এমন মন খারাপ করা চাঁদ রাতে হয়ত সাংবাদিক কাজলের পরিবার, রাষ্ট্রচিন্তার দিদারের পরিবার, কার্টুনিষ্ট কিশোরের পরিবার, মুশতাকের পরিবার, মিরাজের পরিবার, সাংবাদিক সুশান্তর পরিবারের মতো অনেক পরিবার চোখ মুছে সেমাই রান্না করে এই আশায়, যে তারাও তাদের প্রিয়জনের সাথে একসাথে ঈদ করতে পারবে আর দশটা পরিবারের মতো। হয়ত এই ঈদ নয়, কিন্তু অন্য ঈদে হবে। হতেই হবে।

ইফতার শেষ হতে না হতেই পাভেল এর ফোনে মেসেজ আসার টুংটাং শুরু হয়ে গেল। আজকে শেষ ইফতার। আগামীকাল ঈদ, তাই ঈদ মোবারক এর সব মেসেজ। পাভেল ভাবলেশহীনভাবে ফোনটা সরিয়ে রাখল। পাভেলের মা অল্প কিছু মুখে দিয়েই জায়নামাজে বসে গেলেন। পাভেলের চেয়ে অনেক ছোট পিচ্চি বোনটা 'পাপড়ি', চুপচাপ মাথা নীচু করে একমনে খেয়ে যাচ্ছে। বাবা বলে খাওয়ার সময় কথা বলতে হয় না। পাপড়ি সেটা খুব মেনে চলে। ঐ ঘর থেকে পাভেলের মায়ের কান্না ভেসে আসছে মুনাজাতে অস্পষ্ট গলায়। পাভেল কিছুক্ষণ পাপড়ির দিকে চেয়ে নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকে।

টেবিলে পাপড়ি একা। একা একা খেতে খেতে খুব কান্না পায় পাপড়ির। বাবা থাকলে কখনোই এভাবে পাপড়িকে একা খেতে হত না। বাবা বলে খাওয়ার সময় কখনো কাউকে টেবিলে একা রেখে উঠে যেতে হয়না। বাবা থাকলে আজকে ঠিকই পাপড়ির সাথে বসত। বাবাকে পুলিশ নিয়ে গেছে। বাবা নাকি রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। কিন্তু পাপড়ি মন থেকে বিশ্বাস করে তার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল মানুষ। তার বাবা এমন কোন কাজ করতেই পারেনা যে পুলিশ তাকে আটকে রাখবে। কিন্তু পাপড়ি এটাও বোঝে সে ছোট শিশু। তার কথা কেউ শুনবে না।

কেন শুনবে না? তার চেয়ে কি তার বাবাকে ভাল কেউ চিনে? ভাল জানে? বাবা এখন কেমন আছে? কি করছে? ভাবতে ভাবতেই কান্নার দমক বাড়তে থাকে পাপড়ির। অনেক কষ্টে ঢোঁক গিলে গিলে কান্না আটকে খাওয়া শেষ করে সে।

পাভেলের মা বিছানায় শুয়ে আছেন। পাপড়ি গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে 'মা কালকে কি সেমাই রান্না হবে?' মা উত্তর দেন না। ভাইয়ার রুমের দরজা বন্ধ। পাপড়ি দুই একবার ডেকে চলে যায়। পাভেলের মনও ভাল নেই। বাবাকে ঈদের আগে ছাড়ানোর সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। জামিন হয় নাই। চোখ বন্ধ করলেই বাবার চেহারাটা দেখতে পায় সে। শুনতে পায় চৌদ্দ শিকের ঐপাড় থেকে বাবা বলছে 'চিন্তা কোরোনা। এখানে আমি ভালই আছি। তোমরা ঈদ কর খুশিমনে। মন ছোট কোরোনা। আমি দোয়া করতেছি তোমাদের জন্য!'

কিচ্ছু ভাল লাগে না পাভেলের। পানি খাওয়ার জন্যে রুম থেকে বের হয় সে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখতে পায় ছোট বোন পাপড়ি চোখ মুছতে মুছতে সেমাই রান্না করার চেষ্টা করছে। ছোট্ট মেয়ে, সব একসাথে করতেও পারছে না। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব। কিন্তু তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছে। পাভেলকে দেখে পাপড়ি বলে, ''বাবা তো ঈদের দিন নামাজ পড়ে এসে সেমাই খায়। যদি কালকে হঠাৎ এসে দেখে সেমাই হয় নাই, বাবা মন খারাপ করবে না?'' পাভেলের খুব মায়া লাগে ছোট বোনটার জন্য। সে এত বড় হয়েই মানতে পারেনা বাবাকে ঈদের দিন পাবে না, আর পাপড়ি তো অনেক অনেক ছোট, পিচ্চি! পাভেল বলে ''হ্যাঁ খুব মন খারাপ করবে, চল আমি তোমাকে হেল্প করি।"

এমন মন খারাপ করা চাঁদ রাতে হয়ত সাংবাদিক কাজলের পরিবার, রাষ্ট্রচিন্তার দিদারের পরিবার, কার্টুনিষ্ট কিশোরের পরিবার, মুশতাকের পরিবার, মিরাজের পরিবার, সাংবাদিক সুশান্তর পরিবারের মতো অনেক পরিবার চোখ মুছে সেমাই রান্না করে এই আশায়, যে তারাও তাদের প্রিয়জনের সাথে একসাথে ঈদ করতে পারবে আর দশটা পরিবারের মতো।

হয়ত এই ঈদ একসাথে হবে না। কিন্তু হবে। হতেই হবে। কারো মন খারাপ করে দেয়ার জন্যে তো ঈদের চাঁদ ওঠে না। কারো মন খারাপ করে পার করে দেয়ার জন্যে তো ঈদ আসে না!

লেখক- পরিচালক আশফাক নিপুণ


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা