ইয়োগা গুরু থেকে আজ তিনি কোটি কোটি রুপির মালিক তিনি। মিডিয়া মুঘল থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ- সবখানেই তার ভক্ত। কেউই তাকে ঘাঁটানোর সাহস পায় না কেন?

ভারতে এক ইয়োগা গুরু আছেন, নাম তার রামদেব। ভক্তরা তাকে ডাকেন বাবা রামদেব বা স্বামী রামদেব নামে। ভারতের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তার দেখা মেলা হরহামেশা। কখনও উদোম গায়ে যোগাসনের কলাকৌশল শেখাচ্ছেন, কখনও হিন্দু ধর্ম নিয়ে কথা বলছেন, কখনও অর্থনীতি নিয়ে বক্তৃতা ঝাড়ছেন, কখনও গোহত্যার প্রতিবাদ করছেন, কখনও আবার পাকিস্তান বা চীনের বিরুদ্ধে কিভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে, সেই সবক দিচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। এক কথায় বললে, বাবা রামদেব নামের এই লোকটি হচ্ছেন মাতাল গুড় টাইপের একটা বস্তু, অলরাউন্ডার বললে একটুও ভুল হবে না। 

হঠাৎ রামদেবকে নিয়ে পড়লাম কেন? কারন এই লোক দুইদিন আগে ঘোষণা দিয়েছেন, তার মালিকানাধীন 'পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ' নাকি করোনাভাইরাসের ঔষধ আবিস্কার করে ফেলেছে! দুনিয়ার তাবৎ বিজ্ঞানী যেখানে নাকানি চুবানি খাচ্ছেন, চিকিৎসাশাস্ত্র যেখানে সংগ্রাম করছে, সেখানে রামদেব কিনা করোনার ভ্যাক্সিন বানিয়ে ফেলেছে! এরপরেই মনে পড়লো, এই লোক এর আগেও গোমুত্র থেকে ক্যান্সারের ঔষধ আবিস্কার করেছিল, যদিও সেই ঔষধ খেয়ে কারো ক্যান্সার সেরেছিল বলে জানা যায়নি। 

সেই কাহিনীটা মনে পড়াতেই ভাবলাম, আজ আপনাদের বাবা রামদেবের গল্প শোনানো যাক। হরিয়ানার হতদরিদ্র‍ এক কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসে এই লোক কি করে সাধু বনে গেলেন, সেখান থেকে যোগবিদ্যার শিক্ষক হলেন, টেলিভিশনে চেহারা দেখিয়ে লাখ লাখ ভক্ত বানালেন, নিজের তুখোড় মার্কেটিং সেন্সকে কাজে লাগিয়ে ধর্মের ট্রাম্পকার্ড খেলে আর ধর্মান্ধ জনগনের ব্রেইন ওয়াশ করে কিভাবে শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন, সেসবের বিস্তারিত লিখতে গেলে রাত ফুরিয়ে যাবে। তাই যতটা পারা যায় সংক্ষেপেই বলছি।

বাবা রামদেব

রামদেবের জন্ম ভারতের হরিয়ানায়, ১৯৬৫ সালে। রামদেবের দাবী, আড়াই বছর বয়সে নাকি তিনি প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিলেন, পরে যোগাসন করে ঠিক হয়েছেন। সেই থেকেই নাকি যোগব্যায়মের প্রতি তার ভালোবাসা। গুরুকুলের স্কুলে হিন্দু সাহিত্য, সংস্কৃত আর যোগব্যায়ামের পাঠ নিয়েছিলেন তিনি। কৈশোরের শেষ প্রান্তে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে চলে গেলেন হরিদ্বারে, সেখানে গিয়ে সন্ন্যাসী হবার দীক্ষা নিলেন। তারপর গেলেন হিমালয়ে, সেখানে কয়েকবছর কাটিয়ে ফিরলেন, এর মাঝে যোগাসনের প্রতি মনযোগ কমেনি। উত্তরাখণ্ডে গিয়ে নিলেন আত্মনিয়ন্ত্রণ আর মেডিটেশনের পাঠ। এসবই নব্বইয়ের দশকের আগেকার কথা। 

নব্বইয়ের শুরুর দিকে যোগব্যায়ামের গুরু হিসেবে আবির্ভূত হলেন তিনি, খুললেন ব্যায়াম শেখানোর স্কুল। ধীরে ধীরে ছাত্র বাড়তে লাগলো। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন দিব্য যোগ মন্দির ট্রাস্ট। সেইসঙ্গে হিন্দু ধর্মের প্রচারও করছিলেন। ভক্তও জুটেছিল কিছু। তবে রামদেব লাইমলাইটে এলেন নতুন শতকের শুরুতে। ২০০৩ সালে আস্থা টিভি নামের একটা চ্যানেল তাকে সকালের স্লট দিলো, লাইভে এসে যোগব্যায়ামের কসরত শেখানোর জন্য। গেরুয়া রঙের নেংটি পরে যোগাসন শেখানো শুরু করলেন তিনি। এবং সেখান থেকেই তার জীবনটা বদলে গেল। 

দেশ বিদেশে প্রচুর ভক্ত তৈরী হয়ে গেল তার, রামদেবের কাছে যোগাসন শেখার জন্য সুদূর আমেরিকা-কানাডা থেকেও লোকজন আসতে শুরু করলো। ফী বাড়িয়ে দিলেন তিনি, তাতেও ঢল কমলো না। টিভি চ্যানেলগুলো আগে তাকে ডাকতো, এবার নিজেরাই তার আশ্রমে গিয়ে রামদেবের সকালের সেশনটা লাইভ সম্প্রচার করতে শুরু করে দিলো। তিনি তখন ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন। জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান পর্যন্ত তাকে আমন্ত্রণ জানালেন জাতিসংঘের সম্মেলনে দারিদ্র‍্যতা বিমোচন নিয়ে বক্তৃতা দেয়ার জন্য! 

নিজের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তখনই রামদেব খুলে বসলেন পতঞ্জলী প্রোডাক্টসের ব্যবসা। রামদেবের জীবনকে আসলে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। এক হচ্ছে পতঞ্জলী শুরু হবার আগের জীবন, আরেক হচ্ছে পতঞ্জলীর পরের জীবন। প্রথম জীবনে তিনি সাদামাটা একজন যোগগুরু ছিলেন, সন্ন্যাসীর দীক্ষা নিয়েছেন যিনি, জাগতিক লোভ থেকে যিনি নিজেকে মুক্ত বলে দাবী করতেন। আর পতঞ্জলী চালু হবার পরে তিনি নিজের ক্ষমতাটা বুঝতে পেরে সেটার যথেচ্ছা ব্যবহার করেছেন। কেমন? সেটা বলি তাহলে।

বিরাট একটা ভক্তশ্রেণী তৈরী হওয়ায় তাদেরকে তিনি পতঞ্জলীর দিকে টেনে আনার জন্য একের পর এক মার্কেটিং গিমিক তৈরি করেছেন, ক্রেতাদের সঙ্গে দুই নম্বুরী করেছেন। ক্যাডবেরির বিকল্প হিসেবে পতঞ্জলী চকলেট বাজারে এনেছেন, যেটার প্রচারণায় তিনি বারবার 'ভারতীয় পণ্য' ব্যবহারের ওপরে জোর দিয়েছেন। অথচ স্বাদে বা গুণে পতঞ্জলীর চকলেট কখনোই ক্যাডিবেরির ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেনি। 

একই কাজ করেছেন জিন্সের বেলাতেও। ভারতের তরুণ-তরুণীরা ছেঁড়াফাটা জিন্স পরে বলে তিনি অনেকবার তাদের ব্যাঙ্গ করেছেন, বলেছেন এটা ভারতীয় সংস্কৃতির অংশ নয়। অথচ তার নিজের পতঞ্জলী ফ্যাশন হাউজ থেকেই ছেঁড়াফাটা জিন্স বাজারে এসেছে, সাংবাদিকেরা তাকে এটা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে গেছেন। এরকম উদাহরণ অনেক আছে। এই হিপোক্রেসিগুলো লোকজন দেখেছে, কিন্ত অন্ধভক্তি কমেনি। 

নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাবা রামদেব

এছাড়া পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ থেকে তিনি নাকি গোমুত্র দিয়ে ক্যান্সারের ঔষধ আবিস্কার করেছেন, সেই ঔষধ খেয়ে অনেকেই সুস্থ হয়েছে বলে তিনি দাবী করলেও, কারো নাম ঠিকানা দিতে পারেননি। প্রচারণার বিলবোর্ডে যাদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, তাদের কেউই ক্যান্সারের পেশেন্ট ছিলেন না বলে জানা গেছে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে। এতসব জেনেও ভারতের লোকে তার থেকে মুখ ফেরানোর পরিবর্তে উল্টো দলে দলে তার কাছে ঘেঁষেছে, কারণ যেখানে সেখানে ধর্মের ট্রাম্পকার্ড খেলেছেন তিনি, বলেছেন, যে লোক পতঞ্জলির পন্য না কিনে বিদেশী কোম্পানীর পন্য কিনবে, সে আসল হিন্দু নয়! তার ভক্তরা সেই বাণীকে ছড়িয়ে দিয়েছে লোকের কানে কানে। 

২০১৬ সালে পতঞ্জলীর বার্ষিক আয় ছিল ৪৫০০ কোটি রূপিরও বেশি। এখন তো সেটা আরও বেড়েছে। এই বিশাল অংকের টাকা দিয়ে নানা জায়গায় আশ্রম খুলছেন রামদেব। এছাড়াও অনেক রাজনৈতিক নেতাই তাকে নিয়মিত চাঁদা দেন। কারণ ভারতের বিশেষ একটা রাজনৈতিক দলের প্রতি নিজের সমর্থন অকপটেই ব্যক্ত করেন রামদেব, বলেন, হিন্দু হয়ে থাকলে তাদেরকেই ভোট দেয়ার জন্য। রামদেবের কথায় প্রভাবিত হয় অনেকেই, গেরুয়া কাপড় পরা একজন সন্ন্যাসী ধরনের লোক যখন বলছে অমুককে ভোট দিলে হিন্দু ধর্ম বিপদে পড়বে, তাহলে আমি আমার ভোটটা অমুককে না দিয়ে তমুককে দেই- এরকম ভাবনা মানুষের মনে কাজ করেই। মিডিয়াও রামদেবকে ঘাঁটাতে সাহস পায় না তার প্রভাবের কারণে। এমনকি মিডিয়া মুঘলদের অনেকেও তার ভক্ত। 

বেশ কিছু সরকারী সম্পত্তি দখলের অভিযোগ আছে রামদেবের ট্রাস্টের বিরুদ্ধে, ট্রাস্টে সেবিকা এবং নারী নির্যাতনের ঘটনার কোন বিচার হয়নি, রামদেবের নাম শুনে মামলা নেয়নি পুলিশ- এমন ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। হাজার হাজার কোটি টাকা কামালেও, নিজের ট্রাস্টের কর্মচারীদের বেতন তিনি ঠিকমতো পরিশোধ করেন না, কয়েকবার এসব নিয়ে বিক্ষীভ করেছে কর্মীরা, তাদের ছাঁটাইও করে দেয়া হয়েছে। এখন যেমন করোনার ওষধ আবিস্কারের কথা বলে অস্থির সময়ে আরেকটা দাঁও মারতে চলেছেন তিনি। ব্যবসাটা গোটা ভারতে রামদেবের মতো করে খুব বেশি মানুষ যে বোঝে না, সেটা তো এসব ঘটনাতেই পরিস্কার...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা