল পাঠায়। পাসটা ভালোই ছিল কিন্তু হারনান এর জন্য মোটেও তৈরি ছিল না, সে বল ধরবার কোন চেষ্টাও করেনি, উল্টো এমন লুক দিল তপু কে যাতে স্পষ্ট বোঝা গেছে তার মনের কথা, 'হোয়াট ম্যান! দ্যাট ওয়াজ নট দ্য প্ল্যান!'। এটাও একটা প্রশ্ন যে মিডফিল্ডকে তাদের ভূমিকা কি অস্কার ঠিকঠাক বোঝাতে পারছে?

ভিডিওটি দেখুন। প্রথম যে গোল হজম দেখছেন বসুন্ধরার তা ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে। লেফট ব্যাক নাজারভ বল হারাবার পর কয়েক পাসে বল চলে যায় ফয়সালের কাছে এবং সে বলটি বাড়ায় মোবারকের উদ্দেশ্যে। স্কুটার খ্যাত গফুরের ছেলে মোবারক দারুণ স্কিলফুল খেলোয়াড়। ২০১৩ সাফে খেলেছিল বাংলাদেশের হয়ে। মোবারক বসুন্ধরার ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মাঝে একদম আনমার্কড দাঁড়িয়ে। বিশ্বনাথ খুব ভালোভাবেই জানে এভাবে তাকে খালি রাখবার পরিণতি। তাছাড়া মোবারক বল পেলে ৪ বনাম ৪ পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাচ্ছে। তাই ইম্প্রোভাইজেশন করে লাইন ভেঙ্গে বিশ্বনাথ তাকে আগে ভাগেই আটকাতে গেল। সত্তর মিনিটে ৩-০ তে এগিয়ে থাকা অবস্থায় তাতে অপরাধেরও কিছু ছিল না। কিন্তু বিশ্বনাথের পজিশন সম্পর্কে সতর্ক ও দলকে ম্যাচে ফেরাতে মরিয়া মোবারক সুযোগ পেয়ে বলে হালকা টাচে শরীর ঘুরিয়ে ঢুকে গেল বক্সে এবং গোল বানিয়ে দিল। বসুন্ধরা শেষ পর্যন্ত প্রচুর ঘাম ঝড়িয়ে ম্যাচটি জিতেছিল ৩-২ গোলে। এই ম্যাচের পর পত্রিকা, টিভি, কমেন্ট্রি তে বিশ্বনাথকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে, যে কেন সে ওভাবে চার্জ করতে গেল। বিশ্বনাথ এগিয়ে আসবার সময় বলের গতিপথ বুঝতে পারেনি ঠিক আছে এবং মোবারক তার ট্যাকনিক্যাল ব্রিলিয়ান্স দিয়ে তাকে বিট করে এগিয়ে গিয়েছিল কিন্তু বিশ্বনাথের নিয়তে কোন ঘাপলা ছিল না। সমস্যাটা ছিল মিডফিল্ডে যা তাকে ওরকম পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। আপনাকে তো সমস্যার মূলে যেতে হবে। ৩ গোলে পিছিয়ে থাকা ব্রাদার্স তাদের ইরানি কোচের নির্দেশ মোতাবেক আপ ফ্রন্টে খেলোয়াড় সংখ্যা বাড়ালেও অস্কারের অতি আত্মবিশ্বাস ও এই সামান্য ম্যাচ রিডিংয়ে ভুল থেকে ফরমেশন বা নিদেনপক্ষে মিডফিল্ডের রোল বদল করবার ব্যর্থতায় বসুন্ধরাকে সহজ ম্যাচটি তুলে নিতে শেষের দিকে টলতে হয়েছিল রীতিমত। ব্যাপারটা এভাবেও বলা যায় যে, ডিফেন্স নিয়ে অস্কারের পর্যাপ্ত কাজ না করাতে এই হাল। ডিফেন্সিভ লাইন আর একটু সামনে এগিয়ে আসলে মিডফিল্ডের কাছাকাছিও থাকা হতো ফলে এভাবে কেউ স্পেস পেতো না আবার অফ সাইড ট্র্যাপও তৈরি করা যেত। অর্থাৎ ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের সমন্বয়হীনতা দুই দিক থেকেই লক্ষ্যণীয়।

ভিডিওতে ফিরে আসি আবার। দ্বিতীয় গোল হজমটি এবার কুমিল্লাতে ঢাকা মোহামেডানের বিপক্ষে। ব্রাদার্সের বিপক্ষে ম্যাচটির পর যেখানে সবাই বিশ্বনাথকে দায়ী করছিল সেখানে আমি যুক্তিসঙ্গতভাবে অস্কারের সমালোচনা করে নিজের ফেসবুকে লিখি। এবং আমার কথাই আবার প্রমাণ করেন মোহামেডানের কোচ শন লেন, কারণ তিনি আমার মত অস্কারের দলের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মাঝের ফাকা জায়গাটি ঠিকই ধরে ফেলেছিলেন। এই ম্যাচে বিশ্বনাথের বদলে রাইট ফুল ব্যাকে খেলে তারিক। গোলটি দেখুন, ওবির কাছে বল পৌঁছাতে মুহূর্তেই ৪ বনাম ৪ পরিস্থিতি তৈরি হয়। মিডফিল্ড সম্পূর্ণ ফ্ল্যাট ছিল এবং তারা ডিফেন্সকে সাহায্য করা থেকে যথেষ্ট দূরে। একদম বিশ্বনাথের মত পরিস্থিতিতে দাড়িয়ে তারিক লাইন হোল্ড করে থাকলো। কিন্তু ওবি বক্সের অনেক কাছে ছিল এবং যাদের দায়িত্ব ছিল তাকে ধরার সেই মিডফিল্ড তার যথেষ্ট পিছনে থাকায় পর্যাপ্ত স্পেস ও সময় পেয়ে সে শ্যূট করে বসে এবং গোল! সেই গোলেই ম্যাচটি জিতে নেয় মোহামেডান।

এই যে আদেবায়োরের গোলটি দেখুন চেলসির বিপক্ষে। ক্যাহিল লেফট সেন্টার ব্যাক ছিল। কোল ছিল লেফট ব্যাক। লুইজ লেফট ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিল এই ম্যাচে। কাউন্টার মোকাবিলায় যার যার কাছের খালি জায়গা পূরণ করতে গিয়ে এদের পজিসন হল যথাক্রমে রাইট সেন্টার ব্যাক, লেফট সেন্টার ব্যাক ও লেফট ব্যাক। একমাত্র আজপিলিকুয়েতা তার রাইট ব্যাক পজিসন ধরে রাখতে পেরেছে। কথা হল কাউন্টারে এরকম হতে পারে। কিন্তু তারা ডিফেন্সের লাইন ও শেইপ মেইনটেইন করেছে শেষ পর্যন্ত। বাধ্য হয়েছে টটেনহামের প্লেয়ারদের অফ দ্য বল রানিং এ। ক্যাহিল বার বার তাকাচ্ছিল অন্য মিডফিল্ডারদের দিকে সাহায্যের জন্য যাতে তাদের কেউ এসে আদেবায়োর কে ধরে। কারণ প্রতিপক্ষের কেউ পিভট এরিয়াতে এসে আনমারকড্ থাকা মানে এখন পুরো খেলাটাই তার ওপর নির্ভর করছে। কুমিল্লায় মোহামেডানের বিপক্ষে বসুন্ধরা যে গোল হজম করলো তাতে একদম কাউন্টার না হলেও আক্রমণে ফ্লুইডিটি আর স্পিড ছিল। ওবি একদম কিংস এর পিভট এরিয়াতে বল পায় আনমারকড্ অবস্থায়। ডিফেন্স তাদের মত করে লাইন মেইনটেইন করছিল৷ শট এবং গোল। স্কেপ গোট করা হল তারিককে! বিশ্বনাথ ইম্প্রোভাইজেসনের চেষ্টায় এগিয়ে গেল ব্রাদার্সের বিপক্ষে, মোবারক সুইফটলি ইউ টার্নে টপকে গেল৷ এরপর বিশ্বনাথকে গালমন্দ করে অবস্থা শেষ। ক্যাহিল এরকম চ্যালেঞ্জে যেতে পারতো বিশ্বনাথের মত। ঠেকাতে পারলে প্রশংসা না পারলে দোষটা কিন্তু তার না। তার অবশ্য উচিত ছিল অন্তত মক চার্জ করে হলেও আদেবায়োর কে ওয়াইডে খেলাতে বাধ্য করা। তাতে অন্যরা ফিরে এসে ডিফেন্সিভ কাজে যোগ দেবার সময় পেত। অবশ্য এরকম ক্রাশিং মোমেন্টে ক্যাহিলকে পুরো দোষ দেয়া যায় না। 

বিশ্বনাথকে দায়ী করে তারিক কে খেলানো হলো, তারপর তারিক কে দায়ী করে মোহামেডানের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধের পরই তুলে নেয়া হলো! আমার কথা হচ্ছে, একজন কোচের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে কিন্তু তার দায় সে যদি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পেতে চায়, তা রীতিমত ক্রিমিনাল আচরণ। যেখানে কোচ তার নিজের দলকে আগলে রাখে সেখানে অস্কার কি করছে দেখুন।

অস্কারের চেয়েও খেলোয়াড়দের ইনজুরি নিয়ে অনেক বেশি বিপর্যস্ত ছিল ঢাকা আবাহনীর মারিও লেমোস। কিন্তু তার ম্যান ম্যানেজমেন্ট দেখুন। মামুন মিয়া ও রায়হানকে এক দলে ডিফেন্সে রেখে উত্তর কোরিয়ান জায়ান্ট এপ্রিলের বিপক্ষে জেতার সম্ভাবনা কাগজে কলমে ছিল প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সেই ম্যাচে আবার তার দলে অভিষেক হয় দক্ষিণ কোরীয় এক ডিফেন্ডারের। ওদিকে রাইট উইং ব্যাক সাদ দুর্দান্ত খেলে থাকলেও আদতে সেই পজিশনে সে একজন মেক শিফট খেলোয়াড় মাত্র। লেফট ব্যাক ওয়ালী ভালো, কিন্তু সে বয়সের ভারে ক্লান্ত। ইনজুরি ও কার্ড সমস্যায় দলে ছিল না তপু, মামুনুল, জুয়েল রানা, রুবেল মিয়া, ওয়েলিংটন ও নাসের আবার দল ছেড়ে চলে গিয়েছিল মাসিহ সাইঘানী। নানা সময়ে ৪-৩-৩, ৪-৪-২, ৪-২-৩-১ এ খেলানো লেমোস এবারে চাললেন অনবদ্য এক চাল। এপ্রিলের দুর্ধর্ষ উইং প্লে ঠেকাতে ৩-৫-২ ফরমেশনে নামালেন একাদশ। ম্যাচের শুরু থেকে সাদ তার দিক থেকে অবলীলায় নিজের অফ দ্য বল রানিং এ আটকে দিলেন এপ্রিলের উইঙ্গারদের। পুরো দল মিলে একসাথে যেমন ডিফেন্স করেছে তেমনি এটাকেও সবাই একসাথে ওঠবার চেষ্টা করেছে কারণ লেমোস ভালোভাবেই জানে যে মামুন-রায়হানের (রায়হান আসলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিল সেই ম্যাচে) সমন্বয়ে ডিফেন্স ও পোস্টের নিচে সোহেলের মত কিপার নিয়ে কখনই শুধু ডিফেন্স করে এপ্রিল এর মত দলকে হারানো যাবে না। আর তাই তো ৩ গোল খেলেও ৪ গোল দিয়ে ঠিকই ম্যাচটি জিতে নেয় লেমোসের দল।

২০১৮-১৯ এর লীগে আমি ভেবেছিলাম ঢাকা আবাহনী ৪র্থ বা বড়জোর ৩য় হবে। কিন্তু দলটিকে বেশ ভালোভাবে রানার আপ করায় লেমোস। আপনারা দেখে থাকবেন, সানডে-জীবন-বেলফোর্ট প্রত্যেকের হেড ওয়ার্ক প্রায় নেই বললেই চলে। ওদিকে প্রথম দুই জনের বাম পা প্রায় অকেজো। সীমাবদ্ধতাগুলো ছাপিয়ে গোল পেতে লেমোস কাজে লাগালেন তিন জনের শারীরিকতাকে। জীবন শারীরিকভাবে শক্তিশালী না হলেও লম্বা। আবার হালকা পাতলা স্কিল আছে উইথ দ্য বলে। বাকি দুজন তো রীতিমত বডিবিল্ডার। তাদের সমন্বয়ে আপ ফ্রন্টকে লেমোস প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের ওপর দিয়ে বুলডোজার এর মত ব্যবহার করলেন। এর মাধ্যমে লেমোস এটা নিশ্চিত করতে চাইলেন যে তারা যেন গোল লাইনের ৬ গজের যত কাছে সম্ভব যেতে পারে গোলের সম্ভাবনা বাড়াতে। কারণ তাদের সেই সীমাবদ্ধতাগুলো যা ইতিমধ্যেই আমি বলেছি। মাইনাস ও স্কয়ার থেকে প্রচুর গোল এসেছে ট্যাপ ইনে। লেমোস ওখানেই থেমে থাকেনি। মামুনুল ও সোহেল কে পা খুলে শ্যূট করবার স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিল সে। সোহেলের সাথে রুবেল কিংবা জুয়েল ঘন ঘন ঢুকেছে বক্সের ভেতর। লীগে পার পেয়ে গেলেও এএফসি কাপে ঠিকই গোল ক্ষরায় ভুগেছে সেই ত্রয়ী। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে গোল করে বাঁচিয়েছে মামুনুল, সোহেল ও মাসিহ। মাসিহ লীগে মাত্র ১ গোল করলেও এএফসি কাপে ৩ গোল করে গ্রুপে আমাদের সেরা স্কোরার হয়েছিল।

২০১৬-১৭ এর লা লীগা ও এবারের লা লীগা জেতার ভেতর জিদানের ফরমেশন ও ট্যাকটিক্যাল ফ্লেক্সিবিলিটি দেখুন। জিদানের প্রসঙ্গ আনছি কারণ সে সাধারণত ৪-৩-৩ এ খেলাতে পছন্দ করে এবং ইদানিং তার ট্যাকটিকাল ফ্লেক্সিবিলিটি বহুল আলোচিত। ২০১৬-১৭ তে দেখা গেছে ক্রুস খেলছিল ডিপ লায়িং প্লেমেকার হিসেবে। এতে করে ডিফেন্স কে বেশি ওপরে থাকতে হতো না। ডিফেন্সের সময় ফরমেশন ৪-৫-১ এর পাশাপাশি আবার ৪-৪-২ বা ৪-১-৪-১ ও দেখা গেছে। আক্রমণে ক্রুস ও মদ্রিচ উঠে গেলেও কাসেমিরো নিচে থেকে যেত। এতে করে ৪-১-২-৩ বা ৪-১-৪-১ হয়ে আক্রমণে উঠে শেষে ২-১-২-৩-২ তে চূড়ান্তভাবে গোলের প্রচেষ্টার পর কাউন্টার সামলাতে গিয়ে দেখা যেত কাসেমিরোর উপস্থিতি ডিফেন্সের জন্য হয়ে ওঠতো আশীর্বাদ। আবার ২০১৯-২০ মৌসুমের শুরুতে জিদান শুরু করলো ৪-২-৩-১ ফরমেশনে। কিন্তু তা কাজে দিচ্ছিল না। মারসেলো ও হ্যাজারড ইনজুরির জন্য অনিয়মিত হয়ে পড়লো। এসেন্সিও লিগামেন্ট ছিড়ে ছিটকে পড়লো। বেল ভালো করছিল না, ভিনিসিয়াস জুনিয়র দুর্দান্ত প্রতিভা হলেও তার ফার্স্ট টাচে দুর্বলতা, ফিনিশিং ও কম্বিনেশন প্লে তে অপূর্ণতা মিলিয়ে জিদান ছিল ব্যাকফুটে। সে আবার ফিরে গেল ৪-৩-৩ ফরমেশনে। এক্ষেত্রে ভালভারদের বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে দ্রুততা ও শারীরিকতা দারুণ ফলদায়ক ছিল। তার ও কাসেমিরোর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের পাসিং লেনের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছিল। ওদিকে জিদানের প্লেয়ার শাফলিং সম্পর্কে কে না অবগত। প্রতিপক্ষ অনুযায়ী মদ্রিচ ও ভালভারদের রোটেশন আমাদের চোখে পড়েছে এবং তাদের ডিফেন্সিভ দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় আমরা দেখেছি মাদ্রিদের সেকেন্ড লাইন ডিফেন্স আগের মৌসুমগুলোর চেয়ে বেশ নিচে ছিল। স্কোরিং সমস্যার সমাধানে প্রত্যেককেই সুযোগমত গোল করবার পজিশনে চলে যাবার উপায় ও উৎসাহও বাতলে দিয়েছেন তিনি। জিদান কে আবার ৪-২-৩-১ এও খেলাতে দেখা গিয়েছে অবস্থা বুঝে, যেমন গত জুনে মায়োরকা'র বিপক্ষে ম্যাচটিতে।

আসুন অস্কারের ম্যাচ রিডিং এর দুর্বলতা দেখি এই ভিডিওতে। প্রথম গোল হজমটি ২০১৮ এর এএফসি কাপে যখন অস্কারের দল নিউ রেডিয়েন্ট ভারতের আইজল এর বিপক্ষে এওয়ে ম্যাচে খেলছিল। এই ম্যাচটি জিতলে ব্যাঙ্গালুরু কে হেড টু হেডে টপকে নক আউটে চলে যেত তার দল। উল্লেখ্য আইজলের সংগ্রহে ছিল মাত্র ১ পয়েন্ট এবং টিটুর মত নেতিবাচক ফুটবল খেলানো কোচের অধীনে ঢাকা আবাহনী এওয়ে ম্যাচে আইজল কে ৩-০ তে হারিয়ে এসেছিল। প্রথমার্ধে স্বভাবসুলভ পাসিং ফুটবল খেলে আইজলের ডিফেন্স ভাঙ্গতে পারেনি অস্কারের দল। দ্বিতীয়ার্ধের ৬১তম মিনিটে পেনাল্টিতে গোল হজম করে পিছিয়ে পড়লেও খেলার ধারা পরিবর্তন করেনি অস্কার। ম্যাচটি আমি দেখেছি এবং আপনাদের বলি, দলটি অতিমাত্রায় আশফাক কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল সময়ের সাথে সাথে। কিন্তু আশফাক ছিল কড়া মার্কিং এ। এখানে যে গোলটি দেখানো হয়েছে তা ৮২তম মিনিটে এবং এর সাথে সাথে নিউ রেডিয়েন্টের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। ডিফেন্স দেখুন আক্ষরিক অর্থে মিডফিল্ডে দাড়িয়ে, এতে করে প্রতিপক্ষ অর্ধে স্পেস ছিল একদমই কম। অথচ অস্কারের উচিত ছিল আশফাক কে নিচে নামিয়ে এনে প্লেমেকার রোল দিয়ে উপরের চাপ লঘু করে দেয়া। কারণ স্কোরার দলটিতে আরও ছিল। আপনাদের খেয়াল আছে নিশ্চয়ই, বাংলাদেশের বিপক্ষে আপ ফ্রন্টে জায়গা করতে না পেরে সুনীল ছেত্রি নিজ দলের ডিফেন্সের কাছে ড্রপ ব্যাক করে কয়েকবার এঙ্করিং রোল পালন করেছিল। এবং এভাবে প্রতিপক্ষ অর্ধে টানা ছোট ছোট পাসিং যা সে দিন এরকম মাস্ট উইন ম্যাচে একেবারেই কার্যকর হচ্ছিল না, সেভাবে না খেলিয়ে আশফাক কে নিচে থেকে খেলিয়ে উপরে ছোট পাসের সাথে কিছু ডেস্পারেট লং বল যদি ফেলা যেত তাহলে ফলোথ্রু তে স্পেস ক্রিয়েট হয়ে গোলের ভালো সম্ভাবনা তৈরি হতো। ওদিকে আশফাকও সুযোগ বুঝে স্কোরিং পজিশনে চলে যেতে পারতো। এই ম্যাচে একটি গোল শোধ করে নিউ রেডিয়েন্ট যা তৈরি হয়েছিল লং বল থেকেই!

ভিডিওর দ্বিতীয় ঘটনাটিতে বসুন্ধরা গোল হজম করেছে চট্টগ্রাম আবাহনীর বিপক্ষে। ৩ গোলে এগিয়ে গিয়ে ৩-৩ থাকা অবস্থায় এই গোল হজমে ঘরের মাঠে অস্কার হেরে যায় মারুফুলের কাছে। এই মারুফুলের কাছে সে ফেডারেশন কাপের গ্রুপ পর্বেও হেরেছিল। ৩-৩ থাকা অবস্থায় যখন চট্টগ্রাম আবাহনী সমস্ত মোমেন্টাম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখনও তার দল চিরাচরিত ফ্ল্যাট ফরমেশনে খেলতে থাকা অবস্থায় ডিফেন্স কে হাই লাইনে রাখে। উক্ত ম্যাচে অস্কার তার মিডফিল্ড লাইন অবশ্য সঠিক জায়গায় তথা একটু নিচে ডিফেন্সের কাছে রেখে খেলিয়েছিল কিন্তু দলের দুর্বল বাম পাশের ক্রমাগত ভেঙ্গে পড়া নিয়ে কিছুই করেনি উল্টো প্রতিপক্ষ দলের রীতিমত খুনে মেজাজে থাকা নাসিরুল-দিদিয়ের-মান্নাফদের শক্তিশালী ডান দিক তথা নিজেদের বাম দিক দিয়েই আক্রমণ চালাবার চেষ্টা করেছে আশ্চর্যজনকভাবে। মাত্র কিছুক্ষণ আগে নামা ইয়াসিন (আমার কোন ধারণাই নেই অফ ফর্মের ইয়াসিন কে ঠিক কি কারণে এবং কোন পজিশনের জন্য নামিয়েছিল সে দিন) প্রতিপক্ষের কাউন্টার এটাকের সময় তখনও মিডফিল্ডের কাছে দাড়িয়ে। একই অবস্থা নুরুল নাইম ফয়সালের যে সেদিন বিশ্বনাথ-তপু-ডেলমন্তের সাথে ডিফেন্স লাইন পূর্ণ করেছিল লেফট ব্যাক হিসেবে। ইয়াসিনের মত সেও মিডফিল্ডের কাছে দাড়িয়ে যেহেতু এটাকে উঠে গিয়েছিল এবং ডিফেন্সের বাকি তিন সতীর্থের মত ট্র্যাক ব্যাক করতে পারেনি সময় মত কারণ দিদিয়ের বল জেতা মাত্র দ্রুত বাড়িয়ে দেয় মান্নাফকে।

লীগে এবার প্রথম ৬ রাউন্ড শেষে ঢাকা আবাহনী, চট্টগ্রাম আবাহনী, শেখ জামাল, সাইফ স্পোর্টিং ও ঢাকা মোহামেডানের পেছনে ছিল বসুন্ধরা। প্রথম দুটি দল শেষ পর্যন্ত শিরোপা লড়াই দিতে পারতো। অস্কার কি একরকম বেঁচে গেল লীগ বাতিল হওয়াতে? অবশ্য লীগের দ্বিতীয় পর্বে হারনান বারকোসকে দিয়ে পুষিয়ে নিতে পারতো সে।

বসুন্ধরার ম্যানেজমেন্টকে বিশাল এক ধন্যবাদ দিতে হয়। হারনান বারকোস কে না আনলে টিসি স্পোর্টস এর কাছে খুব সম্ভবত হারা লাগতো। হারনান থাকার ফলে কলিন্ড্রেস নিচে নেমে বিল্ড আপে যুক্ত থাকতে পেরেছিল। তবুও তো সেই ম্যাচে স্কোরলাইন ২-২ প্রায় হয়েই গিয়েছিল কিন্তু জিকোর অনবদ্য নৈপুণ্যের জন্য প্রতিপক্ষ সমতা আনতে পারেনি। বলাই বাহুল্য যে ৫-১ এ জিতলেও পুরনো ঘাটতিগুলো ঠিকই নজরে পড়েছিল। জিকোর কথা বলছিলাম। জিকো বসুন্ধরাকে ৩ বার টাইব্রেকারে জিতিয়েছে। এটাও একটা প্রশ্ন যে এত ভালো দল হয়েও কিভাবে ঘরোয়া ফুটবলে এখন পর্যন্ত ৯টি নকআউট ম্যাচের ৩টিই টাইব্রেকারে যাবে বসুন্ধরার। সংখ্যাটা অনেক বেশি।

জোসে বারেতো ও সনি নরদে'র পর উপমহাদেশ কাঁপাতে আসছেন রবসন সিলভা রবিনহো! টাকার সাথে মস্তিষ্কের দুর্দান্ত সমন্বয় ঘটিয়েছে বসুন্ধরা!

তবে হ্যাঁ, ক্ষমতা থাকলেও আমি অস্কার কে এই মৌসুমে বাদ দিতাম না। এত মাথা গরমও না আমার এবং সব কিছুর একটা নিয়ম আছে। এবং তাই আমি বসুন্ধরা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। দলটা ইতিমধ্যে একটি ছকে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং নতুন ভালো কোচ পাওয়া কঠিন। দলের খেলোয়াড়দের বুঝে ওঠতে কোচের সময় লাগতো এবং তার দর্শনে মানিয়ে নেয়াটাও একটা বড় ব্যাপার যখন কি না সামনে খুব গুরুত্বপূর্ণ খেলা পড়ে আছে। অস্কারের অধীনে বড় সাফল্য পেলেও তার সীমাবদ্ধতাগুলো চোখে পড়ার মত এবং বসুন্ধরাকে চিন্তা করে দেখতে হবে তারা আর কতদিন পর্যন্ত সম্পর্কটাকে টেনে নিয়ে যেতে চায় যখন কিনা ক্লাবটির আকাশ ছুঁতে চাইবার স্বপ্নের বিপরীতে অস্কারের কোচ হিসেবে সামর্থ্য যথেষ্ট কম।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা