"যুদ্ধরত অবস্থায় যোদ্ধারা যদি পরিবারবিহীন অবস্থায় থাকতে পারে, আমি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তা পারবো না কেন?"- তাজউদ্দীন আহমেদ।

আজ আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধের নেতা তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিন। ১৯৭১ সালের ২০শে ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের বিখ্যাত 'টাইম ম্যাগাজিন' খুব ছোট করে তাঁকে বর্ননা করেছিল এরকম- 

“Tajuddin Ahmed, 46. Prime Minister, a lawyer who has been a chief organizer in the Awami League since its founding in 1949. He is an expert in economics and is considered one of the party’s leading intellectuals.”

এই মহান বাঙালি নেতা ছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ, বিচক্ষণ এবং মেধার দিক দিয়ে সুদূরপ্রসারী চিন্তাবিদ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সংকটপূর্ণ অবস্থায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন তিনি।

তাঁর জীবনের অজস্র ঘটনা রয়েছে, যার প্রতিটি আমাদের স্বাধীনতা ও তাঁর নেতৃত্বের সুদীপ্ত ইতিহাস। এর মধ্য থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে, দুটি করে মোট চারটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো। 

১. মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার ভারতে আসে ২৭ মে। মাত্র ৫-৭ মিনিট তাদের সাথে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন– “শোনো, আমি ৬-৭ মিনিট সময় হাতে নিয়ে এসেছি, এখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলছে– আমরা সরকার গঠন করেছি, আমি এবং কেবিনেটের অন্য চার মন্ত্রী শপথ গ্রহন করেছি যে দেশ পাকিস্তানি সেনামুক্ত করে, স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত আমরা কেউ ফ্যামিলির সাথে থাকবো না।” মন্ত্রীসভার বাকি সদস্যদের পক্ষে ফ্যামিলির সাথে না থাকার প্রতিজ্ঞা পালন সম্ভব না হলেও তাজউদ্দীন আহমেদ অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করতেন। তিনি বলতেন – “যুদ্ধরত অবস্থায় যোদ্ধারা যদি পরিবারবিহীন অবস্থায় থাকতে পারে, আমি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তা পারবো না কেন?” 

সপরিবারে তাজউদ্দীন আহমদ  

তাজউদ্দীন আহেমদ থাকতেন ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে – স্বাধীন বাংলাদেশের মূল কার্যালয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রাণকেন্দ্র। এই ঘরটি ছিল একাধারে অফিস, শয়নকক্ষ ও খাবারঘর। ১৯ আগস্ট ছিল তাজউদ্দীন আহমেদের ছোট মেয়ের জন্মদিন, জন্মদিন পালন করা তো দূরে থাক, জন্মদিনের কথাই মাথায় ছিল না প্রধানমন্ত্রীর। পরের দিন ২০ আগস্ট মার্কিন সিনেটর কেনেডি ও ব্রিটিশ এমপি ডগলাসম্যানসহ বিদেশি কূটনৈতিকদের সাথে বৈঠক নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। 

প্রধানমন্ত্রী খুব অসুস্থ শুনে জোহরা তাজউদ্দীন ট্যাক্সি করে থিয়েটার রোডের সে বাসায় গেলেন দেখা করতে। প্রধানমন্ত্রীর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন তিনি সেখানে নেই, ঘরের মধ্যে নামমাত্র আসবাবপত্র আছে, এককোনায় একটা চিকন খাট, অপরপাশে দুটি চেয়ার আর একটি টেবিল, টেবিলভর্তি একরাশ কাগজপত্র। ঘরের পাশেই বাথরুম থেকে শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখেন– প্রধানমন্ত্রী বাথরুমের মেঝেতে বসে শার্ট কাচছেন, পরনে লুঙ্গি ও সাদা হাফহাতা গেঞ্জি– সাদা গেঞ্জির একাংশ রক্তে লাল হয়ে গেছে। বুকের একপাশে একটি ফোড়া উঠেছিল সেটা ফেটে যাওয়ায় এই অবস্থা, ডায়াবেটিসের রুগী, সাথে শরীরেও অনেক জ্বর। 

জোহরা তাজউদ্দীনের দুঃখকাতর চেহারা দেখে প্রধানমন্ত্রী একটি স্বভাবসিদ্ধ স্মিত হাসি দিলেন, যেন এটাই স্বাভাবিক ঘটনা– উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। পরের দিন মার্কিন সিনেটর আর ব্রিটিশ এমপির সাথে একটা মিটিং আছে, আর কোন শার্ট নেই, তাই পরনের বাদামি রঙের এই শার্টটি কেচে দিচ্ছেন যাতে শুকিয়ে পর দিন পরতে পারেন! 

২. মুক্তিযুদ্ধের একদম প্রথম দিকের সময় তাজউদ্দীনের পরিবারকে খুঁজতে মরিয়া ছিল পাকিস্তানীরা, তারা পালিয়ে আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন একই রাস্তার প্রতিবেশীর বাসায়। অথচ আশ্রয় না দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন সেই প্রতিবেশী। দেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছর পর কোন এক ছুটির দিনে সচিব আবু সাইদকে নিয়ে প্রমোশনের ফাইল দেখছিলেন অর্থমন্ত্রী– সেই ফাইলটি ছিল সেই প্রতিবেশী কর কর্মকর্তার। আর তাতে লিখা ছিল প্রমোশনের ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন সময়ে তার বিতর্কিত ভূমিকাটি বিবেচ্য। তাজউদ্দীন আহমদ তার প্রমোশন আটকালেন না, বরং লিখে দিলেন– 

“তাঁর চাকুরি জীবনের রেকর্ড অনুযায়ী তাঁর পদোন্নতি পাওয়া উচিত। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বিতর্কিত ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। যেহেতু নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ এখানে দেখানো হয়নি বা কোন প্রমাণও নেই, তাই সন্দেহবশত সিদ্ধান্ত না নিয়ে আমি তাঁর এই পদোন্নতি অনুমোদন করলাম।” 

তাজউদ্দীনের এই মহত্ত্বের ঘটনা দেখে সচিব আবু সাইদ চৌধুরী থম মেরে গিয়েছিলেন, এরকম ঘটনা কারো সাথে ঘটলে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করার কথা না। কিন্তু তাজউদ্দীন তা করেননি। পরে আবু সাইদ চৌধুরী বলেছিলেন, এরকম মানুষের অধীনে তিনি কাজ করেছেন ভেবে নিজেকে ধন্য মনে করেন। 

বঙ্গতাজের কাধে বঙ্গবন্ধুর ভরসার হাত 

৩. মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে শিশুপুত্র সোহেল অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে দেখতে যেতে তিনি চাননি। এ নিয়ে তার ভারতীয় নিরাপত্তা অফিসার ও বাংলাদেশের অনেক সহকর্মী বেশ পীড়াপীড়ি করলে এক বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন: “আমি তো ডাক্তার নই, আপনারা ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। আপনারা, মিস্টার চ্যাটার্জি সবাই তো আমার ছেলেমেয়েদের ও স্ত্রীর সুখ-দুঃখের চিন্তার জন্যে রয়েছেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা শত্রুবাহিনীর হামলায় পা হারিয়েছে, হাত হারিয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। কেউ গুলির আঘাতের যন্ত্রণা চেপে ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে বনে- বাদাড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে। 

এদের তো অনুভূতি আছে। তাদের মা-বোন-স্ত্রী-ছেলেমেয়ে স্বজন রয়েছেন। কিন্তু তাদের কথা চিন্তা করার সময় কোথায়? মাইন বা গুলির আঘাতে যন্ত্রণাকাতর ওই মুক্তিযোদ্ধা তার ব্যথা-বেদনা চেপে ধরে সকল অনুভূতি, চিন্তা, চেতনা, দেশমুক্ত করার অগ্নিশপথে সমর্পণ করেছে। শেষ সম্বল নিজ প্রাণটিও দেয়ার জন্যে প্রস্তুত। শত্রুর হাতে মৃত্যুর পর গোর-কাফন হবে কি হবে না, কিংবা কোথায় গোর-কাফন হবে; আত্মীয়-স্বজন স্ত্রী-পুত্র-পরিবার মৃত্যুর খবরটুকু জানতে পারবে কি না এই ভাবনাটুকু কি তার মনে একবার উদয় হয়? কোথায় তার অনুভূতি? যদি প্রশ্ন করেন, তার কি কোনো অনুভূতি আছে? এ পরিস্থিতিতে এর কী জবাব আছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে যদি আমার মৃত্যু হতো তাহলে আমার পরিবার-ছেলেমেয়েদের অবস্থা কী হতো? কে ভাবত তাদের কথা? যারা এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন তাদের রেখে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনদের কথা এ মুহূর্তে আমিও কি একটিবার ভাবছি? আপনার মনকে জিজ্ঞাসা করুন আপনিও কি ভাবছেন”? 

ড. আনিসুজ্জামান তার অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করেছিলেন- তিনি একদিন সকালে অফিসে এসে দেখেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের চোখ লাল হয়ে আছে, কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন, “রাতে ঝড়ো বাতাসের শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। জানালা বন্ধ করতে গিয়ে বৈরী আবহাওয়া লক্ষ করে শরণার্থী শিবিরের মানুষের কথা মনে পড়ে যায়। তারপর আর ঘুমাতে পারেননি।” 

৪. যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তাজউদ্দীন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহন করেন। অর্থমন্ত্রী হবার পর, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতায় আগুনে পোড়া নিজের পৈত্রিক ভিটার সামনে এসে দাঁড়ালে সমবেত জনতা বলে ওঠেন, আর চিন্তা কী, তাজউদ্দীন ভাইসাবের পোড়া ভিটায় নতুন বাড়ি উঠবে। তিনি বলেছিলেন- 

“যতদিন পর্যন্ত এই বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই না হবে, ততদিন এই ভিটায় বাড়ি উঠবে না। মনে রেখ, আমি শুধু এই এলাকার মন্ত্রী না, আমি সমস্ত বাংলাদেশের মন্ত্রী। এখন তোমাদের দায়িত্ব আগের চাইতে অনেক বেশি। কারণ সমস্ত দেশের মানুষ তোমাদের কাপাসিয়ার এই মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমি স্বার্থপরের মতো আমার এলাকার উন্নয়নের কাজে হাত দিতে পারি না। আমাকে সমস্ত দেশে সব কিছু সমান ভাগ করে দিতে হবে।” 

“বাড়িতে যখন অতিথি-মেহমান আসে তখন আমরা কি করি। তাকে ভালো করে আদর যত্ন করি, তার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করি। তাকে সবচাইতে ভালো জিনিসটা খেতে দেই। তারপর যা থাকে নিজেরা ভাগ করে খাই। তোমরাও সমস্ত বাংলাদেশকে তেমনিভাবে দেখ। এসো আগে আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ি। তখন এই এলাকা এমনিতেই আর পিছিয়ে থাকবে না।”

-

* প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন

* সমাজের নানান অসঙ্গতি নিয়ে আওয়াজ তুলুন। অংশ নিন আমাদের মিছিলে। যোগ দিন 'এগিয়ে চলো বাংলাদেশ' ফেসবুক গ্রুপে

আরও পড়ুন-


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা