মাত্র পনেরো বছর বয়সে যুক্ত হয়েছিলেন এভারেস্ট অভিযানের সাথে। এরপর বহুবার উঠেছেন এভারেস্টে। অধিকাংশ সময়েই অক্সিজেন বোতল ছাড়া। গড়েছেন একের পর এক ইতিহাস...

ছোটবেলা থেকেই 'এভারেস্ট' শব্দটা খুব টানতো। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু জায়গাটায় ওঠার জন্যে মানুষ কেন এত ব্যাকুল থাকে, সেটা বুঝেছিলাম আরেকটু বড় হওয়ার পর। এরপর 'Everest' নামের এক সিনেমা দেখলাম। রব হলের জীবনী'কে কেন্দ্র করে বানানো এ সিনেমার চেয়ে ঢের ভালো সিনেমা আছে মাউন্ট এভারেস্ট নিয়ে। কিন্তু কেন যেন এই সিনেমাটিই বেশি ভালো লাগলো। দুর্লঙ্ঘ টানের এক অতিকায় পর্বত মনে জায়গা করে নিলো সিনেমা শেষের সাথেসাথেই। এরপর এভারেস্ট নিয়ে বইটই পড়া শুরু করলাম। যারা পর্বতারোহী আছেন, তাদের গল্প তো থ্রিলিং নিঃসন্দেহে। কিন্তু যারা শেরপা, তাদের গল্প হার মানায় পর্বতারোহীদের যেকোনো রোমাঞ্চকর গল্পকেই। এবং তারা হিমালয়কে জয় করতে করতে এমন অবস্থাতেই চলে গিয়েছে, উচ্চতা এখন শুধুমাত্র তাদের কাছে একটি সংখ্যা।

এরকমই একজন ছিলেন আং রিতা শেরপা। যিনি মাউন্ট এভারেস্টে উঠেছেন একবার দুইবার নয়, দশবার! সবচেয়ে অদ্ভুত যে বিষয়, তিনি শীতকালে এভারেস্টে উঠেছিলেন কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই৷ এ কারণে তার নামও হয়ে গিয়েছিলো 'তুষার চিতা।' এভারেস্টে ওঠার রেকর্ড হাজার হাজার মানুষের আছে। কিন্তু অক্সিজেন বোতল ছাড়া ওঠার রেকর্ড নেই কারোরই। এ রেকর্ড শুধুমাত্র তারই আছে। যে কারণে আং রিতা শেরপা নাম লিখিয়েছেন গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ডেও!

শেরপারা এমনিতেই প্রকৃতির নিরীহ সন্তান। ব্যতিক্রম যে নেই, সেরকমটি মোটেও বলা যাবে না। তবে অধিকাংশ শেরপাই যেন আক্ষরিক অর্থেই মাটির মানুষ। এরমধ্যেও আং রিতা শেরপা ছিলেন আরো সাদাসিধে। জন্ম নেপালের থেমের শোলুকুম্বু গ্রামে। পরিবারের ছিলো চমরী গাইয়ের ব্যবসা। অং রিতা ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক এই ব্যবসার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু হুট করেই মাত্র পনেরো বছর বয়সে যুক্ত হয়ে গেলেন এভারেস্টের শেরপা দলের সাথে; পাহাড় বিষয়ক কোনো প্রশিক্ষন বা পড়াশোনা ছাড়াই। ওঠা শুরু করলেন বড় বড় পাহাড়ে৷ এরপর এভারেস্টকেও বাদ দিলেন না। এভারেস্টে উঠেছেন অজস্রবার।

গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও গড়েছেন অং রিতা শেরপা!

যদিও লিভারের সমস্যার কারণে তাকে ১৯৯৬ সালে 'শেরপা'র কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছে। তাও এখনও নতুন নতুন শেরপারা, নতুন পর্বতারোহীরা প্রথমে তারই দ্বারস্থ হয়। সবাই একবাক্যে স্বীকারও করে, এরকম দক্ষ 'শেরপা' আছে খুব কমই। বলবে নাও বা কেন, নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তিনি বহুবার ফিরছেন, কোনোরকম নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন অজস্র শেরপাকে, অজস্র পর্বতারোহীকে।

তবে তিনি শুধু যে এভারেস্টেই উঠতেন, তা না। এভারেস্টের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষার জন্যে নিবিড়ভাবে কাজ করতেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেভাবেই কাজ করে গিয়েছেন। জীবদ্দশায় পেয়েছেন 'অর্ডার অব গোর্খা দক্ষিন বাহু' (নেপালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান) এবং 'অর্ডার অব ত্রি শক্তি পত্র' এর মতন দেশসেরা খেতাব।

গত একুশে সেপ্টেম্বর, ৭২ বছর বয়সে মারা যান দুর্দান্ত এক জীবন কাটানো এ মানুষটি৷ তাঁর প্রয়াণে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি রইলো।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা