সোনিয়া গান্ধী একবার তাঁকে কটাক্ষ করে বললেন, শুধু কবিতা লিখলে দেশ চলে না। অটল বিহারী উত্তর দিয়েছিলেন, 'হ্যাঁ ঠিকই, কবিতা লিখলে দেশ চলে না, লিখে রাখা ভাষণ জনসভায় উগরে দিলে দেশ খুব দৌঁড়ায়!'

ভারতের রাজনীতিতে যে কয়জন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন, তাদের মধ্যে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নাম নিশ্চিতভাবেই থাকবে। আক্ষরিক অর্থেই অটল বিহারী বাজপেয়ী ছিলেন একজন সত্যিকারের ভারতরত্ন। ছিলেন বলছি কারণ, ৯৩ বছরের বাজপেয়ীর জীবন-গাড়ি থেমে গেছে এক অচিন স্টেশনে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, শ্রদ্ধেয় নেতা ভারতে যে কজন বিরল, তাদের মধ্যে অটল বিহারী বাজপেয়ী ছিলেন একজন।

আসলে তিনি ছিলেন একজন কবি, সেখান থেকে রাজনীতিই তার জীবনে ভবিতব্য হয়ে উঠবে তা কে জানত! তবে একজন কবি যখন নেতা হয়ে উঠেন, তখন মানুষের মধ্যেই তিনি কবিতা খুঁজে পান, মানুষের জন্যে একেকটি উদ্যম, একেকটি প্রচেষ্টাই যেন একজন নেতার জীবনে একেকটি রচিত লাইন। এরকমটা হলে অটল বিহারী বাজপেয়ীর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে এক মহাকাব্যই বলা যেতে পারে। 

সময়টা ১৯২৪ এর ডিসেম্বর। সে বছর গোয়ালিয়রে জন্মেছিলেন অটল বিহারি বাজপেয়ী। পিতা স্কুল শিক্ষক, নাম কৃষ্ণ বিহারি। লোকটার কবিতার প্রতি একটু টান ছিল। একটু না বেশিই হয়ত, তা না হলে ছেলে কি করে এত অল্প বয়সেই কবিতার ঘোরে ডুবে যায়! অটল বিহারী বাজপেয়ীর কবিতায় জীবনবোধের পাশাপাশি উঠে আসতো জাতীয়তাবাদী চেতনাও। হয়ত একারণেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। অনুভব করেন স্বাধীনতার স্বাদ না পেলে ভারত এগুবে না। ব্রিটিশবিরোধী 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন করেই ২৩ দিন জেল খেটেছিলেন, সেটাও কত আগের কথা। তখনো সে অর্থে সক্রিয় রাজনীতি শুরুই করেননি। 

আর্য সমাজ, আরএসএস করলেও রাজনীতিতে তার উত্থান শুরু হয় ১৯৫১ সালে নবগঠিত জনসংঘের হাত ধরে। নিজের মেধা, বক্তব্যের দৃঢ়তা তাকে খুব দ্রুতই প্রাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গঠন করেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বন্ধুদের নিয়ে, তিনি হন বিজেপির প্রথম সভাপতি।

শূন্য থেকে শুরু করে তিনি পূর্ণ করেছেন বিজেপিকে। বক্তা হিসেবে তিনি ছিলেন তুখোড়, শুধু তার বক্তব্যের জন্যেই কেবল তিনি ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে স্মরণীয় থাকবেন অনেক অনেক দিন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিজেন্ডারি জওহরলাল নেহরু বাজপেয়ীর বক্তব্য শুনে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলেন সেকালে যে, তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, অটল বিহারী একদিন গোটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন! বক্তা হিসেবে তার ক্ষমতা, যোগ্যতা কতখানি সেটা বুঝাতে এর চেয়ে বড় সার্টিফিকেট আর কি হতে পারে! অটল বিহারী বিজেপির মতো একটি দলের প্রথম সভাপতি ছিলেন, যে দলটি এখন ভারতের ক্ষমতায় এবং এখন যিনি প্রধানমন্ত্রী (নরেন্দ্র মোদী) তাকে ঘিরে ২০০২ সালের গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সংশ্লিষ্টতার কথা শুনা যায়।

২০০২ সাল, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাজপেয়ী। সেসময় তিনি তার দলের নরেন্দ্র মোদীকে পাশে বসিয়েই তাকে উদ্দেশ্য করে সংবাদ সম্মেলনে বলে গিয়েছিলেন, "রাজার কাছে বা শাসকের কাছে প্রজায় প্রজায় ভেদ হয় না। জন্ম, জাতি বা সম্প্রদায়, কোনো কিছুর ভিত্তিতেই শাসক প্রজায়-প্রজায় ভেদাভেদ করতে পারেন না।" এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণেই বিজেপির মতো একটি দলের নেতা হওয়া স্বত্তেও তিনি সর্বমহলে শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। উগ্র হিন্দুবাদীতায় নিজেকে উজাড় করে দেননি বলেই তিন তিনবার (১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯) বিজেপির বাইরের দলগুলোর সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীত্বের শপথ নিতে পেরেছিলেন। তিনিই একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি ভারতের চারটা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য থেকে নির্বাচিত নেতা। কী পরিমাণ গ্রহণযোগ্যতা থাকলে একজন নেতা এভাবে জিততে পারেন! 

অটল বিহারি বাজপেয়ী

একাত্তরে তার ভূমিকার জন্যে বাংলাদেশও তাকে স্মরণ করে। ১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ চলছে তখন বাজপেয়ী ছিলেন ভারতের লোকসভার সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়টায় ভারতের রাজনৈতিক মহলকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে আনতে বাজপেয়ী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরে ভারতীয় পার্লামেন্টে তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে অটল বিহারী বাজপেয়ী বক্তব্যে বলেছিলেন,

"....আমাদের সামনে ইতিহাস বদলের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়তি এই সংসদ এবং দেশকে এমন মহান কাজে রেখেছে, যেখানে আমরা শুধু মুক্তিসংগ্রামে জীবন দিচ্ছি না বরং ইতিহাসকে একটি পরিণতির দিকে নিতে চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে নিজেদের সংগ্রামের জন্য লড়াই করা মানুষ এবং আমাদের রক্ত একসাথে বইছে। এই রক্ত এমন সম্পর্ক তৈরি করবে যা কোনোভাবে ভাঙবে না। কোনো ধরনের কূটনীতির শিকার হবে না।"

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের অনেক কিছুই শেখার আছে অটল বিহারীর জীবন থেকে। ১৯৭১ সালে নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইন্দিরা গান্ধীকে 'মা দূর্গা' বলে ডেকেছিলেন, যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি অসাধারণভাবে মোকাবেলা করায় ইন্দিরা গান্ধীকে এই সম্মান করেন তিনি। ভাবা যায় নিজের সবচেয়ে ঘোরতর প্রতিপক্ষকেই এতোবড় সম্মান দিচ্ছেন কেউ! 

কবিতা লিখতেন বলে কটাক্ষও শুনতে হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে। তবে সেসবও তিনি সামলেছেন দারুণভাবেই। একবার তার কাব্যচর্চাকে কটাক্ষ করে কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধী বললেন, শুধু কবিতা লিখলে দেশ চলে না। অটল বিহারী এ কথা শুনে শান্ত ছিলেন কিন্তু জবাব দিয়েছিলেন ক্ষুরধার তরবারির মতো, সোনিয়া গান্ধীর চেয়েও বেশি শ্লেষাত্মক ছিল তার জবাব। তিনি বললেন, হ্যাঁ ঠিকই, কবিতা লিখলে দেশ চলে না, লিখে রাখা ভাষণ জনসভায় উগরে দিলে দেশ খুব দৌঁড়ায়! কি সামান্য কথা অথচ ভাবতে গেলেই কি গভীর তার অর্থ! 

রাজনীতির জন্যেই কিনা কে জানে মানুষটা কখনো বিয়েই করলেন না! একটা জীবন পার করে দিলেন কবিতায় আর মানুষের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে। তবে একটি মেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন যাকে নিজের মেয়ে হিসেবেই দেখেছেন সবসময়, মেয়েটির নাম নামিতা। তার ভেতরে কোথাও একটা অন্যরকম মননশীলতা ছিলো, এক অসাধারণ মানবিক স্বত্তা নিয়ে তিনি বেঁচেছিলেন। ঘুরতে পছন্দ করতেন, সময় পেলেই সিনেমা দেখতেন। এমনকি তার নিজের লেখা গানের (কেয়া খয়া, কেয়া পায়া) ভিডিও'তে শাহরুখ খান অভিনয়ও করেছিলেন!  

হায় সময়! নিজের জীবনের চলমান চিত্র আর দীর্ঘায়িত হলো শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর। তার জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বরকে ভারত পালন করে 'সুশাসন দিবস' হিসেবে, তাকে দেয়া হয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার 'ভারতরত্ন'। অটল বিহারী বাজপেয়ীকে বার বার মনে পড়বে, কাব্যময় বর্ণাঢ্য জীবন কবিতার শেষ পাতা দেখা হয়ে গেলেও এই জীবনের গল্প বার বার হবে, রাজনীতির প্রয়োজনেই! অটল বিহারী বাজপেয়ী রচিত একটি হিন্দি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ দেয়া হলো। কবিতাটি মৃত্যু নিয়ে-

A Battle With Death

A battle with death! What a battle it will be! I had no plans to take her on, We had not agreed to meet at that curve, Yet there she stood, blocking my path Looming larger than life. How long does death last? A moment, perhaps two -- Life is a sequence, beyond today and tomorrow. I have lived to the full, I will die as I choose, I will return, I have no fear of letting go. So, do not come by stealth, and take me by surprise, Come, test me, meet me head on. Unheeding of death, life's journey unfolds. Evenings sketched with kohl, nights smooth as the flute's notes. I do not say there was no pain, There were sorrows, of my own and of this world.

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা